কানাডা ও বাংলাদেশের মধ্যকার পাঁচ দশকের দীর্ঘ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরালো করা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং কৌশলগত অংশীদারত্ব সম্প্রসারণের লক্ষ্য নিয়ে চার দিনের সফরে ১১ থেকে ১৪ অক্টোবর বাংলাদেশ সফর করবেন কানাডার আন্তর্জাতিক উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী রণদীপ সারাই।
এ সফরকালে প্রতিমন্ত্রী সারাই বাংলাদেশ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে বৈঠক করবেন। ঢাকা ও কক্সবাজারে কানাডার অর্থায়নে পরিচালিত বিভিন্ন প্রকল্প সরাসরি পরিদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। সফরকালে তিনি তুলে ধরবেন—কানাডীয় আন্তর্জাতিক সহায়তা কীভাবে বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং নারী ও যুব সমাজের জন্য সুযোগ বৃদ্ধিতে কাজ করছে, যা টেকসই অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ও ভবিষ্যতে বাণিজ্য-বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
প্রতিমন্ত্রী সারাই তাঁর কক্সবাজার সফরে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মতবিনিময় করবেন এবং চলমান এ সংকট সামাল দিতে যুক্ত বিভিন্ন অংশীজনের কাছ থেকে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবেন। উল্লেখ্য, ২০১৭ সাল থেকে রোহিঙ্গা সংকট ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সহায়তায় কানাডা ৬০০ মিলিয়ন কানাডীয় ডলারের বেশি সাহায্য প্রদান করেছে।
কানাডা মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি ও অভিন্ন সমৃদ্ধ অর্জনে বাংলাদেশের সাথে একযোগে কাজ করার দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত কানাডা বাংলাদেশকে ৬.৩ বিলিয়ন কানাডীয় ডলারের বেশি উন্নয়ন সহায়তা দিয়েছে। বিশেষ করে ব্র্যাক ও আইসিডিডিআর,বির মতো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানে কানাডার দীর্ঘমেয়াদি অবদান অন্যতম।
এদিকে সম্প্রতি রাজধানীতে সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬’-এর সমাপনী দিনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ঢাকায় নিযুক্ত কানাডার রাষ্ট্রদূত অজিত সিং বলেন, বাংলাদেশ ও কানাডার বর্তমান সম্পর্ক প্রচলিত সহায়তাভিত্তিক কাঠামোর গণ্ডি পেরিয়ে একটি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারত্বের দিকে ধাবিত হচ্ছে। কানাডা বাংলাদেশকে কেবল বাণিজ্যের গন্তব্য নয়, বরং একটি উন্নত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার মনে করে।
কানাডিয়ান হাইকমিশনার আরও জানান, ২০২৫ সালের নানা চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতির মধ্যেও দুদেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ২৫ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ৪ বিলিয়ন কানাডীয় ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এছাড়াও গত মাসে সরকার-টু-সরকার পটাশ সার সরবরাহের নতুন একটি চুক্তি ঘোষিত হয়েছে; এই ব্যবস্থার অধীনে ২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে ৩.৫ মিলিয়ন টনেরও বেশি কানাডিয়ান পটাশ সরবরাহ করা হয়েছে।
অজিত সিং উল্লেখ করেন, কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, জ্বালানি, জলবায়ু প্রযুক্তি, শিক্ষা, ডিজিটাল প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং বিনিয়োগের মতো ক্ষেত্রে যৌথ সহযোগিতার বিস্তৃত সুযোগ রয়েছে। প্রাথমিক সাহায্যনির্ভরতার বাইরে এসে উভয় দেশের পরিপূরক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে একটি প্রগতিশীল ভবিষ্যৎ তৈরি করা সম্ভব।
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বাংলাদেশে সুশাসন, অর্থনৈতিক কাঠামো এবং নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সংস্কার অব্যাহত থাকলে স্বচ্ছতা ও স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পাবে, যা নতুন বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াবে এবং উভয় দেশের জন্য প্রবৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি করবে। একই সাথে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জেন্ডার সমতা এবং জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধিতেও কানাডার অংশীদারত্ব বহাল রয়েছে।
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী দেশগুলোর ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে কথা বলতে গিয়ে অজিত সিং বলেন, বড় শক্তি বা সামরিক শক্তির ওপর ভিত্তি করে গঠিত কোনো বিশ্বব্যবস্থা ছোট বা মাঝারি দেশগুলোর পূর্ণ স্বার্থ রক্ষা করতে পারে না। বাংলাদেশ ও কানাডার মতো দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষা একটি আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল, যেখানে সার্বভৌমত্ব বিসর্জন না দিয়েই বহুপাক্ষিক সহযোগিতার মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।
পড়ুন : অনির্দিষ্টকালের জন্য বিমানের রিয়াদগামী ফ্লাইট স্থগিত
সা/


