রবি মৌসুম সামনে রেখে কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার যখন বড় পরিসরে আমদানি ও আগাম মজুতের উদ্যোগ নিয়েছে, তখনই সরকারি সংস্থার একটি পরিবহন কার্যাদেশ নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। লে-ক্যানের (Laycan) নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হলেও সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোর উপস্থিতি সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য মিলছে না। এর মধ্যেই একই প্রতিষ্ঠানের নামে একের পর এক নতুন কার্যাদেশ দেওয়ার বিষয়টি আরও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)-এর সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মরক্কো ও সৌদি আরব থেকে জিটুজি ব্যবস্থায় আমদানি করা টিএসপি ও ডিএপি সার পরিবহনের জন্য ডেইলি ট্রেডিং নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে মোট ১০টি লটে প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টনের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে প্রথম আটটি লটের লে-ক্যানের সময়সীমা ২৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জাহাজ লোডিং পোর্টে পৌঁছেছে কি না, সে বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে কার্যাদেশ থাকা সত্ত্বেও জাহাজের অবস্থান, লোডিংয়ের সময় এবং সার দেশে পৌঁছানোর সম্ভাব্য সময় নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের প্রশ্ন, আগের লটগুলোর কার্যাদেশ বাস্তবায়নের অবস্থাই যখন পরিষ্কার নয়, তখন একই প্রতিষ্ঠানকে পরবর্তী লটের জন্য কার্যাদেশ দেওয়ার প্রক্রিয়া কীভাবে এগোল?
লে-ক্যান পেরোলেই বাড়ে সরবরাহের ঝুঁকি
সার পরিবহনে লে-ক্যান কেবল একটি নির্দিষ্ট তারিখ নয়; এটি জাহাজের লোডিংয়ের জন্য নির্ধারিত সময়সীমা। ওই সময়ের মধ্যে জাহাজ না পৌঁছালে লোডিং পিছিয়ে যেতে পারে। এরপর রয়েছে সমুদ্রযাত্রা, বন্দরে জাহাজ ভেড়ানো, সার খালাস, ব্যাগিং, পরিবহন এবং গুদামে পৌঁছানোর মতো একাধিক ধাপ।
অর্থাৎ শুরুতেই লে-ক্যানে বিলম্ব হলে তার প্রভাব পড়তে পারে পুরো সরবরাহ-শৃঙ্খলে। বিশেষ করে রবি মৌসুমের আগে এ ধরনের বিলম্বের গুরুত্ব আরও বেশি।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবর মাসে দেশে টিএসপির চাহিদা ৭০ হাজার ৫২ টন, ডিএপির ১ লাখ ৫০ হাজার ৯১০ টন এবং এমওপির ৯৩ হাজার ৬৫৪ টন নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে রবি-বোরো মৌসুমের জন্য আগাম সার মজুত ও সরবরাহ নিশ্চিত করার কথা জানিয়েছে সরকার।
এমন সময়ে নির্ধারিত চালান সময়মতো দেশে না পৌঁছালে সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।
১০ লটে কেন একই প্রতিষ্ঠান?
কার্যাদেশের ধারাবাহিকতাই এখন অনুসন্ধানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ডেইলি ট্রেডিংয়ের নামে ১০টি লটে মোট ৩ লাখ ৮০ হাজার টন সার পরিবহনের কার্যাদেশ দেওয়া হয়ে থাকলে প্রতিটি লটের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা, আগের কাজের বাস্তবায়ন, জাহাজের ব্যবস্থা, চার্টারারের সক্ষমতা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য পরিবহনের সামর্থ্য মূল্যায়ন করা হয়েছিল কি না—তা যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
এখন প্রশ্ন, প্রথম কয়েকটি লটের বাস্তবায়ন পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেই কি পরবর্তী কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল, নাকি কার্যাদেশগুলো ধারাবাহিকভাবেই অনুমোদিত হয়েছে?
আগের লটগুলোর লে-ক্যান যদি অতিক্রান্ত হয়ে থাকে, তাহলে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী বিএডিসি কী ব্যবস্থা নিয়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কারণ প্রথম আটটি লট নিয়ে যখন প্রশ্ন রয়েছে, তখন সামনে এসেছে আরও দুটি লট।
সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, নবম ও দশম লটের লে-ক্যান নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ থেকে ৯ অক্টোবর। প্রথম আটটি লটের জাহাজ, লোডিং ও সরবরাহ পরিস্থিতি স্পষ্ট হওয়ার আগেই পরবর্তী দুটি লটের পরিবহন পরিকল্পনা কীভাবে এগোল—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
একটি লটের বাস্তবায়ন বিলম্বিত বা ব্যর্থ হলে তার প্রভাব পরবর্তী লটের কার্যাদেশে পড়বে কি না, সেটিও চুক্তির শর্ত ও সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনা করলেই স্পষ্ট হতে পারে।
একজন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, লে-ক্যান পেরিয়ে গেলে প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত—জাহাজ কোথায়? দ্বিতীয় প্রশ্ন—কেন সময়মতো পৌঁছাল না? আর তৃতীয় প্রশ্ন—এই অবস্থায় আগের কাজের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন না করেই পরবর্তী কার্যাদেশ দেওয়া হলো কীভাবে?
তার মতে, জাহাজের নাম, আইএমও নম্বর, চার্টার পার্টি, লোডিং পোর্ট, জাহাজের সর্বশেষ অবস্থান এবং লে-ক্যানের তথ্য যাচাই করলেই অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সম্ভব।
চুক্তির শাস্তিমূলক ধারা কার্যকর হয়েছে কি?
লে-ক্যান অতিক্রমের পর চুক্তির শর্ত অনুযায়ী কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
বিষয়টি নিয়ে বিএডিসির ম্যানেজার (ক্রয়) আহমেদ হাসান আল মাহমুদের কাছে জানতে চাওয়া হয়—
লে-ক্যানের মধ্যে জাহাজ না পৌঁছালে চুক্তি অনুযায়ী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?
সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোর নাম ও বর্তমান অবস্থান কী?
জাহাজ ও চার্টারার যাচাই করা হয়েছিল কি না?
আগের লটগুলোর বাস্তবায়ন মূল্যায়ন করা হয়েছিল কি না?
বিলম্বের জন্য কোনো জরিমানা বা ক্ষতিপূরণ আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি না?
আগের কার্যাদেশের বাস্তবায়ন স্পষ্ট না হওয়ার পরও একই প্রতিষ্ঠানকে পরবর্তী কার্যাদেশ দেওয়ার কারণ কী?
সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বিএডিসি ও বিএসসির কোন কর্মকর্তারা যুক্ত ছিলেন?
আর্থিক সুবিধা বা কমিশনসংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে কোনো তদন্ত হয়েছে কি না?
জবাবে তিনি বলেন, “আমি একটু পরে কল করছি।”
এরপর তিনি ফোন কেটে দেন। পরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
ব্যবস্থা নেওয়ার কথা মন্ত্রণালয়ের
বিষয়টি নিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিএডিসির সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলা হয়েছে। ডেইলি ট্রেডিংয়ের বিরুদ্ধে আইনানুগভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।
তবে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তা এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বিস্তারিত জানা যায়নি।
এদিকে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ডেইলি ট্রেডিংকে ধারাবাহিকভাবে কার্যাদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিএডিসি ও বিএসসির কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশ এবং আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
বড় পরিসরে সার আমদানি, পরিবহনেই অনিশ্চয়তা
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রবি-বোরো মৌসুম সামনে রেখে সরকার ইতোমধ্যে বিপুল পরিমাণ সার আমদানির অনুমোদন দিয়েছে। ২৪ আগস্টের এক বৈঠকে ৩ লাখ ৬৫ হাজার টন সার আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে মরক্কো থেকে জিটুজি ব্যবস্থায় ডিএপি ও টিএসপির একাধিক লটও ছিল।
এরপর ১৬ সেপ্টেম্বর আরও ১০ লাখ ৭৫ হাজার টন সার আমদানির বিভিন্ন প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে। এর মধ্যে মরক্কো থেকে ডিএপির একাধিক লট রয়েছে।
অর্থাৎ সার আমদানির পরিকল্পনা বড় পরিসরে এগোলেও সেই সার নির্ধারিত সময়ে দেশে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে পরিবহন পর্যায়ে কোনো ধরনের জটিলতা তৈরি হলে তার প্রভাব পড়তে পারে সরবরাহ ব্যবস্থায়। লে-ক্যান অতিক্রম, জাহাজের অনিশ্চয়তা কিংবা কার্যাদেশ বাস্তবায়নে বিলম্ব হলে কাগজে আমদানির অনুমোদন থাকলেও মাঠপর্যায়ে সময়মতো সার সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে।
এখন তিন প্রশ্নের উত্তর জরুরি
ডেইলি ট্রেডিংয়ের ১০ লটে ৩ লাখ ৮০ হাজার টন সার পরিবহনের বিষয়টি সামনে আসার পর অন্তত তিনটি প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি হয়ে পড়েছে।
প্রথমত, লে-ক্যান অতিক্রান্ত প্রথম আটটি লটের জাহাজগুলো কোথায়?
দ্বিতীয়ত, নির্ধারিত সময়ে জাহাজ না পৌঁছালে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী বিএডিসি কী ব্যবস্থা নিয়েছে?
তৃতীয়ত, আগের কার্যাদেশের বাস্তবায়ন পরিস্থিতি স্পষ্ট হওয়ার আগেই একই প্রতিষ্ঠানকে পরবর্তী কার্যাদেশ দেওয়ার যৌক্তিকতা কী?
এসব প্রশ্ন কেবল একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কার্যাদেশের হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার, সার সরবরাহ ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা এবং রবি মৌসুমে কৃষকের প্রয়োজনীয় সার সময়মতো মাঠে পৌঁছানোর বিষয়ও জড়িত।
তাই কার্যাদেশ দেওয়া থেকে শুরু করে জাহাজের অবস্থান, লে-ক্যান, লোডিং, সমুদ্রযাত্রা, বন্দরে পৌঁছানো এবং সার খালাস—পুরো প্রক্রিয়াটি নথিভিত্তিকভাবে যাচাই করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
লে-ক্যান পেরিয়ে যাওয়ার পরও যদি জাহাজের অবস্থান স্পষ্ট না হয় এবং আগের কার্যাদেশের বাস্তবায়ন পরিষ্কার হওয়ার আগেই নতুন কার্যাদেশ চলতে থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—এই ধারাবাহিকতার দায় নেবে কে?
পড়ুন: অপরাধের ময়দানে কিশোর গ্যাং, আড়ালের ‘বড় ভাই’ কারা?
আর/


