বাড়ি ফেরার জন্য অটোরিকশায় উঠেছিল সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী জান্নাতুল তাজমীন। কিন্তু গন্তব্যের পথে গাড়ির দিক বদলে যেতেই বিপদের আশঙ্কা করে সে। চলন্ত অটোরিকশা থেকে লাফ দিয়ে পালানোর চেষ্টাও করে। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। পুলিশের দাবি, নির্জন স্থানে ধরে নিয়ে ধর্ষণে বাধা দেওয়ায় তাজমীনকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন চালক সুমন মিয়া (৩৫)। কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানখেতের পাশ থেকে স্কুলছাত্রীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় তদন্তে এমন তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
শনিবার (১০ অক্টোবর) সকালে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পঙ্কজ বড়ুয়া। এ ঘটনায় অভিযুক্ত অটোরিকশাচালক সুমনকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ৮ অক্টোবর রাত সাড়ে ১২টার দিকে পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডের ‘তিশা বাস কাউন্টার’-এর সামনে থেকে রেসকোর্স এলাকার বাসায় ফেরার জন্য অটোরিকশা ভাড়া করে তাজমীন। ৩০০ টাকা ভাড়ায় তাকে নিয়ে যাত্রা শুরু করেন সুমন। পথে তাজমীনের জন্য ১০০ টাকার কলা ও রুটি কিনে দেন তিনি। কিন্তু এরপরই বদলে যায় যাত্রার গতিপথ।
পুলিশ জানায়, রেসকোর্সের দিকে না গিয়ে সুমন অটোরিকশাটি ঘুরিয়ে চাঁদপুরগামী সড়কের দিকে নিয়ে যান। পথ পরিবর্তন দেখে ভয় পেয়ে যায় তাজমীন। চালকের সঙ্গে তার বাগ্বিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে চলন্ত অটোরিকশা থেকে নেমে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে সে। কিন্তু নির্জন স্থানে সুমন তাকে ধরে ফেলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এরপর তাজমীনকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগ করেছে ডিবি। পুলিশের ভাষ্য, তাজমীন বাধা দিয়ে ধস্তাধস্তি ও চিৎকার শুরু করলে সুমন গামছা দিয়ে তার গলা পেঁচিয়ে ধরেন। একপর্যায়ে সে নিস্তেজ হয়ে পড়লে মাটিতে ফেলে পা দিয়ে চেপে ধরে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
হত্যাকাণ্ডের পর তাজমীনের ভ্যানিটি ব্যাগ, আইফোন ও স্কুলব্যাগ নিয়ে যান সুমন। ভ্যানিটি ব্যাগটি পাশের ধানখেতে ফেলে রেখে অন্য একটি অটোরিকশায় করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন তিনি। পরে কাছের কাচিকাটা মসজিদের পুকুরে হাত-মুখ ধুয়ে আইফোনটি সেখানে লুকিয়ে রাখেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। এরপর চট্টগ্রামে গিয়ে আত্মগোপন করেন সুমন।
এর আগেই ৮ অক্টোবর সকালে লালমাই উপজেলার ভোরাজগৎপুর এলাকার ধানখেতের আইলের পাশে তাজমীনের মরদেহ দেখতে পান স্থানীয়রা। তাঁরা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করলে লালমাই থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। পরিচয় শনাক্তের জন্য আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পর তাজমীনের বাবা এসে মরদেহটি তাঁর মেয়ের বলে শনাক্ত করেন।
তাজমীন কুমিল্লার ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তার বাবা আবদুল আলীম রেনাটা পিএলসি কুমিল্লায় কর্মরত। মা কেয়া আক্তার। তাঁদের গ্রামের বাড়ি যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা গ্রামে। বাবার চাকরির সুবাদে পরিবারের সঙ্গে কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকায় থাকত তাজমীন।
মরদেহ উদ্ধারের পর হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ডিবি ও লালমাই থানা পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে ৯ অক্টোবর চট্টগ্রাম থেকে সুমনকে গ্রেপ্তার করে। পরে তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাগমারা এলাকার একটি পুকুরপাড়ের জঙ্গল থেকে তাজমীনের আইফোন উদ্ধার করা হয়। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অটোরিকশাটিও উদ্ধার করেছে পুলিশ।
সুমনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পর তাঁকে আদালতে সোপর্দ করার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পড়ুন: প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরীক্ষা স্থগিত, সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ
আর/


