বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

জাতিসংঘে নেপালের প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে বিশ্বজুড়ে আলোচনা, নজর কাড়ল কালো চশমাও

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহর দেওয়া বক্তব্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। নেপালের ভয়াবহ বন্যা, জলবায়ু পরিবর্তন, জলবায়ু ন্যায়বিচার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার বিষয়গুলো তার বক্তব্যে গুরুত্ব পেয়েছে। তবে জাতিসংঘে শাহর প্রথম বড় আন্তর্জাতিক উপস্থিতিকে বিভিন্ন গণমাধ্যম ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরেছে।

বিজ্ঞাপন

কেউ গুরুত্ব দিয়েছে জলবায়ু সংকটে নেপালের অবস্থান ও আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তার ওপর। কেউ আবার হিমালয়ে জলবায়ু সহনশীলতা বাড়াতে নেপাল, ভারত ও চীনকে নিয়ে শাহর প্রস্তাবিত আঞ্চলিক উদ্যোগকে সামনে এনেছে। এর পাশাপাশি কয়েকটি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল শাহর ব্যক্তিগত উপস্থিতি, বিশেষ করে তার পরিচিত কালো চশমা।

জলবায়ু সংকটে নেপালের অবস্থান

কাতারভিত্তিক আল জাজিরা শাহর বক্তব্যকে জলবায়ু সংকটের সম্মুখসারির দেশগুলোর প্রতি বিশ্বের ব্যর্থতার প্রসঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করেছে। তাদের প্রতিবেদনে নেপালের সাম্প্রতিক বন্যাকে ‘বিশ্বের জন্য সতর্কবার্তা’ হিসেবে শাহর বর্ণনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান গুরুত্ব পেয়েছে।

সাধারণ পরিষদে শাহ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে নেপালের অবদান এক-দশমাংশ শতাংশেরও কম।

দ্য গার্ডিয়ান তার বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে জানায়, ‘আমরা এই সংকট সৃষ্টি করিনি, কিন্তু এর জন্য আমাদের বিপুল মূল্য দিতে হচ্ছে।’

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমটি জানায়, বন্যার পর নেপালের পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১০ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থ প্রয়োজন বলে শাহ ধারণা দিয়েছেন। একই সঙ্গে হিমালয়ের জলবায়ু সহনশীলতা বাড়াতে নেপাল, ভারত ও চীনের একসঙ্গে কাজ করার আহ্বানও তার বক্তব্যে উঠে এসেছে।

আল জাজিরা ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন গ্রুপের একটি গবেষণার কথাও উল্লেখ করেছে। ওই গবেষণা অনুযায়ী, একটি মাত্র চরম আবহাওয়াজনিত ঘটনা নেপালের এই দুর্যোগের একক কারণ ছিল না; দীর্ঘমেয়াদি তাপমাত্রা বৃদ্ধি, পারমাফ্রস্ট গলে যাওয়া এবং ভূতাত্ত্বিক অস্থিতিশীলতার সমন্বয়ে তৈরি একটি ‘যৌগিক সংকট’ এর পেছনে ভূমিকা রেখেছে।

এ ছাড়া নেপাল জাতিসংঘের লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড থেকে ২ কোটি ডলার চেয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বন্যায় ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫০০ কোটি ডলার।

ঋণের বদলে অনুদানের আহ্বান

জার্মানির ডয়চে ভেলেও নেপাল ও হিমালয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

শাহর বক্তব্যের যে অংশটি তারা বিশেষভাবে তুলে ধরেছে, সেখানে বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে নেপালের অবদান ০ দশমিক ১ শতাংশেরও কম হলেও দেশটিকে এর জন্য ‘বিপুল মূল্য’ দিতে হচ্ছে বলে বলা হয়েছে। ডিডব্লিউ জানায়, শাহ কোনো নির্দিষ্ট দেশকে দায়ী না করে যৌথ দায়িত্ব ও সংহতির আহ্বান জানিয়েছেন।

পুনর্গঠনের অর্থায়নে ঋণের পরিবর্তে অনুদানভিত্তিক সহায়তার আহ্বানও ডিডব্লিউর প্রতিবেদনে গুরুত্ব পেয়েছে। জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর ওপর বাড়তি ঋণের বোঝা চাপানো উচিত নয়—শাহর যুক্তি হিসেবে বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।

ফ্রান্স ২৪-ও শাহর বক্তব্যের ‘নেপাল এই সংকট সৃষ্টি করেনি, কিন্তু মূল্য দিচ্ছে’ অংশটি তুলে ধরে। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান এবং একা নেপালের পক্ষে এসব সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়—শাহর এই বক্তব্যও প্রতিবেদনে স্থান পায়।

একই সঙ্গে নেপাল, ভারত ও চীনকে নিয়ে ‘হিমালয়ান ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স মেকানিজম’ গড়ে তোলার শাহর প্রস্তাবকে গুরুত্ব দেয় ফ্রান্স ২৪। তার রাজনৈতিক উত্থানের প্রসঙ্গ টেনে ৩৬ বছর বয়সী সাবেক র‌্যাপার হিসেবে তার ক্ষমতায় আসার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

জলবায়ু কূটনীতির নতুন প্রস্তাব

শাহর বক্তব্যের সবচেয়ে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবগুলোর একটি ছিল নেপাল, ভারত ও চীনের যৌথ নেতৃত্বে ‘হিমালয়ান ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স মেকানিজম’ গঠন। এর আওতায় স্যাটেলাইট তথ্য ভাগাভাগি, হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদ পর্যবেক্ষণ এবং আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে।

শাহর বক্তব্যে এই প্রস্তাবটি ইতোমধ্যেই বিভিন্ন প্রতিবেদনের শিরোনাম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিও ক্লিপে জায়গা পেয়েছে।

বক্তব্যে কূটনৈতিক কৌশলের বিষয়টিও উঠে আসে। গত মাসের বন্যার পর নেপালের প্রশাসন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি নিঃসরণকারী দেশগুলোর কাছ থেকে জলবায়ু ন্যায়বিচার এবং ক্ষতিপূরণের দাবি তুলেছিল। তবে নিউইয়র্কে শাহ প্রথমেই ভারত ও চীনের নাম নিয়ে বন্যার পর তাদের সহায়তার জন্য ধন্যবাদ জানান।

তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো দেশ বা মহাদেশকে দোষারোপ করতে এখানে আসিনি।’

এরপর দুই প্রতিবেশী দেশকে নিয়ে ত্রিপক্ষীয় একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন তিনি।

বিশ্বমাধ্যমে কালো চশমার আলোচনাও

জলবায়ু সংকট ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মতো বিষয়গুলোর পাশাপাশি শাহর ব্যক্তিগত উপস্থিতিও কয়েকটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নজর কেড়েছে।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ‘জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে নেপালের নেতা কেন কালো সানগ্লাস পরেছিলেন?’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে জাতিসংঘে শাহর উপস্থিতির সঙ্গে তার রাজনৈতিক পরিচিতি ও জনপরিচিতির যোগসূত্র তুলে ধরা হয়।

কালো চশমা, কালো স্যুট ও ঐতিহ্যবাহী নেপালি টুপি পরে সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেন শাহ। টাইমস চশমাটিকে নেপালে তার জনপরিচিতির পরিচিত একটি অংশ হিসেবে বর্ণনা করে।

প্রতিবেদনটির শুরুতেই চশমার প্রসঙ্গ এনে বলা হয়, ‘বৃহস্পতিবার নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ যখন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেন, তখন তার নাকে থাকা কালো চশমা নেপালিদের কাছে ইতোমধ্যেই পরিচিত। ৩৬ বছর বয়সী শাহ, যিনি দেশজুড়ে ‘বালেন’ নামে পরিচিত, জনসমক্ষে তাকে ছাড়া খুব কমই দেখা যায়।’

বক্তব্যে দেশের অভ্যন্তরীণ সংকটও

জাতিসংঘে দেওয়া বক্তব্যে শাহ শুধু জলবায়ু সংকটের বিষয়েই থেমে থাকেননি। দেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতার কিছু বিষয়ও তুলে ধরেন তিনি।

বর্ষা মৌসুমে কৃষকেরা সার পাচ্ছেন না, সড়ক নির্মাণকারীরা বিটুমিন পাচ্ছেন না এবং পরিবারগুলো রান্নার গ্যাসের সংকটে পড়ছে—এমন প্রসঙ্গ তুলে শাহ বলেন, ‘আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র সময়মতো পৌঁছে যায়। রাইফেল ও গোলাবারুদ সীমান্ত পেরিয়ে যায়, সব বাধা অতিক্রম করে, প্রতিটি সময়সীমা পূরণ করে। কিন্তু প্রয়োজনের সময়ে নেপালের একজন কৃষক বাজারদরে সার বা জ্বালানি কিনতে পারেন না।’

ইরান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব নেপালের দৈনন্দিন জীবনেও পড়েছে বলে বক্তব্যে উল্লেখ করেন তিনি। শাহ বলেন, ‘আমরা এমন একটি বিশ্ব তৈরি করেছি, যেখানে যুদ্ধের জন্য নিখুঁত সরবরাহব্যবস্থা আছে, কিন্তু খাদ্যের জন্য সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।’

ব্যক্তিত্ব নয়, বার্তাকেই সামনে রাখার চেষ্টা

জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক মঞ্চে বিভিন্ন নেতা নিজেদের ব্যক্তিত্ব ও ভাবমূর্তিরও প্রকাশ ঘটিয়েছেন—এমন কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরে প্রতিবেদনে শাহর বক্তব্যের ধরনও বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সচেতনভাবে নিজের ভাবমূর্তি গড়ে তোলার জন্য পরিচিত শাহ জাতিসংঘে বক্তব্য দেওয়ার সময় নিজের ব্যক্তিত্বকে সামনে না রেখে মূল বার্তায় গুরুত্ব দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

তিনি বলেন, ‘আমাকে বলা হয়েছে, এ বছর এই পরিষদে বক্তব্য দেয়া সরকারপ্রধানদের মধ্যে আমিই সবচেয়ে কমবয়সী। আমি এটিকে গল্প বানাতে এখানে আসিনি।’

বক্তব্যের শেষাংশে নেপালি ভাষায় পশুপতিনাথ ও বুদ্ধের কথাও উল্লেখ করেন শাহ।

জাতিসংঘে শাহর এই বক্তব্য তার দেশের অভ্যন্তরেও আলোচনার নতুন মাত্রা তৈরি করেছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশে তার নীরবতা নিয়ে যেমন আলোচনা হয়েছে, তেমনি ক্ষমতাসীন দলের আইনপ্রণেতারা এটিকে নীরবে কাজ করে যাওয়ার একজন মানুষের আচরণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। অন্যদিকে সমালোচকেরা এটিকে গণতান্ত্রিক জবাবদিহি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা হিসেবে দেখেছেন।

পড়ুন: প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্কে ১১ দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকসহ ৩০ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত: মাহদী আমিন

আর/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন