কুমিল্লায় হত্যা মামলার আসামি ও ‘রতন গ্রুপের’ প্রধান ইমরান হোসেন ওরফে রতনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শুক্রবার (২ অক্টোবর) রাতে নগরীতে পুলিশের নিয়মিত অভিযানের সময় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ জানায়, রতনের বিরুদ্ধে শাহাদাত হত্যা মামলাসহ অস্ত্র ও অন্যান্য অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি পুলিশের নজরদারিতে ছিলেন।
২০২২ সালে নগরীর মিশনারি স্কুলের সামনে কিশোর গ্যাংয়ের ‘ঈগল গ্রুপ’ ও ‘রতন গ্রুপের’ মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ হয়। এতে শাহাদাত নিহত হন। ওই ঘটনায় করা হত্যা মামলায় রতনকে প্রধান আসামি করা হয়।
কুমিল্লা কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার জানান, রতনকে গ্রেপ্তারের পর তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর বিষয়ে আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
১৮ থানায় কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান
এর মধ্যে কুমিল্লা জেলার ১৮টি থানায় একযোগে কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান চালিয়ে ৩৬৩ জনকে আটক করেছে পুলিশ। শুক্রবার (২ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৭টা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত জেলা পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট ও গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) এ অভিযান পরিচালনা করে।
জেলা পুলিশ জানায়, কুমিল্লার বিভিন্ন থানা এলাকায় কিশোর বয়সী বখাটেদের উৎপাত রয়েছে—এমন স্থানগুলোতে জেলা পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামানের নেতৃত্বে অভিযান চালানো হয়। এতে জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও অংশ নেন।
কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) লুৎফুর রহমান জানান, আটক ব্যক্তিদের অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। যাচাই শেষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান, উঠতি বয়সী কিশোররা যাতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য নিয়মিত কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। অভিযানে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যাতে হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়েও কঠোরভাবে নজরদারি করা হচ্ছে।
ছাত্রদল নেতার সঙ্গে রতনের ফোনালাপ ফাঁস
এদিকে কুমিল্লা মহানগর ছাত্রদলের সহসভাপতি মো. মহসিনের সঙ্গে রতনের একটি ফোনালাপ ফাঁস হয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে ২ মিনিট ৩ সেকেন্ডের ওই ফোনালাপের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর নগরজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে।
ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, লাউড স্পিকারে ছাত্রদল নেতা মহসিনের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় রতন অন্য এক তরুণকে দিয়ে পুরো বিষয়টি ভিডিও করান। কথোপকথনে মিছিলে রতনের উপস্থিতি এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ নিয়ে দুজনকে উত্তপ্ত ও আত্মপক্ষ সমর্থনমূলক নানা কথা বলতে শোনা যায়।
এর আগে সংবাদ প্রকাশের পর সংবাদ সম্মেলনে মহসিন দাবি করেছিলেন, রতনের সঙ্গে তার কোনো ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক পরিচয় নেই। মিছিলে রতন কীভাবে তার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছেন, সেটিও তিনি জানেন না। তবে ফাঁস হওয়া ফোনালাপ সেই দাবির বিপরীত চিত্র তুলে ধরেছে।
কথোপকথনে রতনকে বলতে শোনা যায়, ‘কিতা কইছো তুমি এইডা? তুমি আবার হুনো না ভাই…এখন কইতাছি ভাই, আমরা কি আমরার লাইগ্যানি গেছিলাম প্রোগ্রামডাত?’ জবাবে মহসিন বলেন, ‘আমি কি তোরে কইছি যে তোর লাইগ্যা আইছত, আমাগো লাইগ্যা আইছত না?…আমারে সাংবাদিকেরা ফোন দিছে। তোর ভিডিও দেইখ্যা কইতাছে-কিশোর গ্যাং, অস্ত্রধারী, হত্যা মামলার আসামি, কিশোর গ্যাংয়ের লিডার রতনের সাথে মহসিনকে পাওয়া গেছে।’
ফোনালাপে রতন বারবার ‘রুবেল ভাইয়ের প্রোগ্রাম’ উল্লেখ করে জানান, রুবেল ভাইয়ের ডাকেই তিনি ওই অনুষ্ঠানে এসেছিলেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ‘রুবেল’ হলেন কুমিল্লা মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক আতিক সেলিম ওরফে রুবেল।
এ বিষয়ে রুবেল জানান, বড় কর্মসূচিতে তিনি অনেককে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তবে রতন কার সঙ্গে বা কীভাবে এসেছিলেন, সে বিষয়ে তার কোনো দায় বা ধারণা নেই।
ফোনালাপ নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
মহানগর ছাত্রদলের সহসভাপতি মো. মহসিন বলেন, আমাকে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে হেয় করতে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে এই ফোনালাপ রেকর্ড করে ফাঁস করা হয়েছে। এটা পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র।
কুমিল্লা মহানগর ছাত্রদলের সভাপতি নাহিদুজ্জামান রানা বলেন, ফোনালাপের সত্যতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে কেন্দ্রে জানানো হবে।
কুমিল্লার কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ফোনালাপের বিষয়টি পুলিশের নজরে এসেছে। তদন্তসাপেক্ষে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
২৩ সেপ্টেম্বর কুমিল্লায় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্রীয় কর্মসূচির মিছিলে শীর্ষ কিশোর গ্যাং ‘আর স্কোয়াড’ বা ‘রতন গ্রুপ’-এর প্রধান রতন ছাত্রদল নেতা মহসিনের ঠিক পেছনে হেঁটে অংশ নেন। ২৫ সেপ্টেম্বর ওই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় রাজনীতিতে বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়। এরপর পুলিশ রতনকে খুঁজছিল।
ফোনালাপের বিষয়ে জানতে চাইলে বৃহস্পতিবার রাতে কুমিল্লা মহানগর ছাত্রদলের সভাপতি নাহিদুজ্জামান রানা প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা সব সময় কিশোর গ্যাং ও মাদকবিরোধী আন্দোলন করছেন। প্রথম ভিডিওর পর কিশোর গ্যাং লিডারের সঙ্গে মহসিনের কথোপকথনের দ্বিতীয় ভিডিওটি তাঁদের নজরে এসেছে। বিষয়টি তাঁরা খতিয়ে দেখছেন। এরপর বিষয়টি কেন্দ্রীয় নেতাদের জানানো হবে। কেন্দ্রীয় নেতারা প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেবেন।
পড়ুন : সুদের চাপ কমাতে ৬২ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা: গভর্নর
সা/


