কোনো কিছুর প্রতি ‘ইজাব’ অর্থ হলো, সেটির প্রতি ভালো লাগা, আকর্ষণ ও পছন্দ থাকা। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনে এমন কিছু বিষয় ছিল, যেগুলো তিনি পছন্দ করতেন। একজন মুসলিমের জন্য এসব বিষয় জানা গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে দৈনন্দিন জীবনে তাঁর পছন্দের কাজগুলো অনুসরণ করার সুযোগ তৈরি হয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পছন্দের বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে পরিচ্ছন্নতা, খাবার, পানীয়, সুগন্ধি এবং দৈনন্দিন জীবনের নানা আদব। হাদিসে বর্ণিত এমন কয়েকটি বিষয় তুলে ধরা হলো।
১. ডান দিক থেকে কাজ শুরু করা
দৈনন্দিন বিভিন্ন কাজে ডান দিককে অগ্রাধিকার দেওয়া রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পছন্দনীয় অভ্যাস ছিল। আয়েশা (রা.) বলেন, নবী (সা.) জুতা পরা, চুল আঁচড়ানো, পবিত্রতা অর্জনসহ তাঁর বিভিন্ন কাজে ডান দিক থেকে শুরু করতে পছন্দ করতেন। (বুখারি, হাদিস : ৫৩৮০)
এ থেকে বোঝা যায়, জুতা পরা কিংবা চুল আঁচড়ানোর মতো কাজেও ডান দিক দিয়ে শুরু করাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সুন্নাহ অনুযায়ী ডান দিককে অগ্রাধিকার দেওয়ার অন্যান্য ক্ষেত্রের মধ্যে রয়েছে ডান কাতে ঘুমানো, পোশাক পরা, মসজিদে প্রবেশ, খাবার খাওয়া, পানীয় পান করা এবং কাউকে কিছু দেওয়া বা কারও কাছ থেকে কিছু গ্রহণ করা।
২. সুন্দর ও নেক স্বপ্ন
রাসুলুল্লাহ (সা.) সুন্দর স্বপ্ন পছন্দ করতেন। আনাস ইবনু মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) সুন্দর স্বপ্ন পছন্দ করতেন। (সহিহুল জামি, হাদিস : ২১৩৫)
নেক ও সুন্দর স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ হতে পারে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, নবুওতের আর কিছু অবশিষ্ট নেই, তবে সুসংবাদসমূহ অবশিষ্ট রয়েছে। সাহাবিরা জানতে চাইলেন, সেই সুসংবাদ কী? তিনি বললেন, সুন্দর স্বপ্ন। (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
কেউ পছন্দনীয় স্বপ্ন দেখলে আল্লাহ তাআলার প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা এবং আনন্দিত হওয়া উচিত। পাশাপাশি স্বপ্নটি এমন ব্যক্তির কাছে বর্ণনা করা উচিত, যাকে সে ভালোবাসে অথবা যে তার কল্যাণ কামনা করে।
আবু সাঈদ আল-খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমাদের কেউ যখন এমন কোনো স্বপ্ন দেখে, যা তার ভালো লাগে, তাহলে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে। অতএব, সে যেন এ জন্য আল্লাহর প্রশংসা করে এবং তা অন্যের কাছে বর্ণনা করে। (সহিহ বুখারি)
৩. শুভ লক্ষণ ও সুন্দর কথা
ইসলাম অমূলক কুসংস্কারকে সমর্থন করে না। তবে ভালো কথা শুনে আশাবাদী হওয়া এবং আল্লাহর প্রতি সুধারণা রাখা পছন্দনীয়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-ও শুভ লক্ষণ পছন্দ করতেন।
আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সংক্রামক রোগ নিজে নিজে ছড়ানোর কোনো ক্ষমতা নেই এবং কুসংস্কারও নেই; তবে আমি শুভ লক্ষণ পছন্দ করি। সাহাবিরা জানতে চাইলেন, শুভ লক্ষণ কী? তিনি বলেন, সুন্দর কথা। (বুখারি, হাদিস : ৫৭৭৬)
৪. সুগন্ধি ও সুন্দর ঘ্রাণ
সুগন্ধি ও মনোরম ঘ্রাণ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পছন্দের বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্য কালো পশমের একটি জুব্বা তৈরি করেছিলেন। নবী (সা.) সেটি পরার পর শরীরে ঘাম হলে পশমের গন্ধ অনুভব করেন এবং পোশাকটি খুলে ফেলেন। বর্ণনাটিতে তাঁর সুন্দর সুগন্ধ পছন্দ করার কথাও উল্লেখ রয়েছে। (আবু দাউদ, হাদিস : ৪০৭৪)
৫. কদু বা লাউ
খাবারের মধ্যেও কদু বা লাউ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পছন্দের ছিল। আনাস (রা.) বলেন, তিনি নবী (সা.)-কে কদু পছন্দ করতে দেখেছেন। এরপর থেকে তিনিও কদু পছন্দ করতে শুরু করেন। (বুখারি, হাদিস : ৫৪২০)
এই বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, সাহাবায়ে কেরাম রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর খাবারের পছন্দও গভীরভাবে লক্ষ করতেন এবং তাঁর অনুসরণে আগ্রহী ছিলেন।
৬. ঠাণ্ডা ও মিষ্টি পানীয়
আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ঠাণ্ডা ও মিষ্টি পানীয় পছন্দ করতেন। (সহিহুল জামি, হাদিস : ২১৩৪)
৭. বকরির সামনের পায়ের মাংস
মাংসের নির্দিষ্ট একটি অংশও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পছন্দের ছিল। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) সামনের পায়ের মাংস পছন্দ করতেন। (আবু দাউদ, হাদিস : ৩৭৮১)
এখানে বকরির সামনের পায়ের মাংসের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা তাঁর পছন্দের খাবারের একটি ছিল।
৮. মিষ্টি খাবার ও মধু
মিষ্টি খাবার ও মধুও রাসুলুল্লাহ (সা.) পছন্দ করতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, নবী (সা.) মিষ্টি খাবার ও মধু পছন্দ করতেন। (বুখারি ও মুসলিম)
৯. সূর্য ঢলে পড়ার পর শত্রুর মুখোমুখি হওয়া
যুদ্ধের পরিস্থিতিতে শত্রুর মোকাবিলার ক্ষেত্রেও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পছন্দের সময়ের কথা হাদিসে উল্লেখ রয়েছে। আবু আওফা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) সূর্য ঢলে পড়ার সময় শত্রুর মুখোমুখি হতে পছন্দ করতেন। [তাবারানি; আলবানি (রহ.) হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন]
এটি যুদ্ধের পরিস্থিতিসংক্রান্ত একটি বিষয়। অর্থাৎ, যুদ্ধের ময়দানে শত্রুর মোকাবিলায় সূর্য ঢলে পড়ার সময়টি তাঁর পছন্দনীয় ছিল।
১০. হাতে খেজুরের ডাল বা গুচ্ছ রাখা
আবু সাঈদ আল-খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) খেজুরের ডাল বা গুচ্ছ হাতে ধরে রাখতে পছন্দ করতেন। (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৮০)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনের এসব সাধারণ পছন্দ ও অভ্যাসও সাহাবায়ে কেরামের দৃষ্টি এড়ায়নি। তাঁরা তাঁর ইবাদত ও বড় বড় আমলের পাশাপাশি খাবার, পানীয়, পরিচ্ছন্নতা, সুগন্ধি এবং দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট আদবও অনুসরণ করতেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসরণের শিক্ষা কেবল বড় কোনো আমলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং জীবনের সাধারণ অভ্যাস ও দৈনন্দিন আচরণেও তাঁর সুন্নাহ অনুসরণের সুযোগ রয়েছে। তাঁর পছন্দের বিষয়গুলো জানা এবং যথাসম্ভব সেগুলো অনুসরণ করাও তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও আনুগত্য প্রকাশের একটি দিক।
পড়ুন : তিন খাতায় লাল দাগ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী, কার চেয়ার যাচ্ছে? কারটা টিকবে?
সা/


