কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উদ্দেশে রওনা হয়েছে ইউরেনিয়ামবাহী গাড়িবহর। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নিরাপত্তায় তিনটি লরিতে করে প্রথম ইউনিটের জন্য আনা জ্বালানি রূপপুরে নেওয়া হচ্ছে।
শনিবার (৩ অক্টোবর) সকাল ৭টা ১৫ মিনিটে গাড়িবহরটি রূপপুরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। নিরাপত্তায় সেনাবাহিনীর পাশাপাশি রয়েছে এসআরবি, পুলিশ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা।
জানা গেছে, তিনটি লরিতে ইউরেনিয়াম এবং একটি লরিতে অন্যান্য সরঞ্জাম নেওয়া হচ্ছে। বহরের সঙ্গে রাশিয়া থেকে আসা বিশেষজ্ঞ দলও রয়েছে। গাড়িবহর চলাচলের সময় নির্দিষ্ট সড়কে সাময়িকভাবে যান চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে কয়েকটি এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে।
এর আগে শুক্রবার (২ অক্টোবর) রাত সাড়ে ১১টার দিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের জন্য ইউরেনিয়ামবাহী বিমানটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা চালানটি গ্রহণ করেন। পরে সেনাবাহিনীর নিরাপত্তায় এটি রূপপুরে নেওয়ার কথা জানানো হয়েছিল।
শুক্রবার বিকেলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, জ্বালানিবাহী বিমানটি বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর ইউরেনিয়াম রূপপুরে নেওয়ার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নিরাপত্তায় চালানটি রূপপুরে পৌঁছাবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী নভেম্বর ও ডিসেম্বরের মধ্যে আরও নয়টি ফ্লাইটে রূপপুরের জন্য ইউরেনিয়ামের ২১১টি অ্যাসেম্বলি দেশে আসার কথা রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ইউনিটের জন্য অতিরিক্ত ৪৮টি এবং দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য ১৬৩টি অ্যাসেম্বলি রয়েছে। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রাশিয়া থেকে কাজাখস্তান, তুর্কমেনিস্তান, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও ভারত হয়ে এসব চালান বাংলাদেশে পৌঁছাবে।
প্রথম ইউনিটের জন্য আসা ইউরেনিয়ামবাহী বিমানটি পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহার করে বাংলাদেশে পৌঁছেছে। এর আগে কারিগরি সমস্যার কথা জানিয়ে পাকিস্তান আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দিতে গড়িমসি করেছিল। আন্তর্জাতিক আইন ও বেসামরিক বিমান চলাচল প্রটোকলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার বিষয়টিকে ক্লিয়ারেন্স না দেওয়ার কারণ হিসেবে জানিয়েছিলেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সাজ্জাদ হায়দার।
এর আগে ২০২৩ সালে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের জ্বালানি দেশে এসেছিল। চলতি বছরের মে মাসে সেই জ্বালানি পারমাণবিক চুল্লিতে বসানো হয়েছে।
এদিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্বয়ংক্রিয় চাপ প্রশমন ভালভের প্রথম দুটি পরীক্ষা সফল হলেও তৃতীয় পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। ফলে তৃতীয় ভালভটি পুনরায় পরীক্ষার প্রস্তুতি চলছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. কবির হোসেন চ্যানেল টোয়েন্টিফোরকে বলেন, এটি বড় কোনো সমস্যা নয়। প্রধান বিষয়টি আমরা ইতোমধ্যে সমাধান করে ফেলেছি, এটিও দ্রুত সমাধান হয়ে যাবে।
এই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ধীরে ধীরে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়া শুরু হবে।
ইউরেনিয়াম কি
ইউরেনিয়াম হলো প্রকৃতিতে পাওয়া একটি তেজস্ক্রিয় ও ভারী ধাতু, যার রাসায়নিক প্রতীক U এবং পারমাণবিক সংখ্যা ৯২। এটি পর্যায় সারণীর অ্যাক্টিনাইড সিরিজের একটি রূপালী-ধূসর রঙের উপাদান।
ইউরেনিয়ামের প্রধান বৈশিষ্ট্য
- ভারী ধাতু: এটি প্রকৃতিতে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট মৌলগুলোর মধ্যে অন্যতম ভারী। এর ঘনত্ব সীসার (lead) চেয়ে প্রায় ৭০% বেশি।
- তেজস্ক্রিয়তা: ইউরেনিয়ামের পরমাণুগুলো স্থায়ী নয় এবং ধীরে ধীরে ভেঙে শক্তি ও বিকিরণ ছড়ায়।
- আইসোটোপ: প্রকৃতিতে ইউরেনিয়াম মূলত ইউরেনিয়াম-২৩৮ (U-238) এবং ইউরেনিয়াম-২৩৫ (U-235) রূপে থাকে। এর মধ্যে ইউরেনিয়াম-২৩৫ নিউক্লীয় বিভাজন বা ফিশন (Nuclear Fission) ঘটাতে পারে।
ইউরেনিয়ামের ব্যবহার
- বিদ্যুৎ উৎপাদন: পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে চুল্লিতে (reactor) জ্বালানি হিসেবে ইউরেনিয়াম ব্যবহার করা হয়। এর সামান্য পরিমাণ থেকে প্রচুর বিদ্যুৎ পাওয়া যায়।
- পারমাণবিক অস্ত্র: পারমাণবিক বোমা বা সামরিক অস্ত্র তৈরিতে ইউরেনিয়ামের বিশেষ আইসোটোপ ব্যবহৃত হয়।
- অন্যান্য ব্যবহার: উচ্চ ঘনত্বের কারণে এটি বিকিরণ রোধে (radiation shielding) এবং বিভিন্ন ভারসম্য রক্ষাকারী ওজনের কাজে লাগে।
কীভাবে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে এটি থেকে বিদ্যুৎ তৈরি হয়
পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ইউরেনিয়াম থেকে বিদ্যুৎ তৈরির মূল ভিত্তি হলো নিউক্লীয় ফিশন (Nuclear Fission) বা পরমাণুর বিভাজন প্রক্রিয়া। এটি মূলত নিয়ন্ত্রিত উপায়ে বিপুল পরিমাণ তাপ তৈরি করার একটি আধুনিক পদ্ধতি।
নিচে ধাপে ধাপে প্রক্রিয়াটি সহজ ভাষায় আলোচনা করা হলো:
১. নিউক্লীয় ফিশন বা পরমাণু বিভাজন
পারমাণবিক চুল্লির (Nuclear Reactor) ভেতর ইউরেনিয়াম-২৩৫ (U-235) আইসোটোপকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। যখন একটি নিউট্রন কণা দিয়ে ইউরেনিয়াম পরমাণুর নিউক্লিয়াসকে আঘাত করা হয়, তখন পরমাণুটি ভেঙে দুটি ছোট পরমাণুতে পরিণত হয়। এই বিভাজনের ফলে বিপুল পরিমাণ তাপ শক্তি এবং আরও কয়েকটি নতুন নিউট্রন নির্গত হয়।
২. চেইন রিঅ্যাকশন বা শৃঙ্খল বিক্রিয়া
ইউরেনিয়াম ভেঙে যে নতুন নিউট্রনগুলো বের হয়, সেগুলো পাশের অন্যান্য ইউরেনিয়াম পরমাণুকে আঘাত করে। এভাবে একটি ধারাবাহিক বিক্রিয়া বা চেইন রিঅ্যাকশন শুরু হয়। কন্ট্রোল রড (Control Rods) ব্যবহার করে এই বিক্রিয়াকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়, যাতে অতিরিক্ত তাপ তৈরি হয়ে দুর্ঘটনা না ঘটে।
৩. পানি বাষ্পীভবন (Steam Generation)
ইউরেনিয়ামের ফিশন বিক্রিয়া থেকে যে প্রচণ্ড তাপ উৎপন্ন হয়, তা দিয়ে চুল্লির চারপাশের পানিকে ফুটিয়ে অত্যন্ত উচ্চ চাপের বাষ্প (Steam) তৈরি করা হয়।
৪. টারবাইন ও জেনারেটর ঘূর্ণন
এই উচ্চ চাপের বাষ্পকে পাইপের মাধ্যমে নিয়ে গিয়ে একটি বিশাল টারবাইনের (Turbine) ওপর ফেলা হয়। বাষ্পের ধাক্কায় টারবাইনটি দ্রুত গতিতে ঘুরতে শুরু করে। টারবাইনের সাথে যুক্ত থাকে একটি জেনারেটর (Generator)। টারবাইন ঘোরার ফলে জেনারেটরটি সক্রিয় হয় এবং বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে।
৫. শীতলীকরণ বা কনডেন্সেশন
টারবাইন ঘুরিয়ে দেওয়ার পর ব্যবহৃত বাষ্পকে ঠান্ডা পানির সংস্পর্শে এনে আবার তরল পানিতে রূপান্তর করা হয়। এই পানি পুনরায় চুল্লিতে পাঠানো হয় গরম করার জন্য। পারমাণবিক কেন্দ্রের বাইরে যে বড় বড় কুলিং টাওয়ার (Cooling Towers) দেখা যায়, সেগুলো মূলত এই বাড়তি তাপ ও বাষ্প ঠান্ডা করার কাজে ব্যবহৃত হয়।
সংক্ষেপে, কয়লা বা গ্যাস পুড়িয়ে যেভাবে তাপ তৈরি করে বিদ্যুৎ বানানো হয়, পারমাণবিক কেন্দ্রে ঠিক একই কাজ করা হয় কোনো কিছু না পুড়িয়ে, কেবল ইউরেনিয়ামের পরমাণু ভেঙে।
পড়ুন : মুক্তাদিরের শ্বশুরের মদের বার ছাড়াও আছে সম্পদের পাহাড়!
সা/


