এসএসসিতে ২ বিষয়ে ফেল করলে ১৫ দিনেই নেওয়া হবে পুনর্বার পরীক্ষা: শিক্ষামন্ত্রী

এসএসসি পরীক্ষায় দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়া শিক্ষার্থীদের ১৫ দিনের মধ্যে আবার পরীক্ষা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। ফেল করার ধারাবাহিকতা বছরের পর বছর চলতে দেওয়া হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের বারবার পরীক্ষা দেওয়া কিংবা শিক্ষাজীবনে কালক্ষেপণ করার সুযোগ আর রাখা হবে না। যারা সাধারণ শিক্ষায় অগ্রসর হতে পারবে না, তাদের কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থায় স্থানান্তর করা হবে।

বিজ্ঞাপন

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) দুপুরে বগুড়ার পল্লী উন্নয়ন একাডেমির (আরডিএ) মিলনায়তনে ৪৯তম বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত ৬৫১ জন কর্মকর্তার ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠানের উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে সরকারের ভাবনার বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীরা যাতে কোনোভাবেই পড়াশোনায় পিছিয়ে না পড়ে, সে উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

দেশে নৈতিকতার অবক্ষয় ঘটেছে উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এই অবস্থা থেকে সমাজকে বের করে আনতে হবে। সে লক্ষ্যেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিশেষ নির্দেশনায় সরকার এখন থেকে চতুর্থ শ্রেণি থেকেই বিদ্যালয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খেলাধুলা ও নৈতিক শিক্ষার প্রতি আলাদা গুরুত্বারোপ করেছে।

তিনি আরও জানান, পড়ালেখা ও খেলাধুলার সমন্বয়ে বিদ্যালয়ে উৎসবমুখর পরিবেশ গড়ে তোলার পাশাপাশি একটি প্রজন্মকে নৈতিকভাবে গড়ে তুলতে ইতিমধ্যেই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে খেলাধুলা শুরু করা হয়েছে। একই সঙ্গে আয়োজন করা হচ্ছে ‘প্রধানমন্ত্রী গোল্ডকাপ’।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. সরদার কেরামত আলীর সভাপতিত্বে উক্ত অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য উপস্থাপন করেন বগুড়া-৬ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বাদশা, আরডিএর মহাপরিচালক আব্দুল মজিদ এবং শিক্ষামন্ত্রীর সহধর্মিণী নাজমুন নাহার বেবী।

এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ এক বছর অপেক্ষা না করিয়ে তিন মাসের মধ্যে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন পরীক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ফল প্রকাশের স্বল্প সময়ের মধ্যে শুধু অকৃতকার্য বিষয়গুলোতে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়টি সরকারও অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছে।

গত শনিবার ঢাকার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে গণসাক্ষরতা অভিযান আয়োজিত ‘চ্যালেঞ্জড শিক্ষার্থী সম্মেলনে’ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শিক্ষার্থীরা নিজেদের নানা সংকট ও আবেগঘন অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ করে।

সম্মেলনে বরিশাল থেকে আসা ছাত্রী সিনথিয়া আক্তার মনি জানায়, পরীক্ষা চলার সময় টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। ফলে অসুস্থতার কারণে গণিত বিষয়ে ভালো প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হয়নি এবং সেটিতে অকৃতকার্য হয়। অথচ বাকি সব বিষয়েই সে জিপিএ-৫ পেয়েছে। নিজের এই কষ্টের কথা বলতে গিয়ে একপর্যায়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে ছাত্রীটি।

একইভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে আসা অপর এক ছাত্রী জানায়, পদার্থবিজ্ঞান ছাড়া অন্য সব বিষয়ে সে এ প্লাস, এ বা এ মাইনাস পেয়ে ভালো নম্বর পেলেও শুধু পদার্থবিজ্ঞানে অকৃতকার্য হওয়ার কারণে সহপাঠীদের চেয়ে এক বছর পিছিয়ে পড়তে হচ্ছে। তবে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়া হলে সে পাসের ব্যাপারে আশাবাদী জানিয়ে তিন মাসের মধ্যে অকৃতকার্য বিষয়ে পরীক্ষা নেওয়ার দাবি জানায়।

উল্লেখ্য, বর্তমানে কার্যকর থাকা নিয়ম অনুযায়ী এসএসসি বা এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষায় কেউ এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হলে তাকে পরবর্তী বছরে পুনরায় পরীক্ষায় বসতে হয়। সেক্ষেত্রে পরীক্ষার্থী শুধু অকৃতকার্য বিষয়ে নাকি সব বিষয়ে পরীক্ষা দেবে—সেই সুযোগ থাকে। তবে মাত্র একটি বা দুটি বিষয়ের জন্য পুরো একটি বছর অপচয় হওয়ায় শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে পিছিয়ে পড়ার পাশাপাশি তীব্র মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

সাম্প্রতিক প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, গত ১০ আগস্ট প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় মোট ৬ লাখ ৯০ হাজার শিক্ষার্থী এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে। এবার ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ছিল ৬৪ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ, যা বিগত ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। আর মাদ্রাসা ও কারিগরি বোর্ডসহ মোট ১১টি বোর্ডে গড় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে।

তবে ফল প্রকাশের পর পুনর্নিরীক্ষণ ও পুনর্মূল্যায়নে দেখা গেছে বিপুল পরিবর্তন। নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩ হাজার ৭৯ জন শিক্ষার্থী। এছাড়া প্রথমবার অকৃতকার্য ঘোষিত ৪ হাজার ৫৮৫ জন পরীক্ষার্থী পুনর্নিরীক্ষণে উত্তীর্ণ হয়েছে, যা গতবারের (২,২০৭ জন) তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তনের চিত্রটিই দ্রুত পুনপরীক্ষার দাবিকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

সরকারের এই মনোভাবের কথা তুলে ধরে গত শনিবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা এবং শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানিয়েছেন, এসএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষায় অকৃতকার্য প্রার্থীরা যেন এক বছর অপেক্ষা না করে তিন মাসের মধ্যে অকৃতকার্য বিষয়গুলোতে পরীক্ষা দিতে পারে, সেই বিষয়টি সরকার ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছে। সরকারের এই ভাবনার ধারাবাহিকতায় কীভাবে দ্রুত সময়ের মধ্যে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব, তা নিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করছে শিক্ষা বোর্ডগুলো।

শিক্ষাবিদ এবং শিক্ষা বোর্ডের বর্তমান ও সাবেক চেয়ারম্যানদের মতে, এই ব্যবস্থা কার্যকর হলে শিক্ষার্থীরা বিপুলভাবে উপকৃত হবে এবং শিক্ষা বোর্ডগুলোরও এই ধরনের পরীক্ষা পরিচালনার পূর্ণ সক্ষমতা রয়েছে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের একটি বছর রক্ষা পাওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত ও অনিয়মিত পরীক্ষার্থীদের একসাথে পরীক্ষা নেওয়া, আলাদা প্রশ্নপত্র তৈরি ও বিতরণ সংক্রান্ত নানা জটিলতা লাঘব হবে।

তবে চলতি বছরেই এটি কার্যকর সম্ভব কি না—সে বিষয়ে কিছুটা সংশয় প্রকাশ করেছেন অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান। তিনি জানান, যেকোনো পরীক্ষা নেওয়ার অন্তত তিন মাস আগে থেকে প্রশ্নপত্র তৈরির প্রস্তুতি নিতে হয়। তবে নীতিগত সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা এখনই চূড়ান্ত থাকলে দ্রুততম সময়ে এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব। এতে করে প্রথমবার ফেল করা শিক্ষার্থীরা সেশনজট ছাড়াই সহপাঠীদের সাথে একই শিক্ষাবর্ষে ভর্তির সুযোগ পাবে এবং সিলেবাসের দ্বৈততা এড়ানো সম্ভব হবে। তিনি এই পরিকল্পনাকে শতভাগ ইতিবাচক হিসেবে আখ্যা দেন।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নীতিগত সিদ্ধান্তের পাশাপাশি পরীক্ষার চূড়ান্ত সময়সূচি, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, বোর্ডের সক্ষমতা ও সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করেই এই ব্যবস্থা চালু করতে হবে।

পড়ুন : নিউইয়র্কে বিমানবন্দরে ড. ইউনূসকে কটূক্তির ঘটনায় আইনি ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি তথ্য উপদেষ্টার

সা/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন