মারমাই: কৈশোরের ক্ষোভ থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প

আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকার ধানমন্ডি শাখার অডিটোরিয়াম নুভ্যেল ভ্যগে ৬ অক্টোবর প্রদর্শিত হলো ফরাসি নির্মাতা গ্রেগরি লুসিলি পরিচালিত প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র মারমাই (Marmaille, 2024)। প্রদর্শনীর পর দর্শকদের সঙ্গে চলচ্চিত্রটি নিয়ে আলোচনায় অংশ নেন নির্মাতা গ্রেগরি লুসিলি।

রিইউনিয়ন দ্বীপকে পটভূমি করে নির্মিত মারমাই–এর গল্প ১৫ বছর বয়সী থমাসকে ঘিরে। ব্রেকড্যান্সের প্রতি আগ্রহী এই কিশোরের জীবন হঠাৎ বদলে যায়, যখন সে ও তার বোন মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এমন এক বাবার কাছে যেতে বাধ্য হয়, যাকে তারা প্রায় চেনেই না। পরিচিত পৃথিবী হঠাৎ ভেঙে পড়ায় থমাসের মধ্যে জন্ম নেয় রাগ, অভিমান ও এক ধরনের বিদ্রোহ।

থমাসের এই অবস্থানটিই গল্প বলার জন্য বেছে নিয়েছেন লুসিলি। সন্তান পরিত্যাগের মতো জটিল একটি সামাজিক বাস্তবতাকে তিনি বড়দের ব্যাখ্যা দিয়ে বোঝাতে চাননি। বরং একজন কিশোরের চোখ দিয়ে দর্শককে সেই বাস্তবতার মুখোমুখি করেছেন।

চলচ্চিত্রটির ভাবনার শুরু হয়েছিল বাস্তব একটি অভিজ্ঞতা থেকে। সংকটে থাকা এক তরুণকে সহায়তা করতে গিয়ে রিইউনিয়নের সাঁ-ল্যু এলাকার শিশু কল্যাণ বিভাগে গিয়েছিলেন লুসিলি। সেখানে এক সমাজকর্মীর মুখে সন্তান পরিত্যাগকে “একটি সাধারণ পরিস্থিতি” হিসেবে বর্ণনা করতে শুনে তিনি বিস্মিত হন। এরপর বিচারক, পুলিশ কর্মকর্তা ও সমাজকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি নিয়ে আরও অনুসন্ধান করেন।

“আমার মতো একজন মানুষ, যে ভালোবাসাপূর্ণ একটি পরিবারে বড় হওয়ার সৌভাগ্য পেয়েছে, তার কাছে বিষয়টি প্রায় অকল্পনীয় ছিল,” বলেন লুসিলি।

এই অনুসন্ধানের পরই তিনি গল্পটি একজন কিশোরের দৃষ্টিকোণ থেকে বলার সিদ্ধান্ত নেন। থমাসের কাছে মায়ের অনুপস্থিতির কোনো ব্যাখ্যা নেই। সে শুধু জানে, তাকে ছেড়ে যাওয়া হয়েছে। ফলে তার রাগ ও হতাশাই হয়ে ওঠে গল্পের চালিকাশক্তি।

আর সেই আবেগের প্রকাশ ঘটে ব্রেকড্যান্সে।

থমাসের জন্য নাচ নিছক শখ নয়। যে অনুভূতিগুলো সে ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না, শরীরের গতির মধ্য দিয়ে সেগুলোই যেন বেরিয়ে আসে। হিপ-হপ ও ব্রেকড্যান্সের জগৎকে লুসিলি এমন একটি পরিসর হিসেবেও দেখেছেন, যেখানে তরুণরা নিজেদের সংকট ও হতাশাকে সৃজনশীলভাবে প্রকাশ করার সুযোগ পেতে পারে। কোরিওগ্রাফার আমালিয়া সাল-এর সঙ্গে কাজ করে নাচের দৃশ্যগুলোতে হিপ-হপের পাশাপাশি রিইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী মালয়া ছন্দ ও ক্রাম্পের উপাদানও যুক্ত করা হয়েছে। থমাসের নাচ তাই ধীরে ধীরে তার ভেতরের ক্ষোভ থেকে মুক্তির এক পথ হয়ে ওঠে।

তবে মারমাই শুধু থমাসের গল্প নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রিইউনিয়ন দ্বীপের নিজস্ব পরিচয়ও। সবুজ বন, নীল সমুদ্র, আগ্নেয় পাহাড়, তীব্র সূর্যের আলো এবং নানা জাতি ও ধর্মের মানুষের সহাবস্থান—সব মিলিয়ে দ্বীপটির প্রকৃতি ও সংস্কৃতি চলচ্চিত্রটির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

লুসিলির কাছে রিইউনিয়ন নিজেই যেন চলচ্চিত্রের আরেকটি চরিত্র। তাঁর মতে, দ্বীপটি এখনও নিজের পরিচয় খুঁজছে; আর সেই অনুসন্ধানের সঙ্গে তাঁর তরুণ চরিত্রগুলোর ভবিষ্যৎ খোঁজার একটি মিল রয়েছে।

এই কারণেই চলচ্চিত্রে রিইউনিয়ন ক্রেওল ভাষার ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ। চরিত্রগুলোকে তাদের স্বাভাবিক ভাষায় কথা বলাতে চেয়েছেন নির্মাতা। তাঁর কাছে ভাষাটি শুধু সংলাপের মাধ্যম নয়, বরং রিইউনিয়নের জীবন ও সংস্কৃতির স্বাভাবিক প্রকাশ।

চলচ্চিত্রের দৃশ্যায়নেও তাই রিইউনিয়নের পরিচিত সৌন্দর্যের পাশাপাশি বদলে যাওয়া দ্বীপটির সামাজিক বাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন লুসিলি। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল রিইউনিয়নকে শুধু দারিদ্র্য বা অনটনের জায়গা হিসেবে দেখানোর প্রচলিত ধারণা থেকে বের করে আনা।

সবশেষে মারমাই ফিরে আসে পরিবারে। মায়ের অনুপস্থিতির ক্ষতকে ঘিরে শুরু হলেও গল্পটি শেষ পর্যন্ত পুনর্মিলন, পারস্পরিক নির্ভরতা ও ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনার কথা বলে। থমাস, তার বোন অদ্রি এবং অদ্রির ছোট্ট সন্তান স্লোয়ান—এই তিনজনের সম্পর্কই হয়ে ওঠে গল্পের আবেগের কেন্দ্র।

লুসিলির ভাষায়, এটি শেষ পর্যন্ত একটি পরিবারের টিকে থাকার গল্প। আর সেই পরিবারের গল্প বলতে গিয়ে মারমাই কৈশোরের রাগ, নাচের শরীরী ভাষা, রিইউনিয়নের সংস্কৃতি ও প্রকৃতিকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলে।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : মারা গেলেন বর্ষীয়ান রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী বিভা সেনগুপ্ত

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন