ইরানের সঙ্গে চুক্তি না হলে দেশটিকে ‘উড়িয়ে দিতে’ হতে পারে বলে হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার ভাষ্য, ইরানকে ধ্বংস করা অথবা দেশটির সঙ্গে চুক্তিতে যাওয়া—এই দুই পথের একটিতে শিগগিরই যেতে হবে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্রায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ রয়েছে বলেও দাবি করেছেন তিনি।
স্থানীয় সময় বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন ট্রাম্প। ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি হবে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রয়োজনে ইরানকে ‘উড়িয়ে’ দেওয়ার কথা বলেন। একই সঙ্গে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছে বলেও সতর্ক করেন তিনি। এসব তথ্য জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা।
ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘হয়তো আপনাকে তাদের উড়িয়ে দিতে হবে। আপনাকেই সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমরা তাদের উড়িয়ে দিই, অথবা আমরা একটি চুক্তি করি—সময় কিন্তু এসে যাচ্ছে।’
এদিকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্রায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ রয়েছে বলে দাবি করেছেন ট্রাম্প। বার্তাসংস্থা আনাদোলুর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
হিস্পানিক হেরিটেজ মাস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, ‘হরমুজ প্রণালির ওপর আমাদের প্রায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। আসলে গত তিন দিনে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইতিহাসের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি তেল বের হয়েছে।’
ইরানের সামরিক বাহিনী ‘পুরোপুরি ধ্বংস’ হয়ে গেছে বলেও আবার দাবি করেন ট্রাম্প। তার ভাষ্য, যুদ্ধ শিগগিরই জয় করা হবে। তিনি বলেন, ‘যেকোনো একটি উপায়ে আমরা খুব দ্রুত এই যুদ্ধে জয়ী হতে যাচ্ছি।’
এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। এর জবাবে ইসরায়েল এবং অঞ্চলটিতে থাকা মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে ব্যাপক হামলা চালায় তেহরান। পরে এপ্রিল মাসে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়।
এরপর জুনে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সমঝোতা স্মারকে সই করে। তবে কৌশলগত এই সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে সেটির বাস্তবায়ন থমকে যায়।
এদিকে ইরাক থেকে শেষ মার্কিন সেনারাও প্রত্যাহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্য দিয়ে দেশটিতে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা মার্কিন সামরিক উপস্থিতির অবসান হলো।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, ইরাক থেকে শেষ মার্কিন সেনাদের প্রত্যাহার সম্পন্ন হয়েছে। এ ঘটনাকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি মহান দিন হিসেবে উল্লেখ করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প ইরাকের নতুন প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জায়েদির প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ইরাকের পরবর্তী অধ্যায়ে এই নেতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে। ট্রাম্প আরও বলেন, তিনি শুরু থেকেই আলী আল-জায়েদিকে সমর্থন করেছেন। তার দাবি, প্রত্যাশা না থাকলেও আলী আল-জায়েদি নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছেন।
এর আগে বুধবার পেন্টাগন জানায়, ইরাকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের পরিচালিত ‘অপারেশন ইনহেরেন্ট রিজলভ’ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে। উত্তর ইরাকের এরবিল বিমানঘাঁটি থেকে মার্কিন ও জোটের সেনা এবং সামরিক সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়ার মধ্য দিয়ে প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
দীর্ঘদিনের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে জড়িয়ে পড়েছিল বলে মন্তব্য করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, এখন সেই অধ্যায় ইতিহাসের অংশ হতে যাচ্ছে। তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে গিয়েছিল খিলাফত প্রতিষ্ঠাকারী জঙ্গি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে। সেই খিলাফত আর নেই, তাই এখন যুক্তরাষ্ট্র দেশে ফিরছে।
ইরাক থেকে সেনা প্রত্যাহারের সময় আফগানিস্তানের মতো কোনো সামরিক সরঞ্জাম ফেলে আসা হয়নি বলেও জানান ট্রাম্প। তিনি বলেন, প্রত্যাহারের সময় সব সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এবং এরবিল বিমানঘাঁটি থেকে জোটের বাহিনী ও সরঞ্জাম সুশৃঙ্খলভাবে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পরিকল্পনা ২০২৪ সালের একটি চুক্তির অংশ ছিল। ওই চুক্তির আওতায় ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযান শেষ করে ইরাকের নিরাপত্তার দায়িত্ব দেশটির নিজস্ব বাহিনীর হাতে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের তুরস্কে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত ও সিরিয়া-ইরাকবিষয়ক বিশেষ দূত টম ব্যারাকও এই প্রত্যাহারকে ইরাকের জন্য নতুন সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, মার্কিন সেনা চলে যাওয়ার পর ইরাকের সব সশস্ত্র বাহিনীকে একটি রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও একক কমান্ডের অধীনে আনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর ইরাকের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। দেশটিতে ইসলামিক স্টেটের অবশিষ্ট সদস্য এবং ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর উপস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন মহলে আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র ইরাককে প্রশিক্ষণ ও গোয়েন্দা সহায়তার মাধ্যমে সীমিতভাবে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।
২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে দীর্ঘ সময় দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা উপস্থিতি ছিল। ২০১১ সালে সেনা প্রত্যাহারের পর ২০১৪ সালে ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য আবারও মার্কিন সেনা ইরাকে মোতায়েন করা হয়। এবার প্রায় ২৩ বছর পর সেই সামরিক অধ্যায়েরও আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি হলো।
পড়ুন : ফেনীর পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
সা/


