বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

পানিতে ডুবে মৃত্যুঝুঁকিতে শিশুরা: নেত্রকোনায় ৮ মাসে ৮২ প্রাণহানি

গ্রামীণ বাড়ির উঠোন। মায়েরা ব্যস্ত রান্নাঘরে কিংবা গৃহস্থালির অন্য কোনো কাজে। বাবা হয়তো গেছেন মাঠে, ফসলের তাগিদে। এই তো সুযোগ! হামাগুড়ি দিয়ে বা টলটলে পায়ে হাঁটতে হাঁটতে শিশুটি এগিয়ে যায় বাড়ির পাশের ছোট্ট পুকুর বা ডোবাটির দিকে। জলের সাথে মিতালি গড়তে গিয়ে কখন যে ছোট্ট প্রাণটি তলিয়ে যায়, তা টেরই পান না কেউ। যখন খোঁজ পড়ে, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। মায়ের আকাশ-ফাটানো কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ।

নেত্রকোনা জেলায় এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্য যেন এক নিয়মিত ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়েছে। পাহাড়, নদী, হাওর আর খাল-বিলে ঘেরা এই জনপদে জল যেমন জীবনের উৎস, তেমনি তা হয়ে উঠেছে শিশুমৃত্যুর এক নীরব ঘাতক। গত আট মাসে (জানুয়ারি-আগস্ট) কেবল পানিতে ডুবেই জেলাটিতে প্রাণ হারিয়েছেন ৮২ জন। এর মধ্যে ৯৫ ভাগই শিশু, যাদের বয়স এক থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে।

পরিসংখ্যান আর ভয়াবহ বাস্তবতা সাধারণ মানুষের মনে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি করলেও, মৃত্যুর মিছিল থামাতে সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে দৃশ্যমান ও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ এখনো যেন অধরাই রয়ে গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু রোধে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো সচেতনতা এবং সাঁতার শেখানো। সাধারণত আমাদের দেশে অভিভাবকরা শিশুদের সাঁতার শেখানোর কথা ভাবেন শিশুর বয়স ছয় বা সাত বছর পার হওয়ার পর। অথচ মৃত্যুর পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে এক থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুরা, যারা সাঁতার শেখার বয়সে পৌঁছানোর আগেই জলের কোলে হারিয়ে যাচ্ছে।

স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, বিভিন্ন এনজিও এবং সংস্থা শিশুদের সাঁতার শেখানোর জন্য নানা প্রকল্পের কথা বললেও বাস্তবে তার কোনো অস্তিত্ব চোখে পড়ে না। কাগজে-কলমে প্রকল্প দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের বিস্তর অভিযোগ থাকলেও, তৃণমূলের মায়েরা জানেন না কীভাবে তাদের সন্তানদের এই নীরব ঘাতকের হাত থেকে বাঁচাবেন।

নেত্রকোনা জেলা পুলিশের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বর্ষা মৌসুমেই এই মৃত্যুর হার সবচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসের চিত্রটি শিউরে ওঠার মতো। জানুয়ারিতে তিন জন, ফেব্রুয়ারিতে মৃত্যুহীন, মার্চে চার জন, এপ্রিলে ছয় জন, মে মাসে ১৫ জন, জুরে সর্বোচ্চ ২৭ জন, জুলাইয়ে নয় জন এবং আগস্ট আসে ১৮ জন।

জেলার ১০টি উপজেলার মধ্যে পাহাড়ি ঢল ও হাওরবেষ্টিত কলমাকান্দা উপজেলায় মৃত্যুর এই হার সবচেয়ে বেশি।

নেত্রকোনা জনউদ্যোগ-এর সভাপতি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী বিষয়টির সামাজিক ও ভৌগোলিক কারণগুলো তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “নেত্রকোনা মূলত নদী, খাল-বিল আর হাওরবেষ্টিত। বর্ষায় চারদিক পানিতে থৈ থৈ করে। গ্রামের যৌথ পরিবারগুলো ভেঙে যাওয়ায় এখন শিশুদের দেখভালের জন্য পরিবারে বাড়তি মানুষ থাকে না। মাকেই সংসারের সব কাজ সামলাতে হয়। মায়েরা যখন উঠানে বা ঘরে শিশুকে বসিয়ে রেখে কাজে যান, তখনই ঘটে বিপত্তি।”

এই সংকট থেকে উত্তরণের পথও বাতলে দিয়েছেন তিনি। তার মতে, “গ্রামে গ্রামে বেশি বেশি সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাতে হবে। কর্মজীবী মায়েদের জন্য গ্রামে শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র (ডে-কেয়ার) গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। এছাড়া বাড়ির চারপাশে পুকুর বা ডোবা থাকলে তা বাঁশের খুঁটি বা নেট দিয়ে ঘিরে রাখতে হবে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিটি শিশুকে সাঁতার শেখানোর ব্যবস্থা করা জরুরি।”

জনসাধারণের উদ্বেগ আর সচেতন মহলের দাবির প্রেক্ষিতে প্রশাসনের উদ্যোগ নিয়ে কথা হয় নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমানের সাথে। তিনি মর্মান্তিক মৃত্যুগুলোকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

জেলা প্রশাসক বলেন, “পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর হার রোধকল্পে আমরা ইতোমধ্যে প্রতিটি উপজেলায় জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম হাতে নিয়েছি। জেলা পর্যায়ে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং প্রতিটি উপজেলার উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের (ইউএনও) এ ব্যাপারে সভা ডেকে সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”

তিনি আরও জানান, শিশুদের সাঁতার শেখানোর জন্য স্থানীয় পুকুরগুলোকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। শিশুদের কীভাবে অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর হাত থেকে সুরক্ষা দেওয়া যায়, তা নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ কর্মপরিকল্পনা তৈরির কাজ চলছে।

প্রতিটি শিশুই একটি পরিবারের স্বপ্ন, একটি দেশের ভবিষ্যৎ। উঠোন পেরুলেই যেন মৃত্যুর ফাঁদ- এই ভয়ংকর বাস্তবতা থেকে নেত্রকোনার শিশুদের বাঁচাতে কেবল কাগজের পরিকল্পনা নয়, প্রয়োজন মাঠপর্যায়ে তার দ্রুত বাস্তবায়ন। মায়েদের সচেতনতা, বাড়ির চারপাশের জলাশয়গুলো সুরক্ষিত করা এবং কার্যকর সাঁতার প্রশিক্ষণের মাধ্যমেই হয়তো একদিন থামবে এই মৃত্যুর মিছিল। মায়ের কোল যেন আর অকালে খালি না হয়, সেটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব এখন রাষ্ট্র ও সমাজ- সবার।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : রূপসী দুর্গাপুর: সোমেশ্বরী আর গারো পাহাড়ের হাতছানি, বিকাশের অপেক্ষা

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন