বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে দেশের ১০১ জন গুণী শিক্ষককে জাতীয়ভাবে সম্মাননা দিয়েছে সরকার। সোমবার (৫ অক্টোবর) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাদের হাতে এ সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে শিক্ষকদের সম্মাননা প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
গুণী শিক্ষক সম্মাননা হিসেবে প্রত্যেক শিক্ষককে দেওয়া হয়েছে দুই লাখ টাকা ও ক্রেস্ট। জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটির মাধ্যমে ৯৫ জন শিক্ষককে সম্মাননার জন্য চূড়ান্ত করা হয়েছে। এর বাইরে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক নির্বাচিত হয়েছেন আরও ছয়জন।
তবে সম্মাননা পাওয়া শিক্ষকদের তালিকা পরবর্তীতেও যাচাইয়ের আওতায় থাকবে। তালিকায় থাকা কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিরূপ মন্তব্য বা তথ্য পাওয়া গেলে পরবর্তী সময়ে তার নাম বাদ দেওয়া হবে।
‘স্ট্যান্ডিং উইথ টিচার্স: সিক্সটি ইয়ার্স অব প্রোটেকটিং দ্য প্রফেশন, অ্যাডভান্সিং ইটস স্ট্যাটাস, শেপিং আওয়ার ফিউচার্স’ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে দেশে পালিত হচ্ছে বিশ্ব শিক্ষক দিবস।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি পালিত হচ্ছে। শিক্ষকতার মতো গুরুত্বপূর্ণ পেশার মর্যাদা রক্ষা, শিক্ষকদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করা এবং ভবিষ্যৎ গঠনে তাদের ভূমিকার বিষয়টি এবারের প্রতিপাদ্যে গুরুত্ব পেয়েছে।
বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালনের ইতিহাসও বেশ পুরোনো। প্যারিসে ১৯৯৩ সালে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর ২৬তম সাধারণ সভায় ৫ অক্টোবর দিনটিকে বিশ্ব শিক্ষক দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর পর ১৯৯৪ সালে প্রথমবারের মতো দিবসটি পালন করা হয়।
পরবর্তী সময়ে ১৯৯৫ সাল থেকে বিভিন্ন দেশে বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালন শুরু হয়। ইউনেস্কোর অনুমোদনক্রমে প্রতিবছর পৃথক প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।
বাংলাদেশেও প্রতিবছর দিবসটি পালনের মাধ্যমে শিক্ষকদের অবদান ও তাদের পেশাগত মর্যাদার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। এর ধারাবাহিকতায় এবার জাতীয়ভাবে ১০১ জন গুণী শিক্ষককে সম্মাননা দিয়েছে সরকার।
এর আগে জাতীয় পর্যায়ে ১২ জন শিক্ষককে ‘গুণী শিক্ষক সম্মাননা’ দেওয়া হতো। এবার সেই সংখ্যা বাড়িয়ে ১০০ জন করা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি ও পেশাগত স্বীকৃতি নিশ্চিত করতেই সম্মাননার পরিধি বাড়ানো হয়েছে।
এবার প্রাথমিক স্তরে ১০ জন, মাধ্যমিক স্তরে ২০ জন, কলেজে ২৫ জন এবং সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০ জন শিক্ষককে সম্মাননা দেওয়া হচ্ছে। এর বাইরে মেডিক্যাল কলেজে ১০ জন, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনজন, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনজন এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসহ অন্যান্য বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ে চারজন শিক্ষক এ স্বীকৃতি পাবেন। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ কোটায় সম্মাননা পাবেন আরও পাঁচজন। সব মিলিয়ে জাতীয় পর্যায়ে সম্মাননা পাচ্ছেন ১০০ জন গুণী শিক্ষক।
গুণী শিক্ষকদের নির্বাচনের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের মাধ্যমে পৃথক অনুসন্ধান কমিটি কাজ করে। এসব কমিটির প্রস্তুত করা তালিকা পরে জাতীয় পরিচালনা কমিটি যাচাই-বাছাই করে। এর পরই ১০০ জন শিক্ষককে চূড়ান্তভাবে নির্বাচন করা হয়।
শিক্ষকদের অবদান স্মরণ করা এবং তাদের যথাযথ সম্মান ও স্বীকৃতি দেওয়াই বিশ্ব শিক্ষক দিবসের মূল লক্ষ্য। ইউনেসকোর উদ্যোগে ১৯৯৪ সাল থেকে প্রতিবছর ৫ অক্টোবর দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। এ বছরের প্রতিপাদ্য—‘শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানো: পেশা সুরক্ষার ৬০ বছর, মর্যাদা উন্নয়ন এবং আমাদের ভবিষ্যৎ গঠন।’
২০২৬ সালের বিশ্ব শিক্ষক দিবস বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। এ বছর শিক্ষকদের মর্যাদা-সংক্রান্ত ১৯৬৬ সালের আন্তর্জাতিক সুপারিশমালার ৬০ বছর পূর্ণ হচ্ছে। ওই সুপারিশে শিক্ষকদের অধিকার, দায়িত্ব, পেশাগত প্রস্তুতি, নিয়োগ, কর্মপরিবেশ এবং শিক্ষাদানের পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছিল।
বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন, জলবায়ু পরিবর্তন, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা, অভিবাসন ও বাস্তুচ্যুতির মতো নানা বিষয় শিক্ষকদের পেশায় প্রভাব ফেলছে। এসব কারণে শিক্ষকদের সামাজিক, পেশাগত ও অর্থনৈতিক মর্যাদা আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে ইউনেসকো।
ইউনেসকোর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ব শিক্ষক দিবস কেবল শিক্ষকদের সম্মান জানানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এ দিন শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা, অধিকার, কর্মপরিবেশ এবং শিক্ষাব্যবস্থায় তাদের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা করা হয়। পাশাপাশি শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা ও পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।
বিশ্ব শিক্ষক দিবসের ইতিহাস ১৯৬৬ সাল থেকে শুরু। ওই বছরের ৫ অক্টোবর প্যারিসে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ও ইউনেসকোর যৌথ বিশেষ সম্মেলনে শিক্ষকদের মর্যাদা-সংক্রান্ত ঐতিহাসিক সুপারিশমালা গৃহীত হয়। এর ২৮ বছর পর, ১৯৯৪ সালে প্রথমবার বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হয়। এরপর থেকে প্রতিবছর ৫ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। প্রতি বছর আলাদা প্রতিপাদ্যের মাধ্যমে শিক্ষকদের ভূমিকা, অধিকার, মর্যাদা ও পেশাগত চ্যালেঞ্জ সামনে আনা হয়।
এ বছর বিশ্ব শিক্ষক দিবসের বৈশ্বিক আয়োজন হচ্ছে ফ্রান্সের প্যারিসে ইউনেসকোর সদর দপ্তরে। সেখানে শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা সুরক্ষা ও উন্নয়ন নিয়ে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা হবে। একই অনুষ্ঠানে শিক্ষক উন্নয়নে ইউনেসকো-হামদান পুরস্কারও দেওয়া হবে।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালনের প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ আরও জোরালো হয়েছে। ২০২২ সালে দেশব্যাপী শিক্ষক দিবস পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরের বছর ২০২৩ সালে দিবসটি নিয়ে জাতীয় পর্যায়েও আয়োজন করা হয়। পরে মন্ত্রিসভার বার্ষিক ক্যালেন্ডারে ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
পড়ুন: নারী ভোটার নিয়ে আশাবাদী সিইসি, প্রার্থী নিয়ে শঙ্কা
আর/


