ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক ক্ষতির মুখে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আট মাসে মার্কিন সামরিক বাহিনীর অন্তত ৮১টি বিমান, ড্রোন ও হেলিকপ্টার ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব সামরিক সরঞ্জামের ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক মূল্য ৩৩০ কোটি ডলার পর্যন্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ক্ষতির তালিকায় আধুনিক যুদ্ধবিমানও
মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক পোস্ট জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিসের (সিআরএস) নতুন এক প্রতিবেদনে এই ক্ষয়ক্ষতির তথ্য উঠে এসেছে। ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক সরঞ্জামের তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে আধুনিক কয়েকটি যুদ্ধবিমানও রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে একটি এফ-৩৫এ লাইটনিং-২ স্টেলথ ফাইটার।
এ ছাড়া ১২টি এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমান ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৩০ মিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের তিনটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান গত ২ মার্চ কুয়েতের আকাশে নিজেদের বাহিনীর ভুল হামলায় ভূপাতিত হয়। পরের মাসে ইরানের আকাশেও আরেকটি এফ-১৫ ভূপাতিত হয়।
জর্ডানে ক্ষতিগ্রস্ত আরও আট এফ-১৫
গত ৯ ও ১০ সেপ্টেম্বর জর্ডানের মুয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে ইরানের বিমান হামলায় আরও আটটি এফ-১৫ই ফাইটার জেট সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌভাগ্যবশত ক্ষতিগ্রস্ত বিমানগুলো মেরামতের পর আবারও কাজে ফিরেছে।
হারিয়েছে ৪৫ রিপার ড্রোন
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি বড় ক্ষতির চিত্র উঠে এসেছে এমকিউ-৯ রিপার ড্রোনের হিসাব থেকে। নিউইয়র্ক পোস্টের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ৪৫টি রিপার ড্রোন হারিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রতিটি ড্রোনের মূল্য ৩ থেকে ৫ কোটি ডলার বলে ধারণা করা হয়।
নজরদারি ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা—দুই ধরনের কাজেই ব্যবহার করা যায় এসব বহুমুখী ড্রোন। চলতি বছরের মে মাসে মার্কিন বিমানবাহিনীর এক জেনারেল মার্কিন সিনেটকে জানিয়েছিলেন, ক্ষয়ক্ষতির কারণে রিপার ড্রোনের সংখ্যা কমে ১৩৫টিতে নেমে এসেছে।
এয়ার ফোর্স টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, যেকোনো সময় মোতায়েন করা সম্ভব এমন অন্তত ১৮৯টি রিপার ড্রোন প্রস্তুত থাকার কথা মার্কিন বিমানবাহিনীর। কিন্তু ক্ষয়ক্ষতির কারণে সেই সংখ্যা এখন অনেকটাই কমে এসেছে।
ক্ষতিগ্রস্ত এফ-৩৫-এর মূল্য ৯ কোটি ২০ লাখ ডলারের বেশি
বিশ্লেষণে মার্কিন সামরিক বাহিনীর পঞ্চম প্রজন্মের এফ-৩৫এ যুদ্ধবিমানের ক্ষয়ক্ষতির কথাও উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে আধুনিক যুদ্ধবিমানগুলোর একটি এই বিমানের মূল্য ৯ কোটি ২০ লাখ ডলারের বেশি। গত ১৯ মার্চ ইরানের হামলার মুখে পড়ে বিমানটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিস ২৭ কোটি ডলার মূল্যের একটি ই-৩ সেন্ট্রি নজরদারি বিমান হারানোর বিষয়টিও আলাদাভাবে উল্লেখ করেছে। পুরোনো হলেও গুরুত্বপূর্ণ এই বিমানটি বোয়িং ৭০৭ যাত্রীবাহী বিমানের নকশার ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
এয়ার ফোর্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বহরে এমন ৩২টি বিমান কার্যকর বা চালু ছিল।
এ-১০, ট্যাঙ্কার ও হেলিকপ্টারও ক্ষতির তালিকায়
এপ্রিল মাসে একটি এ-১০ থান্ডারবোল্ট-২ স্থল হামলার বিমান হারিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এরপর গত সেপ্টেম্বরে জর্ডানে চালানো ইরানের হামলায় আরও একটি এ-১০ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ইরান যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হওয়া মার্কিন বিমান ও হেলিকপ্টারের তালিকায় রয়েছে ১২টি এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমান, একটি এফ-৩৫এ লাইটনিং-২ স্টেলথ ফাইটার, দুটি এ-১০ ‘ওয়ারথগ’ হামলাকারী বিমান, আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী সাতটি কেসি-১৩৫ স্ট্র্যাটোট্যাঙ্কার বিমান এবং একটি ই-৩ সেন্ট্রি নজরদারি বিমান।
এ ছাড়া রয়েছে বিশেষ অভিযানবিষয়ক দুটি এমসি-১৩০জে কমান্ডো-২ বিমান, একটি এইচএইচ-৬০ডব্লিউ জলি গ্রিন-২ যুদ্ধ অনুসন্ধান ও উদ্ধার হেলিকপ্টার, দীর্ঘসময় আকাশে অনেক উঁচুতে উড়তে সক্ষম একটি এমকিউ-৪সি ট্রাইটন ড্রোন, তিনটি এমকিউ-১ মাল্টিরোল ড্রোন, একটি এএইচ-৬৪ অ্যাপাচি হামলাকারী হেলিকপ্টার, চারটি এএইচ-৬ লিটল বার্ড হালকা হামলাকারী হেলিকপ্টার এবং একটি এমএইচ-৬০ সি হক সামুদ্রিক হেলিকপ্টার।
যুদ্ধের মোট ব্যয় ছাড়িয়েছে ৪ হাজার কোটি ডলার
শুধু সামরিক সরঞ্জামের ক্ষয়ক্ষতিই নয়, ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক ব্যয়ও দ্রুত বেড়েছে। এর আগে গত মাসে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছিল, ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মোট ব্যয় বেড়ে ৪ হাজার ৩৬০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। গত আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে এই ব্যয় বেড়েছিল ৫০০ কোটি ডলার।
এর মধ্যে অস্ত্রের পেছনেও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় বেড়েছে ৬০০ কোটি ডলারের বেশি। সর্বশেষ কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসের প্রতিবেদনে অস্ত্রের ব্যয় ২ হাজার ১৭০ কোটি ডলার দেখানো হয়েছিল। এর মাত্র এক মাসের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের হিসাবে সেই ব্যয় বেড়ে ২ হাজার ৮১০ কোটি ডলারে পৌঁছায়।
হোয়াইট হাউস-পেন্টাগনের বক্তব্য মেলেনি
ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক ক্ষয়ক্ষতি ও ব্যয় নিয়ে মন্তব্য জানতে হোয়াইট হাউস এবং মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে নিউইয়র্ক পোস্ট।
ফলে আট মাসের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সরঞ্জামের ক্ষয়ক্ষতি এবং ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের যে চিত্র কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিসের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, তা নিয়েই এখন আলোচনায় এসেছে ইরান যুদ্ধে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ক্ষতির পরিমাণ।
পড়ুন: চিকিৎসায় বড় বদলের পথে বিএমইউ, চালু হচ্ছে পূর্ণাঙ্গরূপে
আর/


