ব্যাংক খাতে সিএসআর ব্যয় কমেছে ২১%

করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর খাতে দেশের ব্যাংকগুলোর ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে জুন সময়ে ব্যাংকগুলো এ খাতে মোট ১১৯ কোটি ৪ লাখ টাকা ব্যয় করেছে। এর আগের ছয় মাস, অর্থাৎ গত বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর সময়ে সিএসআর খাতে ব্যাংকগুলোর মোট ব্যয় ছিল ১৯৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। সে হিসাবে ছয় মাসের ব্যবধানে ব্যাংকগুলোর সিএসআর ব্যয় কমেছে ৭৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা বা ৩৯ দশমিক ৮৩ শতাংশ।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর-সংক্রান্ত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংক খাতে প্রকৃত মুনাফা ও আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টি এখন আগের তুলনায় বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে যেসব ব্যাংকের মুনাফা কমেছে বা লোকসান হয়েছে, তাদের সিএসআর ব্যয় করার সুযোগও সীমিত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে ব্যাংকগুলোর সামগ্রিক সিএসআর ব্যয়ে।

ব্যাংকারদের মতে, অতীতে অনেক ব্যাংক প্রকৃত মুনাফা না করেও বিভিন্ন উপায়ে কৃত্রিমভাবে মুনাফা দেখাত। সেই মুনাফার ওপর ভিত্তি করে সিএসআরসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় করা হতো। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ব্যাংক খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন নীতিমালা কঠোর করে। এর ফলে ব্যাংকগুলোর আর্থিক হিসাবের প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে শুরু করে। অনেক ব্যাংকের মুনাফা আগের তুলনায় কমে যায়। আবার কিছু ব্যাংক লোকসানেও পড়ে। ফলে সিএসআর খাতে ব্যয়ের পরিমাণও স্বাভাবিকভাবেই কমেছে।

বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ব্যাংক নিট লোকসানে থাকলে সিএসআর খাতে ব্যয় করতে পারে না। ফলে যেসব ব্যাংক লোকসানে রয়েছে, তাদের জন্য সামাজিক দায়বদ্ধতার আওতায় নতুন করে অর্থ ব্যয় করার সুযোগ নেই। পাশাপাশি মুনাফা কমে যাওয়া ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রেও সিএসআর খাতে ব্যয়ের সক্ষমতা কমেছে। সব মিলিয়ে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকগুলোর সিএসআর ব্যয়ে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে।

চলতি বছরের জানুয়ারি-জুন সময়ে ব্যাংকগুলোর সিএসআর ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ গেছে স্বাস্থ্য খাতে। এ খাতে মোট ৩৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা ব্যয় করেছে ব্যাংকগুলো। মোট সিএসআর ব্যয়ের হিসাবে স্বাস্থ্য খাতের অংশ ২৯ দশমিক ১১ শতাংশ।

সিএসআর ব্যয়ের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে শিক্ষা খাত। এ খাতে ব্যাংকগুলো ব্যয় করেছে ২৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা, যা মোট সিএসআর ব্যয়ের ২০ দশমিক ২৭ শতাংশ। শিক্ষা খাতে ব্যাংকগুলোর এ ধরনের ব্যয়ের মধ্যে শিক্ষার্থীদের সহায়তা, শিক্ষা উপকরণ প্রদান এবং বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগে অর্থায়ন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রশমন ও অভিযোজন খাতেও ব্যাংকগুলোর সিএসআর ব্যয় রয়েছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে এ খাতে মোট ১১ কোটি ৭২ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। মোট সিএসআর ব্যয়ের হিসাবে এ খাতের অংশ ৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ।

এর বাইরে অন্যান্য খাতে ব্যাংকগুলোর ব্যয় হয়েছে ৪৮ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। মোট সিএসআর ব্যয়ের ৪০ দশমিক ৭৭ শতাংশ গেছে এসব খাতে। অর্থাৎ স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কার্যক্রমেও ব্যাংকগুলো সিএসআর তহবিল থেকে অর্থ ব্যয় করেছে।

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সিএসআর খাতে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করেছে ঢাকা ব্যাংক। জানুয়ারি থেকে জুন সময়ে ব্যাংকটি এ খাতে মোট ১২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ব্যয় করেছে। সিএসআর ব্যয়ের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক। ব্যাংকটি ব্যয় করেছে ১১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা।

তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকটির সিএসআর ব্যয়ের পরিমাণ ১০ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এরপর রয়েছে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি)। ব্যাংকটি সিএসআর খাতে ব্যয় করেছে ৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা।

তালিকায় পরবর্তী অবস্থানে থাকা পূবালী ব্যাংক চলতি বছরের জানুয়ারি-জুন সময়ে সিএসআর খাতে ৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকা ব্যয় করেছে। শীর্ষস্থানীয় এসব ব্যাংকের ব্যয়ের কারণে সামগ্রিক সিএসআর তহবিলে তাদের অবদান উল্লেখযোগ্য।

তবে একই সময়ে দেশের ১৯টি ব্যাংক সিএসআর খাতে কোনো অর্থ ব্যয় করেনি। এর পেছনে ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা, মুনাফার পরিস্থিতি এবং বিদ্যমান নীতিমালার প্রভাব রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ব্যাংক খাতে সিএসআর ব্যয় কমে যাওয়াকে শুধু সামাজিক কর্মকাণ্ডে ব্যাংকের আগ্রহ কমে যাওয়ার বিষয় হিসেবে দেখছেন না ব্যাংকাররা। তাদের মতে, ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে সিএসআর ব্যয়ের সম্পর্ক রয়েছে। আগে কোনো কোনো ব্যাংক প্রকৃত মুনাফা না করেও কৃত্রিমভাবে মুনাফা দেখানোর মাধ্যমে বিভিন্ন খাতে ব্যয় করার সুযোগ পেত। বর্তমানে হিসাবের স্বচ্ছতা বাড়ায় সেই সুযোগ অনেকটাই কমেছে।

বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ব্যাংক খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলে ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থার প্রকৃত চিত্র প্রকাশ পেতে শুরু করে। এতে যেসব ব্যাংকের আয় ও মুনাফা কমেছে, তাদের ব্যয়ের সক্ষমতাও কমেছে। আবার লোকসানি ব্যাংকগুলো নিয়ম অনুযায়ী সিএসআর ব্যয় করতে না পারায় সামগ্রিক ব্যয়ের পরিমাণও কমে গেছে।

তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ব্যাংক খাতে আর্থিক শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত হওয়া দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক। ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে সিএসআর কার্যক্রম পরিচালিত হলে এ খাতে ব্যয়ের পাশাপাশি কার্যক্রমের মানও বাড়তে পারে।

সব মিলিয়ে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকগুলোর সিএসআর ব্যয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ পতন ব্যাংক খাতের পরিবর্তিত আর্থিক বাস্তবতারই প্রতিফলন। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবেশ খাতে ব্যাংকগুলোর সামাজিক দায়বদ্ধতার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। তবে ব্যাংকগুলোর মুনাফা ও আর্থিক সক্ষমতা ভবিষ্যতে বাড়লে সিএসআর খাতে ব্যয়ও আবার বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পড়ুন:একসঙ্গে ৩০ ব্যাংকের কার্ড-এটিএমসহ বিভিন্ন সেবা বন্ধ

ইমি/ ‎

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন