চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার উদ্যোগের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ।
গণমাধ্যমে পাঠানো এক প্রতিবাদলিপিতে সংগঠনটি বলেছে, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতি ও আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। তাই এই বন্দরের কোনো গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার আগে দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ, জাতীয় নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও সার্বভৌমত্বের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
প্রতিবাদলিপিতে বলা হয়, ২০১৭ সাল থেকে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়ে আসছে। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও এ কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ, সর্বদলীয় শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদসহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন, পেশাজীবী, শিক্ষার্থী ও নাগরিক সমাজ এর প্রতিবাদ জানায়। সংগঠনটির দাবি, ব্যাপক আন্দোলন ও জনমতের কারণে সে সময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ওই উদ্যোগ থেকে সরে আসে।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের দেওয়া বক্তব্যের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে সংগঠনটি বলেছে, নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে পরিচালনার সুযোগ না দিলে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের দেশে ফেরত পাঠানোর আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ এই বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে।
সংগঠনটি বলেছে, বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় বন্দর পরিচালনার সিদ্ধান্ত কোনো বিদেশি চাপ, শ্রমবাজার বা অন্য কোনো স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত হওয়া উচিত নয়। এ ধরনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে বিবেচনায় রেখে।
নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের যন্ত্রপাতি অকেজো হয়ে গেছে এবং যন্ত্রপাতির কার্যক্ষমতা আন্তর্জাতিক মানের নিচে নেমে গেছে—সম্প্রতি দেওয়া এমন বক্তব্যেরও প্রতিবাদ জানিয়েছে সংগঠনটি। তাদের দাবি, বন্দরের অভ্যন্তরীণ নথিপত্র, যন্ত্রপাতি ক্রয় ও ব্যবহারের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ পর্যালোচনা করলে এ দাবির সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির অসঙ্গতি পাওয়া যায়।
প্রতিবাদলিপিতে আরও বলা হয়, নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল দীর্ঘমেয়াদি ইজারা বা পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়া হলে দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। টার্মিনাল থেকে অর্জিত অর্থের একটি অংশ বিদেশে চলে যাওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় শ্রমিক-কর্মচারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের দাবি অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল থেকে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা আয় এবং প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা নিট আয় হয়েছে। এ খাত থেকে সরকার কর ও মূল্য সংযোজন কর বাবদও উল্লেখযোগ্য রাজস্ব পেয়েছে বলে সংগঠনটি দাবি করেছে।
সংগঠনটির মতে, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব না দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং দক্ষ জনবল গড়ে তোলার মাধ্যমে টার্মিনালের সক্ষমতা আরও বাড়ানো সম্ভব।
চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে শ্রমিক-কর্মচারী, ব্যবসায়ী, বন্দর ব্যবহারকারী, নৌ ও বন্দর বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করার আহ্বান জানিয়েছে।
একই সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ, জাতীয় নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও বন্দরের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
পড়ুন : ধামরাইয়ে নিসচার মাসব্যাপী জনসচেতনতামূলক কর্মসূচির উদ্বোধন


