৯ দফা দাবি রেস্তোরাঁ মালিকদের, না মানলে বড় পরিসরে বন্ধের হুঁশিয়ারি

রেস্তোরাঁ পরিচালনার খরচ বাড়ছে, বিপরীতে কমছে বিক্রি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একাধিক দপ্তরের আলাদা অনুমোদন, লাইসেন্স ও ভ্যাটসংক্রান্ত জটিলতা। এমন পরিস্থিতিতে খাতটির সংকট কাটাতে ৯ দফা দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি। সংগঠনটির নেতারা বলছেন, দাবিগুলো বাস্তবায়ন না হলে সারা দেশে বড় পরিসরে রেস্তোরাঁ বন্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

শনিবার (৩ অক্টোবর) রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে রেস্তোরাঁ খাতের সমস্যা ও সম্ভাবনা তুলে ধরে এসব দাবি জানায় সংগঠনটি।

রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির নেতারা বলেন, একটি রেস্তোরাঁ চালু ও পরিচালনার জন্য বর্তমানে ১০ থেকে ১২টি ভিন্ন দপ্তরের অনুমোদন নিতে হয়। এতে ব্যবসায়ীদের সময় ও অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। এ জটিলতা কমাতে সমন্বিত লাইসেন্সিং ব্যবস্থা চালুর দাবি জানিয়েছে তারা।

সংগঠনটির নেতারা জানান, দীর্ঘদিন ধরেই কার্যকর ওয়ান-স্টপ সার্ভিস বা একক সেবা কেন্দ্র চালুর দাবি জানিয়ে আসছেন তারা। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সরকারই বিষয়টিকে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। তাদের ভাষ্য, বিভিন্ন দপ্তর থেকে আলাদাভাবে অনুমোদন নেওয়ার বর্তমান ব্যবস্থা ব্যবসায়ীদের জন্য যেমন দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল, তেমনি এর ফলে সরকারি নজরদারিও যথাযথভাবে পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

এ অবস্থায় রেস্তোরাঁ খাতকে তৈরি পোশাকশিল্পের সংগঠন বিজিএমইএর আদলে একটি সমন্বিত কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থার আওতায় আনার প্রস্তাব দিয়েছে সমিতি। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার আহ্বান জানিয়েছে তারা।

ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু ও নবায়নসহ বিভিন্ন সেবা ডিজিটালাইজ করার সরকারি উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি। পাশাপাশি সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার লাইসেন্সিং সেবাগুলোকে কেন্দ্রীয় বিনিয়োগ সেবা কাঠামোর আওতায় আনার সিদ্ধান্তকেও ইতিবাচক হিসেবে দেখছে সংগঠনটি।

তবে নতুন করে লাইসেন্সিং শর্ত আরোপ নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে তারা। সমিতি বলেছে, সম্প্রতি বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ রেস্তোরাঁ মালিকদের জন্য নতুন করে আরেকটি লাইসেন্সিং শর্ত আরোপ করেছে। বিদ্যমান বিভিন্ন অনুমোদন ও লাইসেন্সিং ব্যবস্থার সঙ্গে নতুন শর্ত যুক্ত হওয়ায় ব্যবসায়ীদের ওপর আরও চাপ তৈরি হচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনে রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান বলেন, মাছ, মাংস, ভোজ্যতেল ও শাকসবজির দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি বিদ্যুৎ, গ্যাস (এলপিজি) এবং পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় রেস্তোরাঁ পরিচালনার খরচ অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। তবে ব্যবসায়িক ব্যয় বাড়লেও গ্রাহক হারানোর আশঙ্কায় রেস্তোরাঁগুলো খাবারের দাম সেই অনুপাতে বাড়াতে পারছে না।

তিনি দাবি করেন, ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাবে বর্তমানে রেস্তোরাঁগুলোর বিক্রি ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। এ অবস্থায় খাতটিকে টিকিয়ে রাখতে জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং যৌক্তিক দাম নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সমিতি।

সরকারি বিভিন্ন সংস্থার অভিযানের সময় ‘অহেতুক’ জরিমানা আরোপ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতিবাচক প্রচারণা বন্ধেরও দাবি জানিয়েছে রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি। কোনো রেস্তোরাঁয় অভিযান পরিচালনার সময় সমিতির একজন প্রতিনিধিকে উপস্থিত রাখার দাবিও জানিয়েছে তারা।

ভ্যাটসংক্রান্ত কার্যক্রম নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে সংগঠনটি। সমিতির দাবি, ভ্যাট নিয়ে ব্যবসায়ীদের হয়রানি বন্ধ করতে হবে। কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ, ভয়ভীতি দেখানো, চাপ প্রয়োগ বা অবৈধ অর্থ দাবি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না বলেও জানিয়েছে তারা।

ভ্যাটসংক্রান্ত কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে বিদ্যমান আইন ও বিধি অনুযায়ী নোটিশ প্রদান, শুনানি এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা সমাধানের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। মাঠপর্যায়ের ভ্যাট কার্যক্রমকে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও ব্যবসাবান্ধব করারও আহ্বান জানিয়েছে তারা। পাশাপাশি ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যবসায়ীদের হয়রানি করা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে সমিতি।

রেস্তোরাঁ শিল্পকে স্বতন্ত্র শিল্পখাত হিসেবে ঘোষণার সময় দেওয়া কর ও ভ্যাটসংক্রান্ত সুবিধাগুলোও দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়েছে। সংগঠনটি জানিয়েছে, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে রেস্তোরাঁ শিল্পকে একটি স্বতন্ত্র শিল্পখাত হিসেবে ঘোষণা করার সময় যেসব কর ও ভ্যাট সুবিধার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো অবিলম্বে বাস্তবায়ন করতে হবে।

এ ছাড়া দেশের বাজারে মাংসের উচ্চমূল্য নিয়ন্ত্রণে কঠোর সরকারি তত্ত্বাবধানে গরুর মাংস আমদানির অনুমতি চেয়েছে রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি। একই সঙ্গে চাঁদাবাজি এবং ব্যবসায়ীদের ওপর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়রানি বন্ধের দাবি জানিয়েছে তারা।

দক্ষ জনবল তৈরির বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে তাদের দাবিতে। রেস্তোরাঁ খাতের উন্নয়নে সরকারি ভর্তুকিতে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু, একটি বিশেষায়িত হসপিটালিটি ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা এবং রেস্তোরাঁকর্মীদের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছে সমিতি। এর মাধ্যমে বাংলাদেশি খাবারকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছে তারা।

রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির নেতারা বলেন, একদিকে পরিচালন ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে বিক্রি কমে যাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বিভিন্ন লাইসেন্স, অনুমোদন, ভ্যাট এবং অন্যান্য সরকারি কার্যক্রমের জটিলতা। এসব সমস্যার সমাধান না হলে রেস্তোরাঁ ব্যবসা পরিচালনা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

সবশেষে দাবিগুলো বাস্তবায়নে সরকারকে সতর্ক করেছে সংগঠনটি। নেতারা বলেন, আমাদের দাবিগুলো মেনে নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া না হলে সারা দেশে বড় পরিসরে রেস্তোরাঁ বন্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে

পড়ুন: মদিনায় বিদ্যুৎকেন্দ্রে হুতিদের হামলায় বাংলাদেশের নিন্দা

আর/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন