সাইবেরিয়ার একটি প্লেগ গবেষণাকেন্দ্রে এক রুশ ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ানের মৃত্যু ঘিরে আন্তর্জাতিকভাবে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিরল এই সংক্রামক রোগটি গবেষণাগার থেকে ছড়িয়ে পড়েছে কি না, তা নিয়েও শুরু হয়েছে নানা জল্পনা। তবে ল্যাবকর্মীর মৃত্যুর কারণ নিয়ে রুশ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং স্থানীয়ভাবে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনের মধ্যে দেখা দিয়েছে অসঙ্গতি।
প্রাথমিকভাবে রুশ কর্মকর্তারা ওই ল্যাবকর্মীর মৃত্যুর সঙ্গে প্লেগের যোগসূত্রের কথা জানিয়েছিলেন। পরে তারা সেই সম্পর্ক অস্বীকার করেন। এর মধ্যেই স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে কোয়ারেন্টাইনের খবর প্রকাশিত হওয়ায় ঘটনাটি নিয়ে প্রশ্ন আরও বেড়েছে।
সাইবেরিয়া ও দূর প্রাচ্যের প্লেগ-প্রতিরোধী ইনস্টিটিউটে কর্মরত ২৮ বছর বয়সী দারিয়া শিপিলোভাকে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তিন দিন পর ইরকুটস্কের আঞ্চলিক রাজধানীর বাইরে শেলেখভ শহরে তার মৃত্যু হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে মৃত্যুর তারিখ ২ অক্টোবর বলা হলেও বিবিসি তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি।
শিপিলোভার মৃত্যুর পর হাসপাতালটিকে কোয়ারেন্টাইনের আওতায় নেওয়া হয়। একটি স্থানীয় অ্যালুমিনিয়াম কারখানায় মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা হয়। একই সময়ে ইরকুটস্কে একটি গণসমাবেশও বাতিল করা হয়েছিল।
শুক্রবার ওই অঞ্চলের গভর্নর ইগর কোবজেভ জানান, রাশিয়ার প্রধান স্যানিটারি ডাক্তার ‘এক বিশেষ বিপজ্জনক সংক্রমণের সন্দেহজনক ঘটনা’ তদন্ত করতে ইরকুটস্কে পৌঁছেছেন। শিপিলোভার সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদেরও পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি। ইজভেস্তিয়া সংবাদপত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৯৭ জনকে চিকিৎসাধীন পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছিল।
সেদিনই প্রতিবেশী বুরিয়াতিয়া অঞ্চলের গভর্নর জানান, পরীক্ষাগারের ওই কর্মী প্লেগে মারা গেছেন। এরপরই অ্যান্টি-প্লেগ ইনস্টিটিউটের গবেষণাগার থেকে জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। একজন স্থানীয় সাংবাদিকের অপ্রমাণিত প্রতিবেদনে এমন দাবিও করা হয় যে, একটি টেস্ট টিউব ভেঙে যাওয়ার পরই শিপিলোভা অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন।
তবে পরে তার মৃত্যুর কারণ নিয়ে ভিন্ন বক্তব্য সামনে আসে। রাশিয়ার ভোক্তা সুরক্ষা ও জনস্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ সংস্থা রস্পোট্রেবনাদজর জানায়, ওই ল্যাবকর্মী অজ্ঞাত কারণের একটি নতুন ধরনের নিউমোনিয়ায় মারা গেছেন। পরীক্ষায় তার ‘পেশাগত কার্যকলাপের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো অণুজীব’ পাওয়া যায়নি বলেও জানানো হয়।
এই বিবৃতির পর সরকারপন্থি একটি ফেডারেল সংবাদমাধ্যম প্লেগের সম্ভাব্য ঘটনা নিয়ে করা পাঁচটি পোস্ট সরিয়ে নেয়। একইভাবে বৈকালস্ক শহরের কর্তৃপক্ষও শেলেখভে সম্ভাব্য প্লেগ সংক্রমণের কারণে ভ্রমণ না করার পরামর্শ দিয়ে পাঠানো একটি বার্তা মুছে দেয়।
এর মধ্যেই স্থানীয় স্বাধীন সংবাদ ওয়েবসাইট ‘পিপল অফ বাইকাল’ তাদের সূত্রের বরাতে জানায়, ইরকুটস্কের অন্তত চারটি হাসপাতাল তিন সপ্তাহের কোয়ারেন্টাইনের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে এই খবরের আনুষ্ঠানিক কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি।
এদিকে বিবিসি নিউজ রাশিয়ান জানতে পেরেছে, ইরকুটস্ক অ্যান্টি-প্লেগ ইনস্টিটিউট অক্টোবরের শেষ দিকে চীন, মঙ্গোলিয়া এবং সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ কয়েকটি দেশের বিজ্ঞানীদের নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক প্লেগ নিয়ন্ত্রণ সম্মেলনের আয়োজন করতে যাচ্ছে। সম্মেলনটি আদৌ অনুষ্ঠিত হবে কি না, তা জানতে বিবিসি ইনস্টিটিউটটির সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
চতুর্দশ শতাব্দীতে ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস নামের জীবাণু ইউরোপের প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যার মৃত্যুর কারণ হয়েছিল। ইতিহাসে ওই মহামারি ‘ব্ল্যাক ডেথ’ নামে পরিচিত।
বর্তমানে ওশেনিয়া ছাড়া বিশ্বের সব মহাদেশেই প্লেগের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। রাশিয়ার বুরিয়াতিয়া অঞ্চলের মারমটের মতো ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর মধ্যেও এই রোগের জীবাণু রয়েছে।
মাছির কামড়, আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের তরল বা দূষিত পদার্থের সংস্পর্শ এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কণার মাধ্যমে মানুষ প্লেগে আক্রান্ত হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, নিউমোনিক প্লেগের সুপ্তিকাল খুবই কম হতে পারে—কখনো কখনো মাত্র ২৪ ঘণ্টা। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করে চিকিৎসা শুরু করা না হলে এটি প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
নিউমোনিক প্লেগের লক্ষণের মধ্যে শ্বাসকষ্ট ও কাশি রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে রক্তমিশ্রিত কফও দেখা দিতে পারে।
তবে ওই ল্যাবকর্মীর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ যা-ই হোক, প্লেগের কারণে বড় ধরনের মহামারি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা খুবই কম বলে মনে করেন রুশ বিজ্ঞান প্রতিবেদক ইরিনা ইয়াকুতেঙ্কো।
তার মতে, উন্নত দেশগুলোতে প্লেগের ব্যাপক প্রাদুর্ভাব টিকিয়ে রাখার মতো প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি নেই। তিনি বিবিসি রাশিয়ান পডকাস্টকে বলেন, ‘প্লেগের বিরুদ্ধে সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক ভালোভাবে কাজ করে, কারণ রোগটি এখন অত্যন্ত বিরল এবং এর ব্যাপক প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠার সুযোগ পায়নি।’
ঘটনাটি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও নজরদারি শুরু হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একজন মুখপাত্র সংবাদ সংস্থা পলিটিকোকে জানিয়েছেন, পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব মূল্যায়ন করতে সংস্থাটি রুশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
ইউরোপীয় কমিশনের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, ইউরোপীয় সংক্রামক রোগ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ইসিডিসির বিশেষজ্ঞরাও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।
রাশিয়ায় প্লেগের একটি সম্ভাব্য ঘটনার খবর যুক্তরাষ্ট্র ‘খুব গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছে’ বলে সোমবার জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এটি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত বলেও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন।
সাইবেরিয়ার প্লেগ গবেষণাকেন্দ্রে ল্যাবকর্মীর মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে কথা বলতে একটি ফোনালাপ নির্ধারিত হয়েছে বলেও জানান ট্রাম্প।
বুধবার সন্ধ্যায় সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, তিনি মনে করেন না এটি কোনো জৈব অস্ত্রের ঘটনা। তিনি বলেন, আমরা খুব শিগগিরই বিষয়টি জানতে পারব, তবে আমরা তা মনে করি না।
রুশ কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্প বলেন, তাদের কথা শুনলে মনে হয় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আমরা আশা করি সেটাই সত্য।
এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার সঙ্গে ‘গভীর আলোচনা’ চালিয়ে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।
তবে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, ট্রাম্পের সঙ্গে এ ধরনের কোনো ফোনালাপ নির্ধারিত ছিল না। অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সহযোগিতার প্রস্তাবকে স্বাগত জানান তিনি।
মঙ্গলবার বিবিসি রাশিয়া সম্পাদক স্টিভ রোজেনবার্গকে পেসকভ বলেন, ‘যখন সাহায্যের প্রস্তাব দেওয়া হয়, তখন তা সবসময়ই খুব ভালো লাগে।’
তিনি আরও বলেন, ইরকুটস্কের পরিস্থিতি সম্পর্কে শুধু সরকারি তথ্যই বিশ্বাসযোগ্য।
এদিকে রাশিয়া ও আন্তর্জাতিকভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটি নিয়ে ছড়াচ্ছে নানা ধরনের পরস্পরবিরোধী দাবি। বিবিসি অন্তত পাঁচটি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করেছে, যেগুলো কথিত দ্বিতীয় একজন ভুক্তভোগী সম্পর্কে অপ্রমাণিত তথ্য ছড়াচ্ছে।
এসব অ্যাকাউন্টের সম্মিলিত অনুসারীর সংখ্যা প্রায় এক লাখ ৬৯ হাজার। রুশ ভাষায় প্রায় অভিন্ন বার্তায় সেখানে দাবি করা হয়েছে, দারিয়া শিপিলোভার সহকর্মী হিসেবে পরিচিত ভিক্টর নাকলোনেনি নামের আরেক ব্যক্তি মারা গেছেন।
রস্পোট্রেবনাদজরের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রও এসব প্রতিবেদন নিশ্চিত করেনি। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে বিবিসি সরাসরি সংস্থাটির সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। অন্যদিকে সাইবেরিয়া ও সুদূর প্রাচ্যের প্লেগ-প্রতিরোধী ইনস্টিটিউট কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
পরে যাচাইবিহীন এই দাবিগুলো যুক্তরাজ্যের ডেইলি মেইলসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়। এসব প্রতিবেদনে তথ্যের উৎস হিসেবে রাশিয়ার ‘স্থানীয় গণমাধ্যম’-এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব পোস্ট ঘিরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, আবার কেউ এসব অ্যাকাউন্টকে ভুল তথ্য ছড়ানোর জন্য অভিযুক্ত করেছেন।
বিবিসি এক্স-এও বেশ কিছু যাচাইবিহীন দাবি শনাক্ত করেছে। এর কয়েকটি লাখ লাখবার দেখা হয়েছে।
একজন ব্লগার দাবি করেন, তিনি এক বন্ধুর কাছ থেকে এমন একটি বার্তা পেয়েছেন, যেখানে বলা হয়েছে রাশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর সেন্ট পিটার্সবার্গ লকডাউনে যেতে চলেছে। ওই পোস্টটি ৬০ লাখেরও বেশি বার দেখা হয়েছে। তবে সেন্ট পিটার্সবার্গের কর্তৃপক্ষ বা গণমাধ্যম—কেউই শহরে প্লেগের কোনো ঘটনা কিংবা লকডাউনের আশঙ্কার কথা জানায়নি।
আরেকটি পোস্টে একজন ব্যবহারকারী দাবি করেন, ‘রাশিয়ার একটি পরীক্ষাগার থেকে সদ্য ছড়িয়ে পড়া নিউমোনিক প্লেগ কোভিডের চেয়ে প্রায় ১০০ গুণ বেশি মারাত্মক’। পোস্টটি এক কোটি ১৩ লাখবার দেখা হয়েছে।
তবে চিকিৎসা না করা হলে নিউমোনিক প্লেগ মারাত্মক হতে পারে, কিন্তু কোভিডের মতো করে এর ব্যাপকভাবে মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা কম। এর অন্যতম কারণ, অ্যান্টিবায়োটিকের মাধ্যমে প্লেগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
পড়ুন: সৌদির বিমানবন্দরে হুথিদের হামলা, নিহত ৩
আর/


