নেপালে চলমান ভারী বৃষ্টিপাত, বন্যা ও ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে ভ্রমণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশি পর্যটকদের সতর্ক করেছে বাংলাদেশ দূতাবাস। স্থানীয় সময় রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) রাতে কাঠমান্ডুতে এক সতর্ক বার্তায় এ তথ্য জানানো হয়।
সতর্ক বার্তায় বলা হয়েছে, নেপালে চলমান ভারী বৃষ্টিপাত, বন্যা ও ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বাংলাদেশি পর্যটক ও ট্রেকারদের সতর্কতার সঙ্গে চলাচল করতে হবে। আবহাওয়া ও সার্বিক পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতি বিবেচনায় ভ্রমণ থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে পিসাং, চামে, মানাং ও আশপাশের পর্যটন এলাকাগুলোতে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের কথা জানিয়েছে দূতাবাস। অব্যাহত বৃষ্টিপাতের কারণে ভূমিধস এবং তুষারপাতের ফলে বিভিন্ন স্থানে সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে। দুর্গম ভূপ্রকৃতি ও যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ধার কার্যক্রমও কঠিন হয়ে পড়েছে।
এ ছাড়া ভূমিধসের কারণে সড়ক যোগাযোগ ও নিকটবর্তী ট্রেকিং গন্তব্যে যাতায়াত ব্যাহত হওয়ায় পোখারা ও আশপাশের এলাকায় ভ্রমণের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। মুস্তাং, জমসম ও অন্যান্য পার্বত্য এলাকায় যাওয়ার আগে গান্দাকি প্রদেশের বিভিন্ন সড়কের যোগাযোগ পরিস্থিতি সম্পর্কে যথেষ্ট তথ্য নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কারণ এসব সড়ক যোগাযোগ যেকোনো সময় বিঘ্নিত হতে পারে।
বাংলাদেশি নাগরিকদের অন্নপূর্ণা, মানাং, মুস্তাং ও মানাসলু অঞ্চলসহ বিভিন্ন পার্বত্য ও ভূমিধসপ্রবণ এলাকায় ট্রেকিং, পর্বতারোহণ ও ভ্রমণের পরিকল্পনার আগে সব তথ্য যাচাই করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি নেপাল সরকার ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের জারি করা নির্দেশনা ঘনিষ্ঠভাবে অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
দূতাবাস জানিয়েছে, তারা নেপালের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার পাশাপাশি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তী হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করা হবে।
এদিকে নেপালে ভয়াবহ তুষারধসের ঘটনাও ঘটেছে। এতে অন্তত ১৪ জন নেপালি নিখোঁজ হয়েছেন। খারাপ আবহাওয়ার কারণে ৭ হাজার ১২৬ মিটার উচ্চতার পর্বতশৃঙ্গে হেলিকপ্টার পৌঁছাতে পারছে না বলে জানিয়েছেন ট্রেকিং কর্মকর্তারা। ফলে উদ্ধার অভিযান ব্যাহত হচ্ছে বলে জানা গেছে।
সংবাদমাধ্যম কাঠমান্ডু পোস্ট জানিয়েছে, দেশটির মানাং জেলার নার ফু এলাকায় হিমলুং হিমালে এই তুষারধসের ঘটনা ঘটে। রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে সরকারি সংস্থা ও বেসরকারি উদ্ধারকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে উদ্ধার তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন হিমালয়ান হলিডেজ ট্রেকিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা বিভূতি চাঁদ ঠাকুর।
গত ২৬ আগস্ট নেপালের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় দেড় হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং এখনো নিখোঁজ রয়েছেন হাজার হাজার মানুষ।
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক বন্যার কারণ অনুসন্ধানে প্রাথমিক তদন্তে একটি হিমবাহ ধসে পড়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। এর মধ্য দিয়ে হিমালয়ের বরফ দ্রুত গলে যাওয়ার বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে বলে বিবিসিকে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
ভূমিকম্পের প্রাথমিক খবর পাওয়ার পর অনেকেই ধারণা করেছিলেন, ভূকম্পনের কারণে ভূমিধস হয় এবং সেখান থেকেই বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। এই ঘটনায় অন্তত ৪৮৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।
তবে পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানায়, ‘হিমবাহ ধসে পড়া’র কারণে এই দুর্যোগ ঘটে। অর্থাৎ কোনো হিমবাহ বা হিমবাহের একটি অংশ ভেঙে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
ইউএসজিএসের তথ্য এবং ঘটনাটি বিশ্লেষণ করা বিজ্ঞানীদের মতে, ধসে পড়া হিমবাহ উপত্যকার তলদেশে আঘাত হানার সময় এতটাই শক্তিশালী অভিঘাত তৈরি হয়েছিল যে, সেটি ৫ দশমিক ২ মাত্রার কম্পন হিসেবে রেকর্ড হয়।
ডান্ডি বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমবাহ বিশেষজ্ঞ ড. সাইমন কুক বিবিসিকে বলেন, তার দলের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, নেপালের লাংটাং লিরুং শৃঙ্গের কাছে একটি হিমবাহের নিচের অংশ ধসে পড়েছে। বন্যাকবলিত এলাকা থেকে ওই স্থানটি প্রায় ১৫ কিলোমিটার (৯ মাইল) পশ্চিমে।
তার ধারণা, হিমবাহটি উত্তর-পশ্চিম দিকে ধসে পড়ে এবং পরে পানির স্রোতের সঙ্গে পশ্চিম দিকে নিচে নেমে আসে।
আন্তঃসরকারি বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট (আইসিআইএমওডি) এক বিশ্লেষণে জানিয়েছে, ‘অনেক উপরের কোনো এলাকা থেকে বরফ-পাথরের ধস’ নেমে থাকতে পারে।
এর ফলে বিপুল পরিমাণ বরফ ও পাথরের ধ্বংসাবশেষ ভোটেকোশী নদীর একটি শাখা নদী লেন্দে খোলায় গিয়ে পড়ে। এতে নদীতে হঠাৎ প্রবল স্রোত তৈরি হয় এবং পানি, পলি ও বড় বড় পাথর ভাটির দিকে বয়ে যায়।
আইসিআইএমওডির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে ভাটির দিকের নদীগুলোতে পানির উচ্চতা ৭ থেকে ৯ মিটার বেড়ে যায়। পানির প্রবল স্রোতে বেশ কয়েকটি পানি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র ভেসে যায় বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ সায়েন্সেসের অধ্যাপক মাইক সার্ল বলেন, ভূমিধস থেকে বন্যা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি ঘটতে কয়েক ঘণ্টা, এমনকি কয়েক দিনও সময় লাগতে পারে।
“ধ্বংসাবশেষের বিপুল ঢেউ দেখে মনে হচ্ছে, প্রথমে হয়তো ভূমিধস হয়েছিল। এরপর পানি জমে নদীর প্রবাহ আটকে যায় এবং শেষ পর্যন্ত সেটি বাঁধ ভেঙে এক বিশাল বন্যার আকারে নেমে আসে”, বিবিসিকে বলেন তিনি।
এলাকার ভূপ্রকৃতিও বন্যার ভয়াবহতা বাড়িয়ে থাকতে পারে বলে মনে করেন সার্ল। তার ভাষ্য, লাংটাং লিরুং উচ্চ হিমালয়ের চূড়ায় অবস্থিত এবং পর্বতটির দুই পাশে রয়েছে “অত্যন্ত খাড়া উপত্যকা”। এসব উপত্যকা পানিকে আরও বেশি গতিতে নিচের দিকে প্রবাহিত করে থাকতে পারে।
তবে হিমবাহটি কেন ধসে পড়েছিল, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সার্ল বলেন, হিমালয়ের অন্যান্য এলাকার মতো লাংটাং লিরুংও দীর্ঘমেয়াদি টেকটোনিক গতিবিধির কারণে ধীরে ধীরে ওপরে উঠছে। এ প্রক্রিয়ায় একটি ভূত্বকীয় প্লেট আরেকটি প্লেটকে ওপরে ঠেলে দেয়।
“এটা অনেকটা গাড়ির নিচে জ্যাক বসিয়ে সেটি ওপরে তোলার মতো”, বলেন তিনি।
“পর্বতটি যত ওপরে উঠছে, হিমবাহও তত খাড়া হয়ে উঠছে। ফলে এর কিছু অংশ খসে পড়া অনিবার্য।”
সার্ল জানান, এসব ক্ষেত্রে সাধারণত তুলনামূলক ছোট ছোট বরফের খণ্ড খসে পড়ে। এতে সাময়িকভাবে নদীর প্রবাহ আটকে গেলেও পরে সেগুলো সহজেই পানির স্রোতে ভেসে যায়।
তবে এবারের দুর্যোগে পুরো হিমবাহটি ‘একসঙ্গে’ ধসে পড়েছে বলে মনে হচ্ছে, যা সার্লের ভাষায় “খুবই অস্বাভাবিক”। তিনি বলেন, “এ ধরনের বন্যা সব সময়ই হয়, কিন্তু এত বড় মাত্রায় নয়।”
সার্লের মতে, বুধবারের ঘটনাটি সম্ভবত দুটি ভিন্ন প্রক্রিয়ার কারণে ঘটেছে।
“একদিকে হিমালয়ের ভূত্বকীয় গতিবিধির কারণে পর্বতশ্রেণির ওপরে উঠে যাওয়া, অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা এবং হিমবাহ গলে যাওয়া।”
“এই সবকিছু মিলেই এমন ভয়াবহ দুর্যোগ তৈরি করছে, যা আমরা এখন নিয়মিতই দেখতে পাচ্ছি।”
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয়ে বরফ ও পারমাফ্রস্ট—অর্থাৎ শত শত বছর ধরে জমাট হয়ে থাকা মাটি—গলে যাওয়ার বিষয়ে বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরেই সতর্ক করে আসছেন।
চলতি বছরের শুরুতে আইসিআইএমওডির প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০০০ সালের তুলনায় বর্তমানে হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহগুলো দ্বিগুণ হারে বরফ হারাচ্ছে। এর ফলে বন্যার মতো বিভিন্ন ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
ড. কুক উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত, সুইজারল্যান্ড ও ইতালিতেও হিমবাহ ধসে বন্যা ও ভূমিধসের একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে।
২০২১ সালে উত্তর ভারতের চামোলি উপত্যকায় হিমালয়ের একটি হিমবাহের বড় একটি অংশ ধসে পড়ে। এতে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ ও পানি ভাটির দিকে নেমে আসে এবং ২০০ জনের মৃত্যু হয়।
পরে বিজ্ঞানীরা হিসাব করে জানান, ওই ধসের অভিঘাত ছিল ১৫টি পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণের সমতুল্য।
এমনকি নেপালেও একই অঞ্চলে গত বছর তিব্বতে একটি হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদের বাঁধ ভেঙে বন্যা হয়েছিল।
আইসিআইএমওডির বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফারুক আজম বলেন, ক্রায়োস্ফিয়ারে—অর্থাৎ পৃথিবীর হিমায়িত অংশগুলোতে—বিপদের ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে এবং “আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন তা আরও স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে। পরিবর্তনের গতি এতটাই দ্রুত।”
কোনো একটি নির্দিষ্ট ঘটনা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘটেছে কি না, তা বলা কঠিন বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। তবে ড. কুক বলেন, “এসব ঘটনার ধরন যখন আপনি দেখবেন, তখন মনে হবে এতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থাকতে পারে।”
“যুক্তিটা হলো, পৃথিবী উষ্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হিমবাহের আকার ছোট হবে, বিপুল পরিমাণ তুষার গলবে। কিছু পর্বতের ঢালকে আংশিকভাবে ধরে রাখা পারমাফ্রস্ট উষ্ণ হয়ে গলতে এবং ক্ষয় হতে শুরু করছে।”
“ফলে আরও বেশি ভূমিধস, ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ, হিমবাহের গলিত পানি, হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদের পানি উপচে পড়া এবং হিমবাহ ধসে পড়ার ঘটনা ঘটবে। কারণ শেষ পর্যন্ত জলবায়ুর উষ্ণতা উচ্চ পার্বত্য এলাকাগুলোর পরিবেশকে অস্থিতিশীল করে তোলে।”
পড়ুন : জানুয়ারিতেই সংসদে উঠবে সংবিধান সংশোধন বিল, পাস হলেই গণভোট
সা/


