সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ঘটনায় ফেসবুক লাইভে এসে বিএনপির লোকজনকে দায়ী করেছিলেন তার শ্বশুর শেখ নূর ইসলাম। সেই ঘটনার পরই তার ব্যাংক হিসাবের তথ্য তলব করে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। এরপর সামনে আসে আরও কিছু তথ্য—কানাডায় নূর ইসলাম ও তার পরিবারের সদস্যদের প্রায় এক দশকের আর্থিক লেনদেন, একাধিক ব্যাংক হিসাব, ব্যবসা ও সম্পদের নথি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) ও আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিটের অনুসন্ধানে নূর ইসলাম পরিবারের সদস্যদের নামে কানাডার বিভিন্ন ব্যাংকে বড় অঙ্কের লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ২০১২ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বিভিন্ন হিসাবে ৫০ লাখ কানাডিয়ান ডলারের বেশি লেনদেন হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৪৩ কোটি টাকা।
তবে এই অনুসন্ধানের সঙ্গে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ঘটনার কোনো যোগসূত্র নেই বলে স্পষ্ট করেছেন কর কর্মকর্তারা। তাদের দাবি, সালমানকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের আগেই নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে নূর ইসলাম পরিবারের আর্থিক কর্মকাণ্ডের অনুসন্ধান শুরু হয়েছিল।
প্রায় এক দশকের ১৬৩টি আর্থিক নথি পর্যালোচনা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে বলে গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে। এসব নথিতে সন্দেহজনক লেনদেনের প্রতিবেদন, বড় অঙ্কের নগদ লেনদেন, ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার এবং আন্তর্জাতিক অর্থ স্থানান্তরের তথ্য রয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট নথিতে ১৭টি সন্দেহজনক লেনদেনের প্রতিবেদন, দুটি সন্দেহজনক লেনদেনের চেষ্টার তথ্য, ১১৮টি বড় অঙ্কের নগদ লেনদেন, ২৬টি ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারের প্রতিবেদন এবং দুটি আন্তঃদেশীয় মুদ্রা লেনদেনের তথ্য থাকার কথা বলা হয়েছে। এসব লেনদেনে কানাডিয়ান ডলারের পাশাপাশি মার্কিন ডলার, ব্রিটিশ পাউন্ড, সিঙ্গাপুর ডলার ও থাই বাথ ব্যবহারের তথ্যও রয়েছে।
নথিতে শুধু শেখ নূর ইসলামের নামই নেই। তার স্ত্রী শীলা ইসলাম এবং দুই মেয়ে দিশা ইসলাম ও তাসনিম ইসলামের নামও এসেছে। পরিবারের সদস্যদের কানাডায় প্রবাসাধিকার বা নাগরিকত্ব এবং সেখানে একাধিক লাভজনক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকার তথ্যও রয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, শেখ নূর ইসলাম, শীলা ইসলাম, দিশা ইসলাম ও তাসনিম ইসলাম ‘শেখ নূর ম্যানেজমেন্ট ইনকর্পোরেটেড’-এর পরিচালক। নূর ইসলামকে ‘১৭৭১০৬৯ অন্টারিও ইনকর্পোরেটেড’-এর পরিচালক ও প্রেসিডেন্ট হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে তার পেশা হিসেবে রিয়েল এস্টেট ব্যবস্থাপনা এবং ‘জুম জুম পিৎজা’ ব্যবসার মালিকানার তথ্য রয়েছে।
কানাডায় নূর ইসলাম পরিবারের ব্যাংক হিসাবের সংখ্যাও কম নয়। নূর ইসলাম, শীলা ইসলাম, দিশা ইসলাম ও তাসনিম ইসলামের নামে একক ও যৌথ হিসাব থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে টরন্টো-ডোমিনিয়ন ব্যাংক, ব্যাংক অব মন্ট্রিয়েল ও টিডি ব্যাংকের হিসাব রয়েছে। শীলা ইসলামের নামে একটি মর্টগেজ হিসাবের তথ্যও এসেছে নথিতে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে পরিবারের সদস্যদের সম্মিলিত আর্থিক লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ৫০ লাখ ৮৯ হাজার ৬২৯ কানাডিয়ান ডলার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর বাইরে ব্রিটিশ পাউন্ড, সিঙ্গাপুর ডলার, থাই বাথ ও মার্কিন ডলারে লেনদেনের তথ্যও রয়েছে।
কানাডার ব্যবসায়ও পরিবারের সদস্যদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। শীলা ইসলামের ডমিনোজ পিৎজার ব্যবসা ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত থাকার তথ্য রয়েছে। দিশা ইসলাম কানাডার সান লাইফে বিনিয়োগ পরামর্শক ও সেগ্রিগেটেড ফান্ড বিশ্লেষক হিসেবে কাজ করেছেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। তাকে ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবেও দেখানো হয়েছে। তাসনিম ইসলামও কানাডার নাগরিক এবং ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের কর নথিতেও শেখ নূর ইসলামের ব্যবসা ও সম্পদের বিস্তৃত তথ্য রয়েছে। ২০২৩-২৪ করবর্ষে তার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা। মাত্র এক বছর পর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ঘোষিত সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০৪ কোটি টাকা। একই অর্থবছরে রেমিট্যান্স হিসেবে দেশে ৯৪ কোটি ৫৭ লাখ টাকা আনার তথ্য দেখানো হয়েছে। ওই সময়ে পরিশোধিত আয়কর ছিল ৬৯ লাখ টাকা।
বাংলাদেশে নূর ইসলাম একাধিক ব্যবসা ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত বলে আয়কর নথিতে উল্লেখ রয়েছে। তিনি প্রায় ১৪টি কোম্পানির পরিচালক। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে ডমিনোজ পিজা, ফুওয়াং বোলিং অ্যান্ড সার্ভিসেস, এসআই ট্রাভেলস অ্যান্ড কার্গো সার্ভিসেস, ইস্টার্ন হোটেল অ্যান্ড বার, টাভার্স সাপ্লায়ার্স, রেডিও মাসালা, পল বেকারি অ্যান্ড ক্যাফে রেস্টুরেন্ট, ডমিনাস অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রি, স্পাইস টেলিভিশন, কয়লা পাব, স্টারবার ক্যাফে, ফুওয়াং ডমিনোজ প্রোপার্টিজ, স্পাইস হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট ও টিম হর্টনস।
এ ছাড়া বর্ষা মানি চেঞ্জিং সেন্টার, বর্ষা ডেইরি ফার্ম ও বর্ষা ফিশারিজের মতো ব্যবসার সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততার তথ্য কর নথিতে রয়েছে। কৃষি খাতেও তার বিনিয়োগ রয়েছে বলে আয়কর নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়। ঢাকার একটি কূটনৈতিক বন্ডেড ওয়্যারহাউসের সঙ্গেও নূর ইসলামের নাম জড়িত। ওই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে তার স্ত্রী শীলা ইসলাম ও মেয়ে তাসনিম ইসলামের নামও রয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, কানাডায় ‘শেখ নূর ম্যানেজমেন্ট’সহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে নূর ইসলামের নাম পাওয়া গেছে। ‘জুম জুম পিজা’র সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততার তথ্য রয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের কর নথিতে কানাডার ‘শেখ নূর ম্যানেজমেন্ট’, ‘১৭৭১০৬৯ অন্টারিও ইনকর্পোরেটেড’ কিংবা ঢাকার ওয়্যারহাউস ‘টস বন্ড’-এর নাম পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট নথি থেকে জানা গেছে। কানাডার নাগরিকত্বের তথ্যও এসব কর নথিতে নেই বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
সিআইসি ও আয়কর গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ভাষ্য, নূর ইসলামের কানাডায় থাকা নাগরিকত্ব, ব্যবসা ও সম্পদের তথ্য বাংলাদেশের কর নথিতে উল্লেখ করা হয়নি। বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের দলিলও কর নথিতে সংযুক্ত করা হয়নি বলে তদন্তকারীরা দাবি করছেন।
কর কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশের কর আইনে বিদেশে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য রিটার্নে উল্লেখ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ফলে বিদেশে থাকা সম্পদ বা আয় গোপন করা হয়েছে কি না, তা তদন্তের অংশ হিসেবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এরই মধ্যে বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) গভীর রাতে নতুন আরেকটি ঘটনা সামনে আসে। সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুরের ছত্রছায়ায় পরিচালিত ‘অননুমোদিত’ ওয়্যারহাউসে শুল্কমুক্ত মদ রাখার অভিযোগে চারটি ওয়্যারহাউস সিলগালা করা হয়েছে।
একদিকে স্টুডিওতে হামলার পর আলোচনায় আসা, অন্যদিকে কোটি কোটি টাকার দেশ-বিদেশের আর্থিক লেনদেনের অনুসন্ধান এবং সবশেষে শুল্কমুক্ত মদ রাখার অভিযোগে ওয়্যারহাউস সিল—সব মিলিয়ে সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুর শেখ নূর ইসলামকে ঘিরে সামনে এসেছে একের পর এক তথ্য।
পড়ুন: ময়মনসিংহে বাসচাপায় অটোরিকশার ৭ যাত্রী নিহত
আর/


