সামরিক সংঘাতের অবসান ও হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে ইরানের দেওয়া প্রস্তাব মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রত্যাখ্যান করার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আবারও বেড়েছে।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) একপর্যায়ে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৫ ডলার ছাড়িয়ে যায়। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কায় তেলের বাজারে এই ঊর্ধ্বগতি দেখা দিয়েছে।
সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড জানিয়েছে, তেহরানের শান্তি প্রস্তাব ট্রাম্প প্রত্যাখ্যান করার পর মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ১ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
সোমবার বাংলাদেশ সময় সকাল পৌনে ৭টার দিকে ভবিষ্যৎ সরবরাহের জন্য ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৫ দশমিক ৬৪ ডলারে দাঁড়ায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৩ দশমিক ১১ ডলারে পৌঁছায়।
এর আগে গত সপ্তাহে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে সামরিক সংঘাত বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে শান্তি উদ্যোগের কথা জানায় ইরান। কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে প্রস্তাবটি ওয়াশিংটনে পাঠানো হয়েছিল বলেও নিশ্চিত করে তেহরান।
এরপর শনিবার ট্রাম্প জানান, তিনি ইরানের ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। তবে রোববার ফোনে অ্যাক্সিওসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, চলতি সপ্তাহে মার্কিন আলোচকরা ইরানের সঙ্গে আরও আলোচনা করবেন বলে তিনি আশা করছেন।
সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে ব্রেন্টের দাম ০ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছিল। অন্যদিকে ডব্লিউটিআইয়ের দাম কমেছিল ৭ দশমিক ৯ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির দাম রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ডিজেল রপ্তানি নিষিদ্ধ করতে পারে মার্কিন প্রশাসন—এমন আশঙ্কা থেকেই ডব্লিউটিআইয়ের দামে বড় পতন হয়েছিল। এমন পদক্ষেপ নেওয়া হলে যুক্তরাষ্ট্রের তেল শোধনাগারগুলোর উৎপাদন কমে যেতে পারে।
এদিকে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত তেল সরবরাহ বাড়ানোয় মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো থেকে সেপ্টেম্বরে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি বেড়ে দৈনিক ১ কোটি ২৮ লাখ ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে। সোমবার কেপলারের প্রাথমিক জাহাজ চলাচলসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর এটি সর্বোচ্চ রপ্তানি।
মূলত হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল আবার বাড়ায় রপ্তানিতে এই বৃদ্ধি হয়েছে। চলতি মাসে এই প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৭৪ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলায় সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর দেশটি লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর থেকে তেল রপ্তানি কমিয়ে পূর্বাঞ্চলের রাস তানুরা টার্মিনাল দিয়ে রপ্তানি বাড়িয়েছে। এর পরই তেল সরবরাহে এই পরিবর্তন দেখা যায়।
ইরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ট্রাম্প যা বললেন
হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে ইরানের দেওয়া প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। স্থানীয় সময় শনিবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের এ কথা জানান তিনি।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে কূটনৈতিক উদ্যোগের কথা তোলে ইরান। তেহরান জানিয়েছিল, কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের কাছে এ বিষয়ে বার্তা পাঠানো হয়েছে। এর মাধ্যমে কৌশলগত নৌপথ হরমুজ প্রণালি আবার চালু করা এবং সাত দিনের মধ্যে সংঘাতের অবসান ঘটানো সম্ভব হতে পারে বলে জানায় ইরান।
টেনেসির উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে গতকাল হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমি তাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছি।…আমি তাদের চুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছি।’ মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, ‘তারা হরমুজ প্রণালি দ্রুত খুলে দেওয়ার জন্য একটি চুক্তি করতে চায়। কারণ, তারা ভয়াবহভাবে হারছে।…আমরা দারুণভাবে জিতছি।’
ট্রাম্প আরও বলেন, ‘তারা চুক্তি করতে চায়। আমিও চুক্তি করতে চাই। তারা যা করতে চায়, তা হলো দ্রুত হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া। কারণ, তাদের কোনো অর্থ নেই। তারা হরমুজ প্রণালি থেকেই অর্থ পায়।’
বর্তমানে ইরানের নৌবন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ কার্যকর রয়েছে। তেহরানকে অর্থনৈতিকভাবে চাপে ফেলতে ওয়াশিংটন এ পদক্ষেপ নিয়েছে। অন্যদিকে ইরানও তাদের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পার হতে দিচ্ছে না। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেও ট্রাম্প আবারও দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতেই রয়েছে।
ট্রাম্প ইরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন—এ খবর প্রথম প্রকাশ করে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। নাম প্রকাশ না করার শর্তে মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছিল, ট্রাম্প ইরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে সন্দিহান যে ইরান তাঁর দাবিগুলো পূরণ করবে কি না। আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে বোমা হামলা শুরু হতে পারে বলেও তিনি তাঁর কর্মীদের জানিয়েছেন।
এর আগে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে ‘ইতিবাচক ও গঠনমূলক’ আলোচনা হয়েছে।
পড়ুন : কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে কুমিল্লায় ৪১৫ জন আটক
সা/


