প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও নিরাপত্তা বাড়াতে সিস্টেম উন্নয়ন, রক্ষণাবেক্ষণ ও মাইগ্রেশনের কাজ করছে দেশের বিভিন্ন ব্যাংক। এ কারণে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কার্ড, এটিএম, পিওএস, এনপিএসবি, ই-কমার্স ও কিউআরসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হচ্ছে।
তবে একই সময়ে একাধিক ব্যাংকের এসব সেবা বন্ধ থাকায় গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জরুরি সময়ে এটিএম থেকে টাকা তোলা, কার্ড দিয়ে কেনাকাটা, কিউআর পেমেন্ট কিংবা অনলাইন লেনদেন করতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়ার আশঙ্কা করছেন অনেকে।
ব্যাংকগুলো বলছে, এটি স্থায়ী কোনো সমস্যা নয়। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও সিস্টেম মাইগ্রেশনের কাজ শেষ হলে নির্ধারিত সেবাগুলো আবার স্বাভাবিক হবে। গ্রাহকদের আগাম সতর্ক করতে এসএমএসসহ বিভিন্ন মাধ্যমে বিজ্ঞপ্তিও দেওয়া হয়েছে।
যেসব ব্যাংকে এটিএম-অনলাইন সেবা বন্ধ
বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, বেসিক ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ব্যাংক আলফালাহ বাংলাদেশ, কমিউনিটি ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক (বর্তমানে সম্মিলিত ব্যাংকের আওতায়), আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, মেঘনা ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংক, মধুমতি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, সীমান্ত ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, সাউথ বাংলা অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক এবং উরি ব্যাংক বাংলাদেশ।
ব্যাংকগুলোর বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, সিস্টেম রক্ষণাবেক্ষণ এবং কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কের সিস্টেম মাইগ্রেশনের মতো কাজের জন্য এসব সেবা সাময়িক বন্ধ রাখা হচ্ছে।
কোনো কোনো ব্যাংকের ক্ষেত্রে কয়েক ঘণ্টা, আবার কোনো কোনো ব্যাংকের ক্ষেত্রে কয়েক দিন পর্যন্ত নির্দিষ্ট সেবা বন্ধ থাকার কথা জানানো হয়েছে।
ব্যাংকগুলোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কের সিস্টেম মাইগ্রেশনের কারণে ৪ অক্টোবর রাত ৯টা থেকে ১০ অক্টোবর দুপুর ১২টা পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর কিছু কার্ড ও লেনদেন সেবা বন্ধ থাকতে পারে।
এ সময়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের এটিএম, কার্ড, পিওএস, এনপিএসবি, ই-কমার্স ও কিউআর সেবার কোনো কোনোটি ব্যবহার করা যাবে না। ফলে এটিএম থেকে টাকা তোলা, দোকানে কার্ড দিয়ে পেমেন্ট, কিউআর কোডে লেনদেন কিংবা অনলাইন কেনাকাটায় সাময়িক সমস্যা হতে পারে।
জরুরি সময়ে নগদ টাকা প্রয়োজন হলে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে পারেন গ্রাহকেরা। নিজের ব্যাংকের এটিএম বা কার্ড সেবা বন্ধ থাকলে বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হবে।
একইভাবে নির্দিষ্ট ব্যাংকের কার্ড বা পিওএস সেবার ওপর নির্ভরশীল ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও লেনদেনে সমস্যা হতে পারে। অনলাইন কেনাকাটা, ই-কমার্স পেমেন্ট, কিউআর কোডে অর্থ পরিশোধ কিংবা অন্য ব্যাংকের হিসাবে টাকা স্থানান্তরের ক্ষেত্রেও সাময়িক অসুবিধা তৈরি হতে পারে।
তবে সব ব্যাংকের সব সেবা একই সময়ে বন্ধ থাকবে—বিষয়টি এমন নয়। কোন ব্যাংকের কোন সেবা কত সময় বন্ধ থাকবে, তা ব্যাংকভেদে আলাদা। তাই গ্রাহকদের নিজ নিজ ব্যাংকের বিজ্ঞপ্তি দেখে সময়সূচি জেনে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
একসঙ্গে এতগুলো ব্যাংকের প্রযুক্তিনির্ভর সেবা বন্ধ থাকার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বক্তব্যও পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান গণমাধ্যমকে বলেন, প্রতিবছর ব্যাংকগুলো তাদের কার্যক্রম পরিচালনা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কিছু সেবা বন্ধ রাখতে পারে।
তিনি বলেন, এবারও প্রতিটি ব্যাংক আলাদাভাবে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে কাকতালীয়ভাবে একই সময়ে ৩০টি ব্যাংক এ ধরনের কার্যক্রমের মধ্যে পড়ে গেছে। এ কারণে বিষয়টি গ্রাহকদের নজরে এসেছে এবং কিছুটা প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
আরিফ হোসেন খান বলেন, গ্রাহকদের কিছুটা ভোগান্তি হতে পারে। এ বিষয়ে ব্যাংকগুলো তাদের গ্রাহকদের জানিয়েছে এবং সচেতন করেছে কি না, তা নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিটি ব্যাংকের সঙ্গে কথা বলেছে।
ব্যাংকগুলো জানিয়েছে, এসএমএসের মাধ্যমে গ্রাহকদের আগাম এ বিষয়ে জানানো হয়েছে।
গ্রাহকের করণীয়
ব্যাংকিং সেবা সাময়িক বন্ধ থাকার সময়ে গ্রাহকদের সতর্ক থাকতে হবে। নির্ধারিত সময়ে বড় ধরনের অনলাইন পেমেন্ট, জরুরি কার্ড লেনদেন বা নগদ টাকা তোলার প্রয়োজন থাকলে আগেই বিকল্প ব্যবস্থা করে রাখা ভালো।
নিজ নিজ ব্যাংকের ওয়েবসাইট, এসএমএস, মোবাইল অ্যাপ বা শাখা থেকে কোন সেবা কত সময় বন্ধ থাকবে, তা জেনে নেওয়া উচিত। কারণ একই ব্যাংকের সব ধরনের সেবা একসঙ্গে বন্ধ নাও থাকতে পারে।
জরুরি প্রয়োজনে বিকল্প ব্যাংক হিসাব, অন্য কার্ড, মোবাইল আর্থিক সেবা কিংবা অন্য বৈধ লেনদেন ব্যবস্থা ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে অপরিচিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দেওয়া কোনো বিকল্প লেনদেন পদ্ধতিতে ব্যাংক তথ্য, কার্ডের পিন, ওটিপি বা পাসওয়ার্ড দেওয়া যাবে না।
প্রযুক্তি উন্নয়নে সাময়িক ভোগান্তি
ব্যাংকিং খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সিস্টেম আপগ্রেড ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনও বাড়ছে। নিরাপত্তা জোরদার, লেনদেনের সক্ষমতা বাড়ানো এবং নতুন প্রযুক্তি যুক্ত করার জন্য অনেক সময় নির্দিষ্ট সেবা সাময়িক বন্ধ রাখতে হয়।
তবে একই সময়ে বেশি সংখ্যক ব্যাংকের সেবা বন্ধ থাকলে গ্রাহকদের ওপর এর প্রভাব তুলনামূলক বেশি হতে পারে। বর্তমানে দৈনন্দিন কেনাকাটা, বিল পরিশোধ, অনলাইন কেনাকাটা ও অর্থ স্থানান্তরে মানুষ কার্ড ও ডিজিটাল লেনদেনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
ব্যাংকগুলো জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ের আগেই সিস্টেম মাইগ্রেশন বা রক্ষণাবেক্ষণের কাজ শেষ হলে সংশ্লিষ্ট সেবাগুলো আগেই স্বাভাবিক হতে পারে।
অর্থাৎ একসঙ্গে একাধিক ব্যাংকের কিছু প্রযুক্তিনির্ভর সেবা বন্ধ থাকলেও পুরো ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ হচ্ছে না। তবে কোন গ্রাহকের কোন সেবা বন্ধ থাকবে, তা ব্যাংকভেদে আলাদা। তাই আগাম বিজ্ঞপ্তি দেখে প্রয়োজনীয় লেনদেন পরিকল্পনা করাই ভোগান্তি এড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
পড়ুন : শেয়ারবাজার চাঙ্গা করতে সরাসরি তালিকাভুক্তির অনুমতি


