রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকল: আয় বাড়লেও লোকসান প্রায় ৪৭৭ কোটি টাকা

রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলোর আয় বাড়লেও গত অর্থবছরে লোকসান থেকে বের হতে পারেনি বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি)। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে করপোরেশনের আওতাধীন চিনিকল ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় বেড়েছে ৩২৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। একই সময়ে ব্যয় কমেছে ২০৮ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। এরপরও বছর শেষে করোত্তর লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৭৭ কোটি টাকা।

বিজ্ঞাপন

তবে আগের অর্থবছরের তুলনায় লোকসান কিছুটা কমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিএসএফআইসির করোত্তর লোকসান ছিল প্রায় ৫৫৫ কোটি ৪১ লাখ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে তা কমে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে হয়েছে প্রায় ৪৭৬ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ করোত্তর লোকসান কমেছে প্রায় ৭৮ কোটি ৪৬ লাখ টাকা।

মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের শিল্প মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে বিএসএফআইসির আয়-ব্যয়ের এই হিসাব উপস্থাপন করা হয়। বৈঠকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার কলকারখানার বার্ষিক আয়-ব্যয় এবং আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়।

এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আয় ছিল ৮৯৫ কোটি ১৬ লাখ টাকা এবং ব্যয় ছিল ১ হাজার ৭৮৫ কোটি ৬২ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আয় বেড়েছে ৩২৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। একই সময়ে ব্যয় কমেছে প্রায় ২০৮ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে করপূর্ব লোকসান হয়েছে ৪২৫ কোটি ১৩ লাখ টাকা। প্রদেয় আয়কর হিসাব করার পর করোত্তর লোকসান দাঁড়িয়েছে ৪৭৬ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরে করপূর্ব লোকসান ছিল ৫১৯ কোটি ৯৬ লাখ টাকা এবং করোত্তর লোকসান ছিল ৫৫৫ কোটি ৪১ লাখ টাকা।

রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলোর আর্থিক চিত্রে ব্যাংক ঋণের সুদের প্রভাবও বড়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্যাংক ঋণের সুদ বাবদ ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৫৩০ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। পরের অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৪৩৩ কোটি ৪০ লাখ টাকায়। অর্থাৎ এক বছরে সুদের ব্যয় কমেছে প্রায় ৯৬ কোটি ৯৬ লাখ টাকা।

তবে ব্যাংক ঋণের সুদ বাদ দিয়ে হিসাব করলে লোকসানের চিত্র ভিন্ন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই হিসাবে লোকসান ছিল প্রায় ২৫ কোটি ৫ লাখ টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ সুদের ব্যয় বাদ দিলেও এক বছরে লোকসান বেড়েছে প্রায় ১৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের হিসাব এখনো চূড়ান্ত নিরীক্ষিত হয়নি। সংসদীয় কমিটির কার্যপত্রে ওই বছরের হিসাবকে ‘অডিট চলমান’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিপরীতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের হিসাব নিরীক্ষিত।

বিএসএফআইসির আওতাধীন চিনিকলগুলোর হিসাব দুটি ভাগে উপস্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে নয়টি ‘চালু চিনিকল’ এবং ছয়টির ক্ষেত্রে উল্লেখ করা হয়েছে ‘মাড়াই শুরু হয়নি’।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে চালু নয়টি চিনিকলের মোট আয় ছিল প্রায় ১ হাজার ১৯৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। বিপরীতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৪২১ কোটি ৭ লাখ টাকা। মজুদ সমন্বয় ও প্রদেয় আয়কর হিসাবের পর এসব চিনিকলের করোত্তর লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৪৬ কোটি ২৭ লাখ ৬৮ হাজার টাকা।

চালু নয়টি চিনিকলের মধ্যে রয়েছে ঠাকুরগাঁও, রাজশাহী, নর্থ বেঙ্গল, নাটোর, জয়পুরহাট, কেরু অ্যান্ড কোম্পানি, মোবারকগঞ্জ, ফরিদপুর ও জিলবাংলা চিনিকল।

তবে এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কেরু অ্যান্ড কোম্পানির আর্থিক চিত্র তুলনামূলকভাবে ভালো। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির আয় হয়েছে প্রায় ৫৮০ কোটি ৮৪ লাখ টাকা এবং ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩৫৯ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। করোত্তর লাভ হয়েছে প্রায় ১৬৫ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। ব্যাংক ঋণের সুদ বাদ দিয়ে হিসাব করলে প্রতিষ্ঠানটির লাভ দাঁড়ায় প্রায় ২০৪ কোটি ৪ লাখ টাকা।

পঞ্চগড়, সেতাবগঞ্জ, রংপুর, শ্যামপুর, পাবনা ও কুষ্টিয়া—এই ছয় চিনিকলকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের হিসাবে ‘মাড়াই শুরু হয়নি’ এমন প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখানো হয়েছে।

এই ছয় চিনিকলের মোট আয় ছিল মাত্র প্রায় ১৬ কোটি ১ লাখ টাকা। বিপরীতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৪৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। ফলে করোত্তর লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২৮ কোটি ৬৫ লাখ টাকা।

এর মধ্যে পঞ্চগড় চিনিকলের আয় ছিল প্রায় ৪৬ লাখ টাকা, বিপরীতে ব্যয় ২৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা। প্রতিষ্ঠানটির করোত্তর লোকসান হয়েছে প্রায় ২৮ কোটি ৩৪ লাখ টাকা।

পাবনা চিনিকলের আয় ছিল মাত্র ৫২ হাজার টাকা। ব্যয় হয়েছে প্রায় ২০ কোটি ৭৪ লাখ টাকা এবং করোত্তর লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। কুষ্টিয়া চিনিকলের আয় ছিল প্রায় ৪৫ লাখ টাকা, ব্যয় ২৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা এবং করোত্তর লোকসান প্রায় ২৭ কোটি ১০ লাখ টাকা।

সব মিলিয়ে ১৫টি চিনিকলের আয় হয়েছে প্রায় ১ হাজার ২১২ কোটি ৯১ লাখ টাকা। ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫৬৫ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। করোত্তর লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৭৪ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এর সঙ্গে বিএসএফআইসির অধীন রেনউইক যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোম্পানির হিসাব যুক্ত হলে করপোরেশনের মোট করোত্তর লোকসান দাঁড়ায় প্রায় ৪৭৬ কোটি ৯৫ লাখ টাকা।

লোকসানে থাকা চিনিকলগুলোকে লাভজনক করতে বিকল্প পণ্য উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংসদীয় কমিটি। বৈঠক শেষে সংসদ সচিবালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, চিনি ছাড়া চিনিকলগুলোতে উৎপাদিত অন্যান্য উপাদান ব্যবহার করে ‘বায়ো প্রডাক্ট’ তৈরি করে কীভাবে প্রতিষ্ঠানগুলোকে লাভজনক করা যায়, সে বিষয়ে প্রতিবেদন দিতে শিল্প মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আগামী বৈঠকে ওই প্রতিবেদন উপস্থাপন করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি, অর্থ ছাড়, ব্যয়ের হার এবং বাস্তবায়নের বিভিন্ন সমস্যাও পর্যালোচনা করেছে কমিটি।

বৈঠকে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের অধীন সার কারখানাগুলোর উৎপাদন ও উৎপাদন সক্ষমতা নিয়েও আলোচনা হয়। বন্ধ সার কারখানা পুনরায় চালু করা, গ্যাস সরবরাহ, কারখানা পরিচালনার সমস্যা এবং উৎপাদন ব্যয়সহ বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে। সার কারখানাগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ এবং বিদ্যমান উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে সংসদীয় কমিটি।

রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলোর আয় বাড়লেও সামগ্রিক লোকসান অব্যাহত থাকায় উৎপাদন ব্যয় কমানো, বন্ধ কারখানার সক্ষমতা কাজে লাগানো এবং চিনি ছাড়াও বিকল্প পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে আয় বাড়ানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পড়ুন:রামপালে দেশের সবচেয়ে বড় সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র হচ্ছে

ইমি/ ‎

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন