ভিডিও দেখার পাশাপাশি সরাসরি পণ্য কেনার অভিজ্ঞতা আরও সহজ করতে নতুন দুটি সুবিধা চালু করেছে জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নতুন সুবিধার মধ্যে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিনির্ভর ‘শপিং অ্যাসিস্ট্যান্ট’ এবং অ্যাপের ভেতর থেকেই এক ক্লিকে পণ্য কেনার সুযোগ। এর ফলে ব্যবহারকারীদের পণ্য খোঁজা, পণ্যের তথ্য জানা থেকে শুরু করে কেনাকাটা সম্পন্ন করার পুরো প্রক্রিয়াই আরও সহজ হবে বলে আশা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
সোমবার নতুন এই সুবিধাগুলোর ঘোষণা দিয়েছে টিকটক। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন ‘শপিং অ্যাসিস্ট্যান্ট’ মূলত একটি কথোপকথনভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহকারী। ব্যবহারকারীর প্রয়োজন, পছন্দ ও বাজেটের মতো বিষয় বিবেচনা করে এটি বিভিন্ন পণ্য খুঁজে দিতে এবং কেনাকাটার সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে।
কোনো নির্দিষ্ট পণ্য সম্পর্কে জানতে চাইলে ব্যবহারকারী শপিং অ্যাসিস্ট্যান্টের সঙ্গে কথোপকথনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় তথ্য জানতে পারবেন। পণ্যের বৈশিষ্ট্য, বিস্তারিত বিবরণ, সরবরাহের তথ্য, মাপ এবং পণ্যটি বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে কি না—এসব বিষয়েও তথ্য দিতে পারবে এআই সহকারীটি। শুধু তথ্য দেওয়ার মধ্যেই এর কার্যক্রম সীমাবদ্ধ থাকবে না; প্রয়োজন অনুযায়ী কেনাকাটার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতেও এটি ব্যবহারকারীকে সহায়তা করবে।
টিকটকের দাবি, ব্যবহারকারীর সঙ্গে কথোপকথনের সময় তার প্রয়োজন ও পছন্দের বিষয়গুলো মনে রেখে পরবর্তী পরামর্শগুলো আরও ব্যক্তিগতকৃত করতে পারবে শপিং অ্যাসিস্ট্যান্ট। অর্থাৎ, একজন ব্যবহারকারী কী ধরনের পণ্য খুঁজছেন বা তার পছন্দ কেমন—সেসব তথ্য কথোপকথনের ধারাবাহিকতায় বিবেচনা করে তুলনামূলকভাবে উপযোগী পণ্য বা কেনাকাটার পরামর্শ দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে এই সুবিধার।
এআইভিত্তিক শপিং অ্যাসিস্ট্যান্টের পাশাপাশি টিকটক চালু করছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেনাকাটার সুবিধা। এর মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা অ্যাপের ‘ফর ইউ’ পাতায় ভিডিও দেখার সময়ই কোনো ব্র্যান্ডের পণ্য সরাসরি কিনতে পারবেন।
বর্তমানে অনলাইনে কোনো পণ্য সম্পর্কে জানতে বা সেটি কিনতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট বা ভিডিও থেকে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে যেতে হয়। নতুন সুবিধার মাধ্যমে সেই ধাপটি অনেকটাই কমিয়ে আনছে টিকটক। কোনো ভিডিওতে পছন্দের পণ্য দেখা গেলে ব্যবহারকারী টিকটক অ্যাপ না ছেড়েই পণ্যটির তথ্য জানতে এবং কেনাকাটা সম্পন্ন করতে পারবেন।
অর্থাৎ, ভিডিও দেখা ও কেনাকাটার মধ্যে যে দূরত্ব এত দিন ছিল, সেটি কমিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ফলে ব্যবহারকারীর জন্য কেনাকাটার প্রক্রিয়া যেমন সহজ হবে, তেমনি ভিডিও নির্মাতা ও ব্র্যান্ডগুলোর জন্যও পণ্য বিক্রির নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
টিকটকের এই উদ্যোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক বাণিজ্য বা সোশ্যাল কমার্সের বিস্তারের ধারার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহারকারীরা দীর্ঘ সময় কাটানোর কারণে এসব প্ল্যাটফর্মকে কেন্দ্র করে সরাসরি পণ্য বিক্রির সম্ভাবনাও দ্রুত বাড়ছে।
নতুন কেনাকাটার সুবিধাগুলো চালু করতে বিভিন্ন বাণিজ্য ও অর্থ পরিশোধ সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছে টিকটক। এসব অংশীদারের মধ্যে রয়েছে
এর মাধ্যমে টিকটক তাদের প্ল্যাটফর্মে পণ্য প্রদর্শন ও বিক্রির পাশাপাশি অর্থ পরিশোধ এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমের অবকাঠামোকেও আরও শক্তিশালী করতে চাইছে। প্রতিষ্ঠানটির জন্য এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টিকটক শপের মাধ্যমে কেনাকাটা দ্রুত জনপ্রিয় হয়েছে।
এত দিন টিকটকের বাণিজ্যিক কার্যক্রমের প্রধান কেন্দ্র ছিল ‘টিকটক শপ’। সেখানে বিভিন্ন ব্র্যান্ড ও বিক্রেতা নিজেদের পণ্য প্রদর্শন এবং বিক্রি করতে পারেন। নতুন সুবিধার মাধ্যমে সেই বাণিজ্যিক কার্যক্রমকে টিকটক শপের গণ্ডির বাইরে আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখন অ্যাপের অন্যান্য অংশে ভিডিও দেখার সময়ও ব্যবহারকারীদের সামনে সরাসরি কেনাকাটার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে।
টিকটকের কেনাকাটাভিত্তিক কার্যক্রমের প্রভাব ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে দৃশ্যমান। প্রতিষ্ঠানটির গত সপ্তাহে প্রকাশিত একটি অর্থনৈতিক প্রভাবসংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টিকটকের কার্যক্রম যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসাগুলোর জন্য ৮ হাজার ১০০ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি করেছে।
একই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ৫ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন নাগরিক জানিয়েছেন, টিকটকে ভিডিও দেখার মাধ্যমে তারা কোনো না কোনো পণ্য কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বা পণ্য কিনেছেন। এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, বিনোদনের পাশাপাশি পণ্য আবিষ্কার ও কেনাকাটার ক্ষেত্রেও প্ল্যাটফর্মটির প্রভাব বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রে টিকটক শপ আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয় ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে। এরপর অল্প সময়ের মধ্যেই প্ল্যাটফর্মটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান এর হিসাবে, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে টিকটক শপের মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ৫৮০ কোটি ডলারের পণ্য বিক্রি হয়েছে। দেশটির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক মোট বাণিজ্যের প্রায় ১৮ শতাংশ এসেছে এই বিক্রি থেকে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন এআই সহকারী এবং অ্যাপের ভেতরে সরাসরি কেনাকাটার সুবিধা চালুর ফলে টিকটকের বাণিজ্যিক কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হতে পারে। বিশেষ করে ভিডিও দেখার সময়ই পণ্য আবিষ্কার ও কেনার সুযোগ থাকায় ব্যবহারকারীদের কেনাকাটার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় কমে আসতে পারে।
টিকটকের নতুন উদ্যোগ একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ই-কমার্সকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার দিকেও ইঙ্গিত করছে। ব্যবহারকারীরা যেখানে আগে মূলত বিনোদন ও তথ্যের জন্য প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহার করতেন, সেখানে এখন সেই একই জায়গায় পণ্য খোঁজা, পণ্যের বিষয়ে পরামর্শ নেওয়া এবং কেনাকাটা সম্পন্ন করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে টিকটকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলো অনলাইন কেনাকাটার অভিজ্ঞতায় আরও বড় ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পড়ুন:চ্যাটজিপিটিকে ‘স্যার’ ডেকে ভাইরাল ভারতীয়
ইমি/


