বারহাট্টায় সেতু নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম, কাজ বন্ধ করল প্রশাসন

গ্রামীণ যোগাযোগের মান উন্নয়নে নেত্রকোনার বারহাট্টায় নির্মাণ করা হচ্ছিল একটি সেতু। এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষার প্রকল্পটি ঘিরে যখন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলার কথা, তখন সেখানে ভর করেছে হতাশা আর ক্ষোভ। কারণ, প্রায় এক কোটি ১৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন এই সেতুটিতে শুরু থেকেই ব্যবহার করা হচ্ছিল অত্যন্ত নিম্নমানের সামগ্রী। অবশেষে স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে সরেজমিনে গিয়ে অনিয়মের সত্যতা পেয়েছে উপজেলা প্রশাসন, যার জেরে তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে নির্মাণকাজ।

উপজেলা প্রশাসন ও প্রাপ্ত নথিপত্র সূত্রে জানা যায়, উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধীনে ‘গ্রামীণ রাস্তায় ১৫ মিটার দৈর্ঘ্য পর্যন্ত সেতু/কালভার্ট নির্মাণ (১ম সংশোধিত)’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় এই কাজটি হচ্ছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রকল্পটি বারহাট্টার রায়পুর ইউনিয়নের অধীনস্থ গোড়ল কাউনাই নদীর উপরে আশরাফুলের বাড়ির পাশে সাত দশমিক ৯৩ মিটারের বক্স কালভার্ট নির্মাণ। গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পেয়েছে ‘মেসার্স আবির ট্রেডার্স’ নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, যার স্বত্বাধিকারী হিসেবে নথিতে মো. রুবেল ভূঁইয়ার নাম রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি কাজের শুরু থেকেই চরম অবহেলার পরিচয় দিয়ে আসছে। সেতুটির ভিত্তিমূল থেকে শুরু করে প্রতিটি স্তরে ব্যবহার করা হয়েছে নিম্নমানের সুরকি, জমাট বাঁধা সিমেন্ট, কাদামিশ্রিত পাথর এবং ময়লাযুক্ত বালু। এমনকি ঢালাইয়ের কাজে মরিচাধরা রড ব্যবহারের মতো গুরুতর অনিয়মও ঘটেছে।

স্থানীয়রা জানান, কাজের মান এতটাই নাজুক ছিল যে, প্রায় ছয় মাস আগে ঢালাইয়ের প্রস্তুতির জন্য করা সেন্টারিং রডসহ ভেঙে পড়েছিল। তা সত্ত্বেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজের ধীরগতির মাঝেও আগাম বিল তুলে নিয়েছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

এমন ধারাবাহিকতায় রবিবার (৪ অক্টোবর) পুনরায় সেতুর ঢালাই কাজ শুরু হয়। সেখানেও আগের মতোই কাদাযুক্ত পাথর ও জমাট সিমেন্টের মিশ্রণ ব্যবহার করা হচ্ছিল। বিষয়টি স্থানীয়দের নজরে এলে তারা ক্ষোভে ফেটে পড়েন এবং প্রশাসনকে অবহিত করেন। খবর পেয়ে ওইদিন বাদ আসর ঘটনাস্থলে ছুটে যান বারহাট্টা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সেলিনা আক্তার এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) ওবায়েদ উল্লাহ।

প্রকল্প এলাকায় গিয়ে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পান কর্মকর্তারা। পরিস্থিতি বিবেচনায় ত্বরিত পদক্ষেপ হিসেবে তারা চলমান ঢালাই কাজ বন্ধের নির্দেশ দেন।

প্রশাসনের এই পদক্ষেপে সাময়িক স্বস্তি প্রকাশ করেছেন গোড়ল গ্রামের বাসিন্দারা। স্থানীয় বাসিন্দা সুহেল মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, “এই সেতুতে স্মরণকালের সবচেয়ে বাজে কাজ হয়েছে। খোদ মরিচাধরা রডের ওপরই ঢালাই চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছিল।”

আনিস তালুকদার নামের আরেক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, “আমার বাড়ির কাছেই কাজ চলছে, উপজেলা থেকে কাউকে নিয়মিত তদারকি করতে দেখিনি। পুরো কাজটাই ‘দুই নম্বর’ হয়েছে। প্রশাসন এসে কাজ বন্ধ করায় তাদের ধন্যবাদ জানাই।”

এ বিষয়ে পিআইও ওবায়েদ উল্লাহ স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে কাজের অনিয়ম পেয়েছি। তাৎক্ষণিকভাবে কাজ বন্ধ করতে বলা হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে খুব দ্রুত চিঠি দেওয়া হবে।”

তবে বারহাট্টা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সেলিনা আক্তার জানান, “নিয়ম অনুযায়ী আমরা কাজটি পরিদর্শনে যাই। কিছু অনিয়মের প্রেক্ষিতে কাজটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।” স্থানীয়দের অভিযোগ শুরু থেকে নিম্নমানের সামগ্রী এবং কাঁদার মধ্যে ঢালাই দেওয়া হয়েছে- প্রতিবেদকের এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “লিখিত অভিযোগ আসলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

সরকারি নথিতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী মো. রুবেল ভূঁইয়ার যে মোবাইল নম্বরটি লিপিবদ্ধ, সেই নম্বরে নিম্নমানের কাজের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, তিনি নিজে কাজটি করছেন না; তার লাইসেন্স ব্যবহার করে তার বড় ভাই আবুল কাজটি করছেন। তবে নথিপত্রে তার নাম থাকায় নিয়ম অনুযায়ী আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতা যে তারই, সেটি স্মরণ করিয়ে দিলে তিনি তা স্বীকার করেন এবং বিষয়টি নিয়ে তার ভাইয়ের সাথে কথা বলে খোঁজ নেবেন বলে আশ্বস্ত করেন।

এদিকে, তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতি নিয়েও জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সরকারের এতো বড় একটি প্রকল্পে দায়িত্বশীলদের উপস্থিতি ছাড়া কীভাবে দিনের পর দিন নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে কাজ চললো, তার কোনো সদুত্তর মেলেনি। পাশাপাশি, পরিদর্শনের সময় এক আনসার সদস্যের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের ভিডিও ধারণে বাধা দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলেছে।

প্রশাসনের হস্তক্ষেপে আপাতত কাজ বন্ধ হলেও স্থানীয়দের মনে শঙ্কা কাটেনি। তাদের দাবি, সেতুর সিংহভাগ কাজই ইতোমধ্যে নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। তাই শুধু অবশিষ্ট কাজ বন্ধ রাখলেই চলবে না; যেসব অংশে ঢালাই সম্পন্ন হয়েছে, কারিগরি বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে সেগুলোও যথাযথভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। সেতুটি যেন এলাকার মানুষের জন্য আশীর্বাদের বদলে মরণফাঁদে পরিণত না হয়, সে বিষয়ে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি প্রত্যাশা করছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : কুষ্টিয়ায় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলা

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন