বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরসিইপিতে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির পথে নতুন অগ্রগতি

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণের পর বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ অর্থনীতির বাজারে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে (আরসিইপি) যোগদানের পথে আরও একধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় অনুষ্ঠিত পঞ্চম আরসিইপি মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশসহ চার দেশ ও অঞ্চলের সদস্যপদ প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে একটি বিশেষ বা অ্যাডহক ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের সুপারিশে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছেন জোটের বাণিজ্যমন্ত্রীরা।

বিজ্ঞাপন

বৈঠকটি ২১ সেপ্টেম্বর ম্যানিলায় অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতির বরাত দিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায়।

বৈঠকে সদস্য দেশগুলোর মন্ত্রীরা আরসিইপি যৌথ কমিটির (আরজেসি) দেওয়া সুপারিশে আনুষ্ঠানিক সম্মতি দেন। বাংলাদেশের পাশাপাশি এ প্রক্রিয়ায় রয়েছে লাতিন আমেরিকার দেশ চিলি, দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলংকা ও হংকং (চীন)। নতুন ওয়ার্কিং গ্রুপটি এসব আবেদনকারী অর্থনীতির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা ও কারিগরি প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে কাজ করবে।

আরসিইপি বিশ্বের বৃহত্তম মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা অর্থনৈতিক জোট। বর্তমানে চীনের নেতৃত্বাধীন এ জোটে ১৫টি সদস্য দেশ রয়েছে। এর সদস্যরা হলো ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, ব্রুনাই, ভিয়েতনাম, লাওস, মিয়ানমার, কম্বোডিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড। জোটটি বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ৩০ শতাংশ এবং বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে। কভিডকালীন ২০২০ সালে ভিয়েতনামে এ বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর হয়।

যৌথ বিবৃতির বরাত দিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানায়, আরসিইপি চুক্তি উন্মুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কাঠামো বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। জোটের পরিধি সম্প্রসারণ এবং নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তির রোডম্যাপ অনুযায়ী বাংলাদেশসহ আগ্রহী দেশগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা ও কারিগরি প্রক্রিয়া এগিয়ে নেবে এই ওয়ার্কিং গ্রুপ।

বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, আসিয়ানভুক্ত ১০টি দেশ ছাড়াও চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মতো অর্থনৈতিক পরাশক্তিদের নিয়ে গঠিত এ বাণিজ্য জোটে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়া দেশের অর্থনীতির জন্য বড় মাইলফলক হতে পারে। বিশেষ করে এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা বজায় রাখা, বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের সঙ্গে নিবিড় সংযোগ এবং দেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণে এটি ভূমিকা রাখতে পারে।

বৈঠকে আরসিইপি সদস্য দেশগুলোর মধ্যে নিবিড় সহযোগিতা ও গঠনমূলক সংলাপের মাধ্যমে কার্যকর ও ভবিষ্যৎমুখী আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংহতি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

এ সময় সদস্যপদের আবেদন করা দেশগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিদ্যমান অপ্রয়োজনীয় বাধা দূর করা এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) সংস্কার প্রক্রিয়ার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

ইন্দোনেশিয়ার বাণিজ্য উপমন্ত্রী দিয়াহ রোরো এস্তি উইদিয়া পুত্রি এবং নিউজিল্যান্ডের পার্লামেন্টের পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্য কমিটির সদস্য শেন রেটি বৈঠকে সহসভাপতিত্ব করেন।

প্রসঙ্গত, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়া সফরে যাওয়ার পর আরসিইপি জোটের সদস্যপদ নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ আসিয়ানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক চায় জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছিলেন, ‘আমরা আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়েও আলোচনা করেছি। বাংলাদেশ আসিয়ানের সঙ্গে আরো ঘনিষ্ঠ সম্পৃক্ততা চায় এবং আসিয়ানের সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হওয়ার প্রত্যাশা করে। একই সঙ্গে আমরা আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে (আরসিইপি) যোগদানে আগ্রহী। বাংলাদেশের আঞ্চলিক সংযুক্তি প্রচেষ্টায় মালয়েশিয়ার সমর্থনের জন্য আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।’

এর তিন মাস পর আরসিইপি মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া আরও এগিয়ে গেল।

আরসিইপির প্রধান সুবিধাসমূহ (Benefits)

১. ব্যাপক শুল্ক হ্রাস ও মুক্ত বাজার: চুক্তির আওতায় সদস্য দেশগুলোর মধ্যে প্রায় ৯০% পণ্যের ওপর থেকে ধাপে ধাপে শুল্ক তুলে নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে জোটভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে পণ্য আদান-প্রদান অনেক সস্তা ও সহজ হয়েছে।

২. ইউনিফাইড ‘রুলস অব অরিজিন’: এটি আরসিইপি-এর সবচেয়ে বড় সুবিধা। আগে ভিন্ন ভিন্ন দেশের সাথে আলাদা চুক্তির কারণে কাঁচামালের উৎপত্তিস্থল নিয়ে জটিলতা হতো। এখন সদস্য দেশগুলোর যেকোনো একটি থেকে কাঁচামাল নিয়ে অন্য দেশে পণ্য তৈরি করলেও তা পুরো জোটে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। এটি আঞ্চলিক সাপ্লাই চেইনকে শক্তিশালী করছে।

৩. বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) বৃদ্ধি: বিনিয়োগের পরিবেশ সহজ ও নিরাপদ করায় আসিয়ান ও এর সহযোগী দেশগুলোতে উন্নত দেশ (যেমন- জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া) থেকে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ ব্যাপক হারে বাড়ছে।

৪. ডিজিটাল বাণিজ্য ও ই-কমার্স প্রসার: ই-কমার্স, মেধা সম্পত্তি (IP) এবং ক্রস-বর্ডার ডিজিটাল পেমেন্ট বা সেবার জন্য সাধারণ ও আধুনিক নিয়ম তৈরি করা হয়েছে, যা আইটি এবং সেবা খাতের দ্রুত বিকাশ ঘটাচ্ছে।

প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ

১. অর্থনৈতিক অসমতা: এই জোটে একদিকে যেমন অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও সিঙ্গাপুরের মতো উচ্চ আয়ের উন্নত দেশ রয়েছে, অন্যদিকে কম্বোডিয়া, লাওস ও মিয়ানমারের মতো স্বল্পোন্নত দেশও আছে। ফলে উন্নত দেশগুলোর সাথে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশগুলো।

২. শুল্ক রাজস্বের ক্ষতি: মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির কারণে আমদানি শুল্ক প্রায় শূন্যে নেমে আসে। যেসব দেশ আমদানির ওপর শুল্ক বা ট্যাক্স আদায়ের মাধ্যমে বড় রাজস্ব আয় করে, তাদের জাতীয় রাজস্বে বড় ধাক্কা লাগে।

৩. স্থানীয় শিল্পের ওপর চাপ (Flood of Imports): চীন বা ভিয়েতনামের মতো উৎপাদনমুখী পরাশক্তি থেকে সস্তা পণ্য যখন শুল্কহীনভাবে বাজারে প্রবেশ করে, তখন দুর্বল বা ছোট দেশগুলোর স্থানীয় দেশীয় শিল্প কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে মার খেতে পারে।

৪. শ্রম ও পরিবেশগত মানদণ্ডের অভাব: এই চুক্তিতে শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা, ইউনিয়ন বা পরিবেশ সুরক্ষার মতো বিষয়ে কোনো কড়া ও বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি। সমালোচকদের মতে, এর ফলে পরিবেশের ক্ষতি ও সস্তা শ্রমের অপব্যবহার বাড়তে পারে।

৫. ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা: চীনের নেতৃত্বাধীন অর্থনৈতিক প্রভাব এই জোটে অনেক বেশি। এর ফলে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করা এবং মার্কিন-চীন বাণিজ্য লড়াইয়ের প্রভাব সামলানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রধান সুবিধাসমূহ

এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী ধাক্কা সামলানো: বাংলাদেশ ২০২৬ সালের পর উন্নয়নশীল দেশে পদার্পণ করলে বর্তমানে পাওয়া অনেক শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধা (GSP) হারাবে। আরসিইপি-র সদস্য হলে আসিয়ানসহ চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বড় বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা ধরে রাখা সম্ভব হবে।

আঞ্চলিক সাপ্লাই চেইনে অন্তর্ভুক্তি: বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও অন্যান্য শিল্পের জন্য কাঁচামাল (যেমন- সুতা, কাপড়, রাসায়নিক) মূলত চীন বা অন্য এশীয় দেশ থেকে আসে। আরসিইপি-র ‘রুলস অব অরিজিন’ সুবিধার কারণে এই জোটের দেশগুলো থেকে কাঁচামাল এনে পণ্য তৈরি করে তা আবার জোটের যেকোনো দেশে সহজে শুল্কহীনভাবে রপ্তানি করা যাবে।

বৈদেশিক বিনিয়োগ (FDI) আকর্ষণ: আরসিইপি-র অংশ হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশকে সমগ্র এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিশাল বাজারের একটি প্রবেশদ্বার হিসেবে দেখবে। ফলে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশ থেকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়বে।

নতুন বাজারের দুয়ার উন্মোচন: বর্তমানে বাংলাদেশের রপ্তানি মূলত তৈরি পোশাক খাতের ওপর এবং ইইউ ও মার্কিন বাজারের ওপর নির্ভরশীল। আরসিইপি-তে যোগ দিলে এই নির্ভরশীলতা কমে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিশাল বাজারে বাণিজ্যের বৈচিত্র্যায়ন ঘটবে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ

বিশাল রাজস্ব ক্ষতি: বাংলাদেশের মোট আমদানি শুল্ক ও কাস্টমস রাজস্বের একটি সিংহভাগ (প্রায় ৫৫%) আসে আরসিইপি ভুক্ত দেশগুলো (বিশেষ করে চীন, জাপান, আসিয়ান) থেকে পণ্য আমদানির মাধ্যমে। মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির শর্ত মেনে এই শুল্ক প্রত্যাহার করলে সরকারের রাজস্ব আয়ে প্রায় ২.৫ বিলিয়ন ডলারের বড় ধাক্কা লাগতে পারে।

দেশীয় শিল্পের ওপর চরম চাপ: চীন, ভিয়েতনাম বা থাইল্যান্ডের মতো উৎপাদনমুখী পরাশক্তিগুলোর সস্তা এবং উন্নত মানের পণ্য যখন বাংলাদেশে কোনো শুল্ক ছাড়াই প্রবেশ করবে, তখন বাংলাদেশের স্থানীয় হালকা প্রকৌশল, ধাতু, প্লাস্টিক, কেমিক্যাল ও টেক্সটাইল খাত কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে।

আইন ও নীতিগত সংস্কারের চাপ: আরসিইপি-র শর্ত মেনে চলতে হলে বাংলাদেশকে তার মেধা সম্পত্তি (IP) আইন, ডেটা সুরক্ষা, প্রতিযোগিতা নীতি এবং ব্যাংকিং ও সেবামূলক খাতের নিয়মনীতিতে আমূল ও দ্রুত পরিবর্তন আনতে হবে, যার জন্য বাংলাদেশ এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়।

কূটনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য: এই জোটে চীনের অর্থনৈতিক প্রভাব সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে ভারতের সাথে বাংলাদেশের দীর্ঘ সীমান্ত ও গভীর বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে (ভারত আরসিইপি-তে যোগ দেয়নি)। ফলে এই জোটে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্য একটি সূক্ষ্ম কূটনৈতিক পরীক্ষা।

কঠোর দরকষাকষির প্রয়োজনীয়তা: আরসিইপি-র নিয়ম অনুযায়ী, নতুন সদস্য হতে হলে বিদ্যমান ১৫টি সদস্য দেশের প্রত্যেকের আলাদা সম্মতি প্রয়োজন। যেকোনো একটি দেশ আপত্তি জানালে অন্তর্ভুক্তি আটকে যেতে পারে, যা সফল করতে শক্তিশালী অর্থনৈতিক কূটনীতির প্রয়োজন।

পড়ুন : নরসিংদীর ভাটপাড়ায় কাভার্ডভ্যান-সিএনজি সংঘর্ষে নিহত ২

সা/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন