কুমিল্লায় কিশোর গ্যাং ও বখাটেদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে ৪১৫ জনকে আটক করেছে পুলিশ। রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা ৭টা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন এলাকায় এ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
পুলিশ জানায়, কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত রয়েছে এমন বিভিন্ন স্থান, আড্ডাস্থল ও অপরাধপ্রবণ এলাকায় অভিযান চালানো হয়েছে। এতে জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও সরাসরি অংশ নেন।
কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) লুৎফর রহমান জানান, আটক ৪১৫ জন কোনো ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত কি না, তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। যাচাই শেষে অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, উঠতি বয়সী কিশোরদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া ঠেকাতে নিয়মিত এ ধরনের অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে জেলা পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
এদিকে কিশোর গ্যাং, মাদক, অনলাইন জুয়া ও বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে কিশোর-তরুণদের দূরে রাখতে চাঁদপুর ও লক্ষ্মীপুরেও বিশেষ অভিযান চালিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত দুই জেলার বিভিন্ন সড়ক, বাজার ও আড্ডাস্থলে চালানো অভিযানে কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততার সন্দেহে ৬০২ জনকে আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে চাঁদপুরে ৩৫৮ জন এবং লক্ষ্মীপুরে ২৪৪ জন আটক হয়েছেন।
চাঁদপুরের আট উপজেলায় আটক করা হয়েছে—চাঁদপুর সদরে ৩৫, মতলব উত্তরে ৫৩, মতলব দক্ষিণে ৩৭, ফরিদগঞ্জে ৪১, শাহরাস্তিতে ৪৫, কচুয়ায় ৬২, হাজীগঞ্জে ৩৭ এবং হাইমচরে ৪৮ জন।
পুলিশ জানিয়েছে, আটক ব্যক্তিদের পরিচয় ও অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। অভিযানে কয়েকজনের কাছ থেকে মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি মোবাইল ফোনে অনলাইন গেমের মাধ্যমে জুয়া খেলার সময় কয়েকজন কিশোরকেও আটক করা হয়।
চাঁদপুরের পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান বলেন, জেলার সব থানায় একযোগে অভিযান চালানো হয়েছে। অভিযানের অংশ হিসেবে দুটি মোবাইল কোর্টও পরিচালনা করা হয়। যাদের কাছে মাদক পাওয়া গেছে, তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে। আর অন্য কিশোরদের পরিবারের জিম্মায় দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, কিশোর গ্যাং, মাদক, ইভটিজিং ও অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
লক্ষ্মীপুরের রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নিজাম উদ্দিন বলেন, কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়া ঠেকাতে পুলিশ নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। কিশোর গ্যাং বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একই সঙ্গে সন্তানদের চলাফেরা ও বন্ধুবান্ধবের বিষয়ে নজর রাখতে অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
কুমিল্লায় ১৮টি থানায় একযোগে কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। শনিবার রাত ৮টা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলা এ অভিযানে ২৫৪ জনকে আটক করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে কুমিল্লা নগরের আলোচিত ‘রতন গ্রুপ’ বা ‘আর স্কোয়াডের’ চার সক্রিয় সদস্য রয়েছেন। তাঁদের একজন আনিসুর রহমান ওরফে আনিক (১৯), যিনি গ্রুপটির ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ হিসেবে পরিচিত।
কুমিল্লা জেলা পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমান জানান, কিশোর গ্যাংবিরোধী নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবে ১৮টি থানায় একযোগে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। নগরসহ প্রতিটি থানা এলাকার যেসব স্থানে উঠতি বয়সী বখাটেদের উৎপাত ও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা রয়েছে, সেসব স্থান চিহ্নিত করে অভিযান চালানো হয়।
লুৎফর রহমান বলেন, ‘অভিযানে ২৫৪ জনকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততা যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। উঠতি বয়সী কিশোরেরা যেন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়াতে না পারে, সে জন্য জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে নিয়মিত এ ধরনের অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।’
এদিকে গত শনিবার রাতে কুমিল্লা নগরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৩৭ জনকে আটক করেছে কোতোয়ালি মডেল থানার পুলিশ। পুলিশের দাবি, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে চারজন কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সরাসরি জড়িত এবং তাঁরা সবাই রতন গ্রুপের সক্রিয় সদস্য।
আটক চারজনের একজন আনিসুর রহমান ওরফে আনিক (১৯)। তিনি নগরের ছোটরা মফিজাবাদ কলোনির আবুল কাশের ছেলে। পুলিশের ভাষ্য, আনিক রতন গ্রুপের প্রধান ইমরান হোসেন ওরফে রতনের ভাগনে। রতন বর্তমানে আত্মগোপনে থাকায় আনিকই গ্রুপটির কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের হাতে সংঘটিত একটি হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি ছিলেন আনিক। ওই মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল। পরে জামিনে বের হয়ে আবার গ্যাংয়ের নেতৃত্বে যুক্ত হন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ওসি তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, ‘শনিবারের অভিযানে আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ছিনতাই ও নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততাসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের বিস্তারিত নাম-পরিচয় ও আগের অপরাধের তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। এরপর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এর আগে গত বুধবার সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কুমিল্লার ১৮টি থানায় একযোগে কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান চালানো হয়। ওই অভিযানে পুলিশ ৬২৪ জনকে আটক করে। তাঁদের মধ্যে ৪৫১ জনকে মুচলেকায় অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়। বাকি ১৭৩ জনের বিরুদ্ধে মাদক সেবন, নিয়মিত মামলা, ভ্রাম্যমাণ আদালত, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানাসহ বিভিন্ন অভিযোগে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নতুন নয়। তবে ১৩ বছর বয়সী সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।
১৮ সেপ্টেম্বর কোটবাড়ির গন্ধমতী এলাকার বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় অপ্রতিম। পরদিন সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর ইউনিয়নের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের একটি নির্জন জঙ্গল থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাঁদের মধ্যে দুজন অপ্রাপ্তবয়স্ক। পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের মূলহোতা ১৯ বছর বয়সী সাইফুল ইসলাম তুহিনসহ তিনজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। অপর একজনকে হত্যাকাণ্ডের সহযোগী হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
কুমিল্লা নগরে আলোচিত কিশোর গ্যাংগুলোর একটি রতন গ্রুপ বা আর স্কোয়াড। ২০১৫ সালের দিকে নগরে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা আলোচনায় আসার পর বিভিন্ন সময়ে গ্রুপটির নাম সামনে এসেছে।
পড়ুন : ফটিকছড়িতে ৭ ইসলামি দলের বৈঠক: চূড়ান্ত হয়নি ঐক্য, পরবর্তী বৈঠক ঢাকায়
সা/


