ছোট্ট বয়সেই বাবাকে হারিয়েছিলেন এস এম তাইজুল ইসলাম। তখন তাঁর বয়স মাত্র আড়াই বছর। স্বামীকে হারিয়ে তিন সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন মা হাওয়া বেগম। অভাবের সংসারে কখনো না খেয়ে থেকেছেন, কখনো সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে না পেরে কেঁদেছেন। তবু একটি স্বপ্ন আঁকড়ে ধরে ছিলেন—ছেলেকে পড়াশোনা করিয়ে একদিন বিচারকের আসনে বসাবেন।
সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। তবে এ পথ ছিল কণ্টকাকীর্ণ। দারিদ্র্য, পিতৃহীন শৈশব ও কঠিন সংগ্রাম পেরিয়ে যখন তাইজুল এগিয়ে যাচ্ছিলেন স্বপ্নের দিকে, তখনই তাঁর জীবনে নেমে আসে ভয়াবহ বিপর্যয়। দুই কিডনি অকেজো হয়ে যায়। নিয়মিত ডায়ালাইসিস, ব্যয়বহুল চিকিৎসা আর কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজনীয়তায় থমকে যায় তাঁর পড়াশোনা ও স্বাভাবিক জীবন।
একসময় হাসপাতালের বেডে শুয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন তিনি। চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন ছিল লাখ লাখ টাকা। যে পরিবারে একসময় একবেলা খাবার জোগাড় করাও কঠিন ছিল, সেই পরিবারের কাছে এত টাকা জোগাড় করা ছিল প্রায় অসম্ভব। তখন পাশে দাঁড়ান বন্ধু, সহপাঠী, আত্মীয়স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। তাঁদের সহযোগিতা আর মায়ের অক্লান্ত চেষ্টা ও দোয়ায় ভারত গিয়ে কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয় তাইজুলের।
আজ সেই তাইজুলই ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় ১২০তম স্থান অর্জন করে চূড়ান্তভাবে সিভিল জাজ হিসেবে উত্তীর্ণ হয়েছেন। হাসপাতালের বেড থেকে বিচারকের আসনে পৌঁছানোর এই গল্পে তাই মিশে আছে একজন মায়ের ত্যাগ, সন্তানের অদম্য লড়াই এবং মানুষের মানবিক সহযোগিতার অনন্য দৃষ্টান্ত।
বাবাকে হারিয়ে মায়ের আঁচলেই বেড়ে ওঠা
মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার পূর্ব এনায়েতনগর ইউনিয়নের পূর্ব আলীপুর গ্রামের সন্তান তাইজুল ইসলাম। মাত্র আড়াই বছর বয়সে বাবাকে হারান তিনি। স্বামীর মৃত্যুর পর সন্তানদের মানুষ করার দায়িত্ব এসে পড়ে মা হাওয়া বেগমের ওপর।
সংসারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে হাওয়া বেগমকে করতে হয়েছে কঠোর পরিশ্রম। নিজের ভাইদের কাছ থেকেও বিভিন্ন সময় সহযোগিতা নিয়েছেন। কখনো না খেয়ে থেকেছেন, কখনো নিজের প্রয়োজনের কথা ভুলে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিয়েছেন।
হাওয়া বেগম বলেন, “স্বামী মারা যাওয়ার পর সন্তানদের নিয়ে অনেক কষ্ট করেছি। কখনো এমনও হয়েছে, ছেলেমেয়েদের মুখে খাবার দিতে পারিনি। আমার ভাইয়েরা তখন আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। মাঠে কাজ করেছি, পরিশ্রম করেছি। আমার একটাই স্বপ্ন ছিল—আমার ছেলে একদিন জজ হবে।”
৩১ বছর ধরে একাই সন্তানদের জন্য সংগ্রাম করেছেন এই মা। তাঁর সেই দীর্ঘ ত্যাগ আজ যেন সার্থকতার মুখ দেখেছে।
অভাবকে হারিয়ে ছোটবেলা থেকেই মেধার স্বাক্ষর
অভাবের সংসারে বেড়ে উঠলেও পড়াশোনায় মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন তাইজুল। ২০০৮ সালে আলীপুর দাখিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল পরীক্ষায় গোল্ডেন এ+ অর্জন করেন তিনি। ওই মাদ্রাসার ইতিহাসে তিনিই প্রথম গোল্ডেন এ+ অর্জনকারী শিক্ষার্থী।
এরপর ভর্তি হন ঢাকা কলেজে। মানবিক বিভাগ থেকে ২০১০ সালের এইচএসসি পরীক্ষাতেও এ+ অর্জন করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি পরীক্ষায় মেধাক্রমে ৫৮তম স্থান অর্জন করে আইন বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। ২০১৫ সালে এলএলবি এবং ২০১৮ সালে এলএলএম সম্পন্ন করেন তিনি।
তখন স্বপ্নের পথ অনেকটাই পরিষ্কার। কিন্তু এর মধ্যেই শুরু হয় তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়।
দুই কিডনি অকেজো, থমকে যায় স্বপ্নের পথ
২০১৩ সাল থেকে শারীরিক নানা জটিলতায় ভুগতে শুরু করেন তাইজুল। প্রথমে কোমর ও পিঠে ব্যথা, পরে ২০১৫ সালে কিডনিতে সমস্যা ধরা পড়ে। একপর্যায়ে চিকিৎসকেরা জানান, তাঁর দুই কিডনিই অকেজো হয়ে গেছে।
শুরু হয় নিয়মিত ডায়ালাইসিস। চিকিৎসার ব্যয় বাড়তে থাকে। একসময় চিকিৎসকেরা কিডনি প্রতিস্থাপনের পরামর্শ দেন। এর জন্য প্রয়োজন ছিল প্রায় ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা। কিন্তু পরিবারের তখন এমন অবস্থা—সংসার চালানোই যেখানে কঠিন, সেখানে এত বিপুল অর্থ জোগাড় করা ছিল অকল্পনীয়।
তাইজুল বলেন, “আমার দুটি কিডনি যখন ড্যামেজ হয়ে গেল, তখন লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। আমি তখন অনার্স তৃতীয় বর্ষে। আমাদের ঘরে খাওয়ার মতো চালও থাকত না। এমন অবস্থায় ৩০ লাখ টাকা চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন হলো। তখন মনে হয়েছিল, আমি হয়তো আর বাঁচব না, মায়ের স্বপ্নও পূরণ করতে পারব না।”
মৃত্যুর মুখ থেকে ফেরাল মানুষের ভালোবাসা
তাইজুলের চিকিৎসার খবর ছড়িয়ে পড়লে পাশে দাঁড়ান তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু, সহপাঠী, বড় ভাই, আত্মীয়স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করেন।
মা হাওয়া বেগম নিজের জমিজমা ও যা কিছু ছিল, তা বিক্রি করেও ছেলের চিকিৎসার অর্থ জোগাড়ের চেষ্টা করেন। কিন্তু তাতেও প্রয়োজনীয় অর্থ পূরণ হচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত মানুষের সহযোগিতায় চিকিৎসার অর্থ জোগাড় হয়। ২০১৭ সালে ভারতে গিয়ে কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয় তাইজুলের।
মা বলেন, “আমার ছেলে এমন রোগে পড়েছিল যে মনে হয়েছিল, তাকে আর বাঁচাতে পারব না। কিন্তু আল্লাহর রহমতে আর মানুষের সহযোগিতায় সে ফিরে এসেছে। আমার ছেলে আজ জজ হয়েছে। আমার সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। আল্লাহর কাছে আমি কৃতজ্ঞ।”
‘একদিকে জীবন, অন্যদিকে স্বপ্ন’
অসুস্থতার সেই দিনগুলোর কথা মনে করে তাইজুল বলেন, “একদিকে আমার জীবন, অন্যদিকে আমার ক্যারিয়ার—সবকিছু শেষের দিকে চলে গিয়েছিল। তখন মনে হতো, আমি যদি মারা যাই, তাহলে কীভাবে জজ হব? এই চিন্তা আমাকে আরও ভেঙে দিত। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি।”
কিডনি প্রতিস্থাপনের পর ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে আবার পড়াশোনায় ফেরেন তিনি। শারীরিক নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নিজের স্বপ্নকে সামনে রেখে প্রস্তুতি নিতে থাকেন বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পরীক্ষার জন্য।
“আমি মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে ফিরেছি। আমার মা চেয়েছিলেন আমি জজ হই। বন্ধুবান্ধব, বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাই, আত্মীয়স্বজন—অনেকে আমাকে সহযোগিতা করেছেন। তাঁরা যদি সেদিন পাশে না দাঁড়াতেন, হয়তো আমি আজ এখানে থাকতাম না। আল্লাহর রহমতে আমি বেঁচে আছি এবং আজ জজ হতে পেরেছি। আমি সবার প্রতি কৃতজ্ঞ।”
দীর্ঘ অপেক্ষার পর পূরণ হলো মায়ের স্বপ্ন
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় ১২০তম স্থান অর্জন করে সিভিল জাজ হিসেবে উত্তীর্ণ হন এস এম তাইজুল ইসলাম।
যে মা একসময় ছেলের চিকিৎসার জন্য মানুষের দ্বারে দ্বারে সহযোগিতা চেয়েছেন, সেই মায়ের চোখেই আজ আনন্দের অশ্রু।
তাইজুলের ভাই নাজমুল ও বোন খুরশিদা বলেন, “আমরা কখনো ভাবিনি ভাই আবার সুস্থ হয়ে সংসারের হাল ধরবে। এমন রোগ হয়েছিল যে সবাই ভেবেছিল, সে হয়তো আর বাঁচবে না। কিন্তু আল্লাহর রহমত আর মানুষের সহযোগিতায় ভাই বেঁচে ফিরেছে। আজ সে জজ হয়েছে, মায়ের স্বপ্ন পূরণ করেছে। এটা আমাদের জন্য অনেক বড় আনন্দের।”
যে ছেলেকে নিয়ে ছিল শঙ্কা, আজ সে-ই এলাকার গর্ব
তাইজুলের সাফল্যে আনন্দিত তাঁর এলাকার মানুষও। তাঁদের ভাষ্য, একসময় যে ছেলেটিকে নিয়ে সবাই আশঙ্কা করেছিলেন, সেই ছেলেই আজ এলাকার গর্ব হয়ে ফিরেছেন।
এলাকাবাসী বলেন, “আমরা ভেবেছিলাম তাইজুল আর বাঁচবে না। কিন্তু মানুষের সহযোগিতায় সে চিকিৎসা পেয়েছে, সুস্থ হয়েছে। আজ সে জজ হয়েছে। এটা শুধু তার পরিবারের নয়, আমাদের পুরো এলাকার জন্য আনন্দের বিষয়।”
হাসপাতালের বেড থেকে বিচারকের আসনে—সংগ্রামের অবসান
তাইজুল ইসলামের গল্প কেবল একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর সাফল্যের গল্প নয়। এটি একজন মায়ের দীর্ঘ ত্যাগ, একজন সন্তানের অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং মানুষের সম্মিলিত সহযোগিতায় অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্প।
পিতৃহীন শৈশব থেকে দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই, সেখান থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা; এরপর দুই কিডনি অকেজো হয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া, নিয়মিত ডায়ালাইসিস, কিডনি প্রতিস্থাপন এবং আবার পড়াশোনায় ফিরে আসা—প্রতিটি ধাপেই ছিল নতুন পরীক্ষা।
একসময় হাসপাতালের বেডে শুয়ে তাঁর একমাত্র আকুতি ছিল—“আমি বাঁচতে চাই।” সেই বেঁচে থাকার লড়াই আজ তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে বিচারকের আসনে।
একজন মায়ের স্বপ্ন, একজন সন্তানের সংগ্রাম এবং অসংখ্য মানুষের সহযোগিতায় তাইজুলের জীবনের এই ফিরে আসা এখন একটি মানবিক ও অনুপ্রেরণাদায়ী গল্প।
পড়ুন:সংসার চলছে জোড়াতালিতে, হিসাব মিলছে না নিম্ন ও মধ্যবিত্তের
ইমি/


