সত্য প্রকাশের লড়াই, সাংবাদিকতার ঝুঁকি এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের গল্প নিয়ে নির্মিত হয়েছে হিন্দি সিনেমা ‘রিপোর্টিং লাইভ’। পরিচালক ধ্রুব ত্রিপাঠীর এই ইনভেস্টিগেশন থ্রিলারে উঠে এসেছে সংবাদমাধ্যমের ভেতরের দ্বন্দ্ব, ক্ষমতাশালী মহলের প্রভাব এবং অবৈধ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের চিত্র। ছবিটির কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন বলিউড অভিনেত্রী পরিণীতি চোপড়া। গত ৯ অক্টোবর স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম নেটফ্লিক্সে মুক্তি পেয়েছে সিনেমাটি।
সাংবাদিকতার বাস্তবতা ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের চ্যালেঞ্জকে কেন্দ্র করে নির্মিত ছবিটি দর্শকদের সামনে তুলে ধরেছে এমন এক জগৎ, যেখানে সত্য প্রকাশের চেষ্টা করতে গিয়ে সাংবাদিকদের পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনে নানা ঝুঁকির মুখোমুখি হতে হয়। তবে বিষয়বস্তুর গুরুত্ব থাকলেও অভিনয় ও চিত্রনাট্যের কিছু সীমাবদ্ধতা নিয়ে দর্শকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
‘রিপোর্টিং লাইভ’-এর গল্প আবর্তিত হয়েছে একটি জনপ্রিয় সংবাদ চ্যানেলের সাংবাদিক সন্ধ্যা যাদবকে ঘিরে। প্রাইম টাইমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ খুঁজতে গিয়ে সন্ধ্যা এবং তাঁর ক্যামেরাম্যান বিনোদ শর্মা জড়িয়ে পড়েন একটি জটিল অনুসন্ধানে।
ভিসারগাঁওয়ে একটি সেতু ভেঙে কয়েকটি শিশুর মৃত্যুর ঘটনা দিয়ে শুরু হয় তাঁদের তদন্ত। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ খুঁজতে গিয়ে তাঁরা জানতে পারেন, এর পেছনে রয়েছে অবৈধ বালু উত্তোলনকে ঘিরে বড় ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ। স্থানীয় বাসিন্দা শিবা কাকার সহায়তায় তাঁরা এসব অনিয়মের প্রমাণ সংগ্রহ করতে শুরু করেন।
তদন্ত যত এগোতে থাকে, ততই স্পষ্ট হতে থাকে ক্ষমতাশালী ব্যক্তিদের স্বার্থ, স্থানীয় সিন্ডিকেটের প্রভাব এবং সত্য প্রকাশের পথে নানা বাধা। একটি দুর্ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে দুই সাংবাদিক কীভাবে বৃহত্তর দুর্নীতির জালে জড়িয়ে পড়েন, সেটিই ছবির গল্পের অন্যতম আকর্ষণ।
সিনেমাটিতে শুধু মাঠপর্যায়ে সাংবাদিকদের অনুসন্ধানই নয়, সংবাদমাধ্যমের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতাও তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। সম্পাদক ও চ্যানেল মালিকের মধ্যে মতপার্থক্য, সংবাদ প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিয়ে টানাপোড়েন এবং ব্যবসায়িক স্বার্থের সঙ্গে সাংবাদিকতার নীতির সংঘাত গল্পে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পেয়েছে।
সৎ সাংবাদিকেরা অনেক সময় সত্য জানার পরও তা প্রকাশ করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানের চাপ, ক্ষমতাশালী ব্যক্তিদের হুমকি কিংবা পেশাগত অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হন। ‘রিপোর্টিং লাইভ’-এ এসব পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে সাংবাদিকতার দায়িত্ব ও নৈতিকতার প্রশ্ন সামনে এসেছে।
মিহির যাদবের গল্পে নির্মাতারা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জটিলতা এবং সংবাদ সংগ্রহের পেছনের পরিশ্রমকে গুরুত্ব দিয়েছেন। ফলে সিনেমাটি শুধু রহস্য উন্মোচনের গল্পে সীমাবদ্ধ না থেকে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন তোলে।
ছবিটি মুক্তির পর দর্শকদের প্রতিক্রিয়ায় অভিনয়ের বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। সাংবাদিক সন্ধ্যা যাদবের চরিত্রে পরিণীতি চোপড়ার অভিনয় নিয়ে কারও কারও মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। তাঁদের মতে, চরিত্রটির সঙ্গে অভিনেত্রীর উপস্থাপনা পুরোপুরি মানানসই হয়ে ওঠেনি।
তবে ক্যামেরাম্যান বিনোদ শর্মার চরিত্রে দেবেন ভোজানির অভিনয় প্রশংসা পেয়েছে। তাঁর উপস্থিতি ছবির কিছু দুর্বলতা সামাল দিয়েছে বলে মনে করছেন দর্শকদের একাংশ। পাশাপাশি স্বল্প পরিসরে অভিনয় করেও নজর কেড়েছেন অমল পালেকর ও শাশ্বত চ্যাটার্জি।
অন্যদিকে, কিছু চরিত্রের অতিরঞ্জিত অভিনয় এবং চিত্রনাট্যের পরিচিত কিছু বাঁক সিনেমাটিকে প্রত্যাশিত মাত্রার থ্রিলার হয়ে উঠতে বাধা দিয়েছে বলে দর্শকদের একটি অংশের মত। ফলে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়বস্তু থাকা সত্ত্বেও গল্প বলার ধরনে আরও নতুনত্বের প্রয়োজন ছিল বলে মনে করছেন কেউ কেউ।
সাংবাদিকতা, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো প্রাসঙ্গিক বিষয়কে কেন্দ্র করে ‘রিপোর্টিং লাইভ’ দর্শকদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরেছে—সত্য প্রকাশের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিকেরা কতটা মূল্য দিতে বাধ্য হন?
পরিণীতি চোপড়াসহ অভিনয়শিল্পীদের পারফরম্যান্স নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া থাকলেও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ঝুঁকি এবং নিউজরুমের চাপ তুলে ধরার চেষ্টা ছবিটির উল্লেখযোগ্য দিক। তবে চিত্রনাট্যের পরিচিত ছক ও কিছু অভিনয়ের সীমাবদ্ধতার কারণে এটি কতটা দর্শকপ্রিয়তা অর্জন করবে, তা সময়ই বলে দেবে।
পড়ুন:অভিনেত্রী নাসিমা খান আর নেই
ইমি/


