বাড়ছে বেকারত্ব, যুবকরা জড়াচ্ছে মাদক-জুয়া-চাঁদাবাজিতে, ভবিষ্যৎ কোথায়?

যে বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী একটি নগরের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হতে পারত, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে তাদেরই একটি অংশ ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ছে মাদক, জুয়া, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির মতো কর্মকাণ্ডে। পর্যাপ্ত ও সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকা, দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণের ঘাটতি এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও অভিজ্ঞ মহলের পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকায় তরুণদের একটি অংশ রাজনীতিনির্ভর জীবনযাপনের দিকে ঝুঁকছে। ফলে বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরের যে সুযোগ, সেই ‘জনতাত্ত্বিক মুনাফা’ই এখন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিজ্ঞাপন

রাজধানীর ২৩টি থানাধীন ডিএসসিসিকে ভাগ করা হয়েছে ১০টি অঞ্চলে। এসব অঞ্চলে রয়েছে ৭৫টি প্রশাসনিক ওয়ার্ড এবং নারীদের জন্য ২৫টি সংরক্ষিত কাউন্সিলর আসন। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী এখানকার জনসংখ্যা ছিল ৩৮ লাখ ৮৩ হাজার ৪২৩। ২০২২ সালের জনশুমারিতে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২ লাখ ৯৯ হাজার ৩৪৫ জনে। ২০২০ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ভোটার ২৩ লাখ ৬৭ হাজার ৪৮৮ জন। ডিএসসিসির আয়তন ১০৯ দশমিক ২৪ বর্গকিলোমিটার।

এত বড় জনগোষ্ঠীর মধ্যে তরুণদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরের জন্য যথাযথ উদ্যোগ না থাকায় ক্ষোভ রয়েছে বাসিন্দাদের মধ্যে। তাদের অভিযোগ, পড়াশোনা শেষ করেও অনেকে কাজ পাচ্ছেন না। আবার কাজের বাজারে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণও মিলছে না। একদিকে কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে দক্ষতা অর্জনের সীমিত সুযোগ—এই বাস্তবতায় তরুণদের একটি অংশ হতাশ হয়ে পড়ছে।

নগরের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে এই পরিস্থিতির প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, একটি নগরের অর্থনৈতিক উন্নয়নে জনসংখ্যার বয়স কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেশি থাকলে দ্রুত অগ্রগতির সুযোগ তৈরি হয়। এই সুযোগই ‘জনতাত্ত্বিক মুনাফা’ নামে পরিচিত। সাধারণত এ সুযোগ ২০ থেকে ৫০ বছর স্থায়ী হতে পারে।

শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নে এই সময়ে বিনিয়োগ করা গেলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু সেই বিনিয়োগের ঘাটতি থাকলে একই জনসংখ্যা হয়ে উঠতে পারে বেকারত্ব, সামাজিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক স্থবিরতার কারণ।

ডিএসসিসির বাস্তব চিত্রেও সেই শঙ্কারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, বেকারত্ব ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তায় তরুণদের একটি অংশ হতাশায় ভুগছে। কেউ জড়িয়ে পড়ছে মাদক ও জুয়ার সঙ্গে, কেউ ঢুকে পড়ছে অপরাধে। আবার রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে প্রবেশ করে কেউ কেউ চাঁদাবাজিতেও জড়িয়ে পড়ছে। চুরি-ছিনতাই, মাদক বিক্রি ও অনলাইন জালিয়াতির মতো অপরাধেও তরুণদের সম্পৃক্ততা বাড়ছে।

ওয়ারী বিভাগের বাসিন্দা মো. মিজানুর রহমান, শিবলি সাদিক, আনোয়ার ও শাহিন বলেন, সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরের সুযোগ তারা পাচ্ছেন না। ডিগ্রি নিয়েও অনেকে বেকার। চাকরিতে অভিজ্ঞতা চাওয়া হলেও প্রশিক্ষণ ছাড়া অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ নেই।

ডিএসসিসির অঞ্চল-৬ আঞ্চলিক কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী পারভেজ রানা বলেন, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৫-২৯ বছর বয়সি তরুণদের প্রায় ২৮ শতাংশ কোনো কর্মসংস্থানে নেই এবং শিক্ষার সঙ্গেও যুক্ত নয়। এ পরিস্থিতি সমাজে অপরাধপ্রবণতা বাড়াতে পারে।

লেখক, গবেষক ও কলামিস্ট লায়ন মীর আব্দুল আলীম বলেন, যুবসমাজ একটি নগর ও দেশের অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি। তাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর করতে সরকার ও বেসরকারি খাতকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষার পাশাপাশি হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের ওপর জোর দিতে হবে, যাতে তরুণরা চাকরির পাশাপাশি উদ্যোক্তা হিসাবেও গড়ে উঠতে পারে।

তবে প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানোর কথা বলছে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরও। বাংলাদেশ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশিক্ষণ) (যুগ্মসচিব) মো. মানিকহার রহমান বলেন, ঢাকা দক্ষিণে যুবসমাজের জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে প্রতিবছর শিক্ষাক্ষেত্র থেকে ২২ লাখ বেকার তরুণ-যুবক বের হন। সরকারি-বেসরকারিভাবে ৫ লাখের কর্মসংস্থান হচ্ছে। বাকি ১৬-১৭ লাখের মধ্য থেকেও যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর ২২ থেকে ২৫ শতাংশকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আÍনির্ভরশীল করে তুলছে। এতে সাড়ে ৩ থেকে ৪ লাখের কর্মসংস্থান হচ্ছে। পাশাপাশি প্রশিক্ষিতদের কর্মসংস্থান ব্যাংকের মাধ্যমে ৫ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।

দক্ষতা অর্জনের সুযোগ ও কর্মসংস্থান—দুইয়ের ঘাটতিই যদি দীর্ঘ হয়, তাহলে বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরের সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। যে বয়স ও জনসংখ্যা একটি নগরের অর্থনীতির বড় সম্পদ হতে পারত, যথাযথ উদ্যোগের অভাবে সেই শক্তির একটি অংশই যদি বেকারত্ব, মাদক, জুয়া ও অপরাধের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তাহলে ‘জনতাত্ত্বিক মুনাফা’ পরিণত হতে পারে বড় চ্যালেঞ্জে।

সূত্র: যুগান্তর

পড়ুন: সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় হুথিদের হামলা

আর/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন