টলিউডে এখন আলোচনার অন্যতম বিষয় পরিচালক সৃজিত মুখার্জির নতুন সিনেমা ‘এম্পারর ভার্সেস শরৎচন্দ্র’। দুর্গাপূজা উপলক্ষে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেতে যাওয়া এই সিনেমাকে ঘিরে দর্শকদের আগ্রহও বাড়ছে। বিশেষ করে কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের চরিত্রে কে অভিনয় করছেন, কীভাবে সেই অভিনেতাকে বেছে নেওয়া হলো এবং সিনেমাটি নির্মাণের পেছনে পরিচালকের ভাবনা কী—এসব নিয়ে তৈরি হয়েছে কৌতূহল।
ছবিতে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের চরিত্রে অভিনয় করেছেন টোটা রায়চৌধুরী। তার চরিত্র নির্বাচন নিয়ে এবার মুখ খুলেছেন পরিচালক সৃজিত মুখার্জি। পরিচালকের বক্তব্য অনুযায়ী, শুরু থেকেই টোটাকে এই চরিত্রের জন্য চূড়ান্ত করা হয়নি। বরং দীর্ঘ চিন্তাভাবনা ও পর্যবেক্ষণের পর শেষ পর্যন্ত তার ওপর আস্থা রাখেন সৃজিত।
শরৎচন্দ্রের চরিত্রের জন্য টোটা রায়চৌধুরীই কি প্রথম পছন্দ ছিলেন—এমন প্রশ্নের জবাবে সৃজিত জানান, বিষয়টি এতটা সরল ছিল না। প্রাথমিক পর্যায়ে অভিনেতা অনির্বাণ ভট্টাচার্যের নাম তার মাথায় ছিল। কিন্তু চরিত্রটির সঙ্গে কাকে সবচেয়ে ভালোভাবে মানিয়ে নেওয়া যাবে, তা নিয়ে পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারছিলেন না তিনি।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ব্যক্তিত্ব, চেহারা এবং বিভিন্ন বয়সের উপস্থিতি নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ভাবতে হয়েছে তাকে। এজন্য কথাসাহিত্যিকের চারটি ভিন্ন বয়সের ছবি সবসময় নিজের কাছে রাখতেন পরিচালক।
সৃজিতের ভাষ্য অনুযায়ী, একদিন সেই ছবিগুলোর দিকে তাকাতে তাকাতেই হঠাৎ তার মনে হয়, শরৎচন্দ্রের চরিত্রের জন্য টোটা রায়চৌধুরীই সবচেয়ে উপযুক্ত। সেই মুহূর্তটিকে কিছুটা মজার স্মৃতির সঙ্গে তুলে ধরেছেন পরিচালক। তার ভাষায়, ছবিগুলো দেখতে দেখতে এবং প্রণ কাটলেটে কামড় দিতে দিতে যেন চরিত্র নির্বাচনের ‘মূল অঙ্ক’ মিলে যায়।
এরপর টোটাকে নিয়ে আর সংশয় ছিল না সৃজিতের। চরিত্রটির জন্য অভিনেতার চেহারা, ব্যক্তিত্ব এবং অভিনয়ক্ষমতার সমন্বয় তাকে আশ্বস্ত করে। ফলে প্রাথমিক ভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে শেষ পর্যন্ত টোটা রায়চৌধুরীকেই শরৎচন্দ্রের চরিত্রে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
নতুন সিনেমার কাজের সময় নিজের মেজাজ ও শুটিং সেটের পরিবেশ নিয়েও কথা বলেছেন সৃজিত। পরিচালকের কাজের ধরন নিয়ে দর্শকদের মধ্যে নানা ধারণা থাকলেও তিনি জানিয়েছেন, শুটিংয়ের সময় নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়টি অনেকাংশেই পুরো টিমের ওপর নির্ভর করে।
সৃজিত বলেন, তিনি ইচ্ছা করে চিৎকার করতে চান না। তবে মাথা ঠান্ডা রাখা অনেকটাই টিমের কাজের ওপর নির্ভরশীল। কাজে কোনো ঘাটতি থাকলে সেটি আশপাশের মানুষ বুঝতে পারেন এবং তার ওপরও তার প্রভাব পড়ে।
তবে ‘এম্পারর ভার্সেস শরৎচন্দ্র’-এর ক্ষেত্রে শুটিংয়ের পরিবেশ বেশ অনুকূল ছিল বলে জানিয়েছেন তিনি। ফলে কাজের সময় বড় ধরনের অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়নি বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন পরিচালক।
দুর্গাপূজা উপলক্ষে টলিউডে এবার একাধিক বড় বাজেটের সিনেমা মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে। ফলে প্রেক্ষাগৃহের পর্দা এবং দর্শক টানার ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই প্রতিযোগিতা তৈরি হবে। এই পরিস্থিতিতে ‘এম্পারর ভার্সেস শরৎচন্দ্র’ কতসংখ্যক হল পাবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
সৃজিত স্বীকার করেছেন, অন্য কয়েকটি সিনেমার তুলনায় তার ছবি হয়তো কমসংখ্যক প্রেক্ষাগৃহ পেতে পারে। তবে হলের সংখ্যা নিয়ে কিছুটা আক্ষেপ থাকলেও সিনেমার সাফল্য নিয়ে তিনি আত্মবিশ্বাসী।
তার প্রত্যাশা, দর্শকদের মধ্যে ছবিটি ভালো সাড়া ফেলবে এবং বাণিজ্যিকভাবেও সফল হবে। তার মতে, সিনেমার সাফল্য শুধু কতসংখ্যক হল দিয়ে শুরু হলো, তার ওপর নির্ভর করে না; দর্শকের গ্রহণযোগ্যতাই শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
নিজের দীর্ঘ ক্যারিয়ারের কথাও উল্লেখ করেছেন সৃজিত। ২০১০ সাল থেকে তার নির্মিত সিনেমাগুলোর দিকে তাকালে ব্যবসাসফল ছবির পাশাপাশি সমালোচকদের প্রশংসা পাওয়া সিনেমার সংখ্যাও কম নয় বলে মনে করেন তিনি।
তার বক্তব্য, সাফল্যের পেছনে নতুন করে দৌড়ানোর কোনো প্রয়োজন তিনি অনুভব করেন না। দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে গিয়ে বাণিজ্যিক সাফল্য এবং সমালোচকদের প্রশংসা—দুই ধরনের সিনেমাই নির্মাণ করেছেন তিনি। তাই নতুন কোনো সিনেমা নিয়ে শুধু ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতায় নামার প্রয়োজন দেখছেন না এই নির্মাতা।
টলিউডের বর্তমান বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা নিয়েও নিজের অবস্থান জানিয়েছেন সৃজিত মুখার্জি। তার মতে, সিনেমার বাজারে প্রতিযোগিতা থাকা স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয়। তবে সেই প্রতিযোগিতা যেন কোনোভাবেই অসুস্থ পরিবেশ তৈরি না করে।
সৃজিতের আহ্বান, নির্মাতা ও প্রযোজকদের মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতা থাকা উচিত। তবে সেই প্রতিযোগিতা যেন মাত্রা ছাড়িয়ে না যায়। গত বছরের কিছু ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সেসব ঘটনা তার কাছে নোংরামির পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
তার মতে, একাধিক সিনেমা একই সময়ে মুক্তি পেলে দর্শক নিজের পছন্দ অনুযায়ী সিনেমা বেছে নেবেন। তাই সিনেমাগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকলেও সেটি পারস্পরিক সম্মান ও পেশাদারিত্বের মধ্যেই থাকা উচিত।
সব মিলিয়ে ‘এম্পারর ভার্সেস শরৎচন্দ্র’ নিয়ে সৃজিতের আত্মবিশ্বাস স্পষ্ট। শরৎচন্দ্রের মতো বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ এক ব্যক্তিত্বকে পর্দায় কীভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, টোটা রায়চৌধুরী চরিত্রটি কতটা বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন এবং পূজার মৌসুমে দর্শক সিনেমাটিকে কীভাবে গ্রহণ করেন—এখন সেদিকেই নজর টলিউডের।
পড়ুন:মারা গেলেন বর্ষীয়ান রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী বিভা সেনগুপ্ত
ইমি/


