এক দিনে তিনটি ওয়ানডে ম্যাচ, আর তাতে ছয়টি সেঞ্চুরি—আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এমন ঘটনা আগে কখনো দেখা যায়নি। ২০২৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর তাই জায়গা করে নিল রেকর্ডের পাতায়। ভারত–ওয়েস্ট ইন্ডিজ, দক্ষিণ আফ্রিকা–অস্ট্রেলিয়া এবং ইংল্যান্ড–শ্রীলঙ্কার ম্যাচে ছয় ব্যাটার সেঞ্চুরি করায় একই দিনে তিন ওয়ানডেতে ছয় শতকের নতুন রেকর্ড হয়েছে।
রোববার ব্যাট হাতে দুর্দান্ত সময় কাটিয়েছেন বিরাট কোহলি, শুবমান গিল ও ডেভিড মিলাররা। তিরুবনন্তপুরম, জোহানেসবার্গ ও লন্ডনের দ্য ওভালে অনুষ্ঠিত তিন ম্যাচেই দেখা গেছে সেঞ্চুরির উৎসব। বিরাট কোহলি, শুবমান গিল, জাস্টিন গ্রিভস, টেম্বা বাভুমা, ডেভিড মিলার ও টম ব্যান্টন—ছয় ব্যাটারই পেয়েছেন তিন অঙ্কের দেখা।
সবচেয়ে বেশি সেঞ্চুরি এসেছে ভারত–ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে প্রথমে শতক করেন জাস্টিন গ্রিভস। জবাবে ব্যাট করতে নেমে শুবমান গিল ও বিরাট কোহলির সেঞ্চুরিতে ম্যাচ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় ভারত। গিল করেন ১১০ রান, আর কোহলি ১৩৯ রানে অপরাজিত থেকে দলকে ৮ উইকেটের জয় এনে দেন।
কোহলির ইনিংসটি জয়ের পাশাপাশি আরও একটি কারণে উল্লেখযোগ্য। ওয়ানডেতে এটি তার ৫৫তম সেঞ্চুরি। একই ইনিংসে তিনি পূর্ণ করেন ওয়ানডে ক্রিকেটে ১৫ হাজার রানের মাইলফলক।
জোহানেসবার্গে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটিংয়েও দেখা যায় দুটি সেঞ্চুরি। অধিনায়ক টেম্বা বাভুমার পাশাপাশি তিন অঙ্কের ঘরে পৌঁছান অভিজ্ঞ ব্যাটার ডেভিড মিলার। তাদের বড় ইনিংসের ওপর ভর করে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বড় সংগ্রহ গড়ে দক্ষিণ আফ্রিকা।
দিনের শেষ ম্যাচে দ্য ওভালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ইংল্যান্ডের হয়ে সেঞ্চুরি করেন টম ব্যান্টন। ওয়ানডেতে এটি ছিল তার প্রথম শতক। ১২৬ রানের ইনিংসে ইংল্যান্ডের বড় সংগ্রহের ভিত গড়ে দেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ড ৩৫৫ রান করে শ্রীলঙ্কাকে ২২৩ রানে হারায় এবং ২–১ ব্যবধানে সিরিজও জিতে নেয়।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডেতে ৮ উইকেটের দাপুটে জয় পেয়েছে ভারত। সফরকারীদের করা ২৯৫ রানের জবাবে ৪১.৪ ওভারে ২ উইকেট হারিয়ে ৩০০ রান করে ম্যাচ জিতে নেয় স্বাগতিকরা। ভারতের জয়ে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন বিরাট কোহলি ও শুবমান গিল। কোহলি ৮৮ বলে ১৩৯ রানে অপরাজিত থাকেন, আর গিল করেন ১০৮ বলে ১১০ রান। ফলে ৫০ বল হাতে রেখেই লক্ষ্যে পৌঁছে যায় ভারত।
টস জিতে প্রথমে ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয় ভারত। ব্যাট করতে নেমে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ভালো শুরু এনে দেন জন ক্যাম্পবেল ও জাস্টিন গ্রিভস। উদ্বোধনী জুটিতে তারা যোগ করেন ১৩৫ রান। ১৯.২ ওভারে কুলদীপ যাদবের বলে ক্যাম্পবেল আউট হলে ভাঙে এই জুটি। ৬০ বলে ৬২ রান করেন তিনি। তার ইনিংসে ছিল ৬টি চার ও ৩টি ছক্কা।
ক্যাম্পবেল ফেরার পর কিসি কার্টির সঙ্গে জুটি গড়েন গ্রিভস। তবে দলীয় ১৭৬ রানে ৩১ বলে ১৩ রান করা কার্টিকে প্রাসিধ কৃষ্ণের বলে শুবমান গিলের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফিরতে হয়। এরপর অধিনায়ক শাই হোপও বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। ১১ বলে ১২ রান করে ৩৩.৫ ওভারে কুলদীপ যাদবের বলে রবীন্দ্র জাদেজার হাতে ক্যাচ দেন তিনি।
এর আগে নিজের সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন গ্রিভস। ১০৮ বলে ১০১ রানের ইনিংসে ১২টি চার মারেন তিনি। ইনিংসের বড় অংশজুড়েই ওয়েস্ট ইন্ডিজের রান এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব পালন করেন এই ব্যাটার। ৩৫.৩ ওভারে ১৯৮ রানে চতুর্থ উইকেট হিসেবে গ্রিভসের বিদায়ের পর ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইনিংসে কিছুটা ছন্দপতন ঘটে। পরের বলেই কোনো রান না করে আউট হন জুয়েল অ্যান্ড্রু। দুজনের উইকেটই নেন কুলদীপ।
শেষ দিকে আমির জাঙ্গু দ্রুত রান তুলে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে লড়াইয়ের মতো সংগ্রহ এনে দেন। ৪৩ বলে ৫৮ রানে অপরাজিত থাকেন তিনি। তার ইনিংসে ছিল ৭টি চার ও একটি ছক্কা। রস্টন চেজ ৩২ বলে ২৪ রান করেন। ম্যাথিউ ফোর্ডে ১২ বলে ৭ রান করে ফেরেন। শেষদিকে গুদাকেশ মোতি ৪ বলে ৪ রানে অপরাজিত থাকেন। ৫০ ওভার শেষে ৭ উইকেটে ২৯৫ রান সংগ্রহ করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
ভারতের বোলারদের মধ্যে সবচেয়ে সফল ছিলেন কুলদীপ যাদব। ১০ ওভার বল করে ৪০ রান দিয়ে ৪ উইকেট নেন তিনি। একটি মেডেনও করেন বাঁহাতি এই স্পিনার। তার শিকারে ছিলেন ক্যাম্পবেল, শাই হোপ, জুয়েল অ্যান্ড্রু ও জাস্টিন গ্রিভস। প্রাসিধ কৃষ্ণ ১০ ওভারে ৬০ রান দিয়ে ২ উইকেট নেন। নিতীশ কুমার রেড্ডি নেন একটি উইকেট।
২৯৬ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ভারতকে উড়ন্ত সূচনা এনে দেন রোহিত শর্মা ও শুবমান গিল। প্রথম উইকেট জুটিতে ৪৭ বলে ৫০ রান যোগ করেন তারা। ১১.৬ ওভারে দলীয় ৭৪ রানে রোহিত শর্মা বিদায় নেন। আলজারি জোসেফের বলে জুয়েল অ্যান্ড্রুর হাতে ক্যাচ দেওয়ার আগে ৩৫ বলে ৩২ রান করেন তিনি। তার ইনিংসে ছিল ২টি চার ও ৩টি ছক্কা।
রোহিত ফেরার পর ইনিংসের নিয়ন্ত্রণ নেন গিল ও কোহলি। দ্বিতীয় উইকেটে এই দুই ব্যাটার যোগ করেন ১৫১ রান। গিল ৪৯ বলে ফিফটি পূর্ণ করেন। এরপর ৯৬ বলে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন তিনি। তার ১১০ রানের ইনিংসে ছিল ১৩টি চার ও একটি ছক্কা। ৩৩.৬ ওভারে দলীয় ২২৫ রানে রস্টন চেজের বলে আউট হন গিল।
গিলের বিদায়ের পরও ভারতের রান তোলার গতি কমেনি। বরং বিরাট কোহলি নিজের ইনিংসকে আরও আক্রমণাত্মক করে তোলেন। মাত্র ৭৪ বলে শতক পূর্ণ করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ৮৮ বলে ১৩৯ রানে অপরাজিত থাকেন কোহলি। তার ইনিংসে ছিল ১০টি চার ও ৯টি ছক্কা। ১৫৭.৯৫ স্ট্রাইক রেটে ব্যাট করে তিনি ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলিং আক্রমণের ওপর চাপ ধরে রাখেন।
কোহলির সঙ্গে শেষ পর্যন্ত অপরাজিত থাকেন রুতুরাজ গায়কোয়াড়। তিনি করেন ১৯ বলে ১৩ রান। কোহলি ও গায়কোয়াড় তৃতীয় উইকেটে ৩৮ বলে ৫০ রান যোগ করেন। ৪১.৪ ওভারে ভারত ৩০০ রান পূর্ণ করতেই ম্যাচ শেষ হয়ে যায়। ফলে ৫০ বল হাতে রেখে ৮ উইকেটের জয় পায় স্বাগতিকরা।
ভারতের রান তোলার গতি পুরো ইনিংসজুড়েই ছিল দ্রুত। ১৫.৫ ওভারে ১০০, ২৪.৩ ওভারে ১৫০ এবং ৩০.১ ওভারে ২০০ রান পূর্ণ করে তারা। এরপর ৩৭.৫ ওভারে ২৫০ এবং ৪১.৪ ওভারে ৩০০ রানের মাইলফলক ছুঁয়ে ফেলে ভারত। শেষ ৫০ রান করতে তাদের প্রয়োজন হয়েছে মাত্র ২৩ বল।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলারদের মধ্যে আলজারি জোসেফ ৯ ওভারে ৮১ রান দিয়ে একটি উইকেট নেন। রস্টন চেজ ১০ ওভারে ৬৪ রান দিয়ে একটি উইকেট শিকার করেন। তবে ভারতীয় ব্যাটারদের থামাতে পারেননি তারা। কোহলি ও গিলের ব্যাটিংয়ে শুরু থেকেই চাপে পড়ে যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলিং আক্রমণ।
পড়ুন : মিরাজকে নিলো ওয়ালটন, হৃদয়-মুশফিকরা কে কোথায়
সা/


