২৬ বছরের নিরলস প্রচেষ্টায় বৃক্ষরোপণ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও পরিবেশ সচেতনতায় অনন্য দৃষ্টান্ত গড়েছেন সিরাজগঞ্জের পরিবেশ সংগঠক মাহবুবুল ইসলাম পলাশ। নিজ অর্থায়নে দেশজুড়ে চালিয়ে যাচ্ছেন সবুজ বাংলাদেশ গড়ার লড়াই।
পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার প্রত্যয়ে দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন পরিবেশ সংগঠক মাহবুবুল ইসলাম পলাশ। দেশের ৬৪ জেলায় বৃক্ষরোপণ, বিরল প্রজাতির গাছ সংরক্ষণ, পাখির নিরাপদ আবাসস্থল তৈরি এবং পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধিতে তাঁর উদ্যোগ ইতোমধ্যে ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত তাঁর এই সবুজ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে।
সিরাজগঞ্জে তাঁর উদ্যোগে গড়ে ওঠা পরিবেশ ও প্রকৃতির পাঠশালা এখন বিরল ও বিপন্ন প্রজাতির বৃক্ষ সংরক্ষণ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। পাঠশালাটিতে বর্তমানে ৩৪৫ প্রজাতির পাঁচ হাজারেরও বেশি গাছ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নানা বিরল ও বিপন্ন প্রজাতির বৃক্ষ। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এখানে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সুন্দরবনের ২০ প্রজাতির গাছ সংরক্ষণ করা হয়েছে।
শুধু বৃক্ষ সংরক্ষণেই সীমাবদ্ধ নয় তাঁর কার্যক্রম। পাখিদের নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করতে পাঠশালা ও ব্যক্তিগত বাগানে গড়ে তুলেছেন ফলজ বৃক্ষসমৃদ্ধ পরিবেশ। পাশাপাশি রয়েছে একটি বিশেষ পুকুর, যেখানে মাছ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। পুকুরের মাছ দেশীয় ও পরিযায়ী পাখির খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এ উদ্যোগের মাধ্যমে পাখির খাদ্য ও নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্থানীয় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের চেষ্টা করছেন তিনি।
বর্তমানে দেশের ৬৪ জেলায় বিনামূল্যে মহাবিপন্ন ‘বৈলাম’ বৃক্ষের চারা বিতরণ ও রোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছেন মাহবুবুল ইসলাম পলাশ। পরিবেশ রক্ষার বার্তা ছড়িয়ে দিতে তাঁর এই প্রতীকী যাত্রা উত্তরের সর্বশেষ জনপদ পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া থেকে শুরু হয়ে দক্ষিণের শেষ প্রান্ত কক্সবাজারের টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। দেশের ভৌগোলিক বিস্তৃতিকে ধারণ করে এই কর্মসূচির মাধ্যমে বিরল প্রজাতির বৃক্ষ সংরক্ষণে মানুষকে উৎসাহিত করছেন তিনি।
পরিবেশের অন্যতম বড় সংকট প্লাস্টিক ও পলিথিনের ব্যবহার কমাতেও কাজ করছেন এই সংগঠক। প্লাস্টিক ও পলিথিনমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাট-বাজার ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে পাটের ব্যাগ ব্যবহারে সচেতনতা সৃষ্টি করছেন। পাশাপাশি বিনামূল্যে পাটের ব্যাগ বিতরণ করে পরিবেশবান্ধব বিকল্প ব্যবহারে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করছেন।
দীর্ঘ ২৬ বছরের পথচলায় তিনি প্রায় ১ লাখ ৮০০টির বেশি পরিবেশবান্ধব বৃক্ষ বিতরণ ও রোপণ করেছেন বলে জানা গেছে। নিজ উদ্যোগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী কলেজ প্রাঙ্গণেও বিরল প্রজাতির বৃক্ষের বাগান স্থাপন করেছেন। তাঁর বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে তিন লাখের বেশি মানুষের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিবেশ দিবসসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষে বৃক্ষ, লিফলেট ও সচেতনতামূলক উপকরণ বিতরণ করেন তিনি। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর ব্যক্তিগত বাগানে গড়ে ওঠা পাখির অভয়ারণ্যও পরিবেশ সংরক্ষণের এই প্রচেষ্টার একটি অংশ।
মাহবুবুল ইসলাম পলাশের এই দীর্ঘ কর্মযজ্ঞের অন্যতম বিশেষ দিক হলো, এর সব ব্যয় তিনি নিজ অর্থায়নে বহন করে আসছেন। পরিবেশ রক্ষা ও বৃক্ষরোপণে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ কৃষি খাতে ও বৃক্ষরোপণে দুইবার জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেছেন তিনি। এ ছাড়া পেয়েছেন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিসহ শতাধিক সম্মাননা।
মাহবুবুল ইসলাম পলাশ বলেন, “পরিবেশ রক্ষা শুধু একটি কর্মসূচি নয়, এটি আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তুলতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রত্যেক মানুষকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে।”
পরিবেশবাদীদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তিগত উদ্যোগে পরিচালিত পলাশের এই কার্যক্রম পরিবেশ সংরক্ষণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে বিরল প্রজাতির বৃক্ষ সংরক্ষণ, পাখির আবাসস্থল তৈরি এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর প্রচেষ্টা অনুপ্রেরণাদায়ক।
একটি সবুজ, দূষণমুক্ত ও জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে মাহবুবুল ইসলাম পলাশের এই নিরলস পথচলা প্রমাণ করে, সদিচ্ছা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টা থাকলে ব্যক্তিগত উদ্যোগও দেশজুড়ে পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পড়ুন : ‘অটোরিকশাচালক সুমনই তাজমিনকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করেন’
সা/


