দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতির মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় মশারিবাহিত এ রোগে আক্রান্ত হয়ে আরও নয়জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সারা দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এক হাজার ৯৫৪ জন রোগী।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুম থেকে পাঠানো ডেঙ্গুবিষয়ক এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ সব তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বিগত ২৪ ঘণ্টায় চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন দুই হাজার ৯৬৫ জন। এ নিয়ে চলতি বছরের ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত দেশজুড়ে মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক লাখ তিন হাজার ৩৯৬ জনে। তাদের মধ্যে এ যাবত মোট ৯৭ হাজার ২৯৬ জন রোগী চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
অন্যদিকে, নতুন করে ৯ জনের প্রাণহানির ফলে চলতি বছরে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে সারা দেশে সর্বমোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩১৬ জনে।
২৪ ঘণ্টায় বিভাগ ও অঞ্চলভিত্তিক ভর্তির চিত্র:
বিগত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে নতুন ভর্তি হওয়া ১,৯৫৪ জন রোগীর মধ্যে সর্বোচ্চ ৪৬৫ জন রয়েছেন ঢাকা বিভাগের (সিটি করপোরেশনের বাইরের) অঞ্চলগুলোতে।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগে ৩১৮ জন, খুলনা বিভাগে ২৩০ জন, বরিশাল বিভাগে ১৯৬ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১৯১ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৮৯ জন, রাজশাহী বিভাগে ১৮৪ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৯৭ জন, রংপুর বিভাগে ৭১ জন এবং সিলেট বিভাগে ১৩ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
বিগত বছরগুলোর ডেঙ্গু পরিস্থিতির পরিসংখ্যান তুলনা:
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিলেন এক লাখ দুই হাজার ৮৬১ জন এবং সে বছর ডেঙ্গুতে মারা যান মোট ৪১৩ জন।
এর আগে ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট এক লাখ এক হাজার ২১৪ জন আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং প্রাণহানি ঘটেছিল ৫৭৫ জনের।
তবে দেশের ইতিহাসে ডেঙ্গুর সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ দেখা গিয়েছিল ২০২৩ সালে। সে বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন মোট তিন লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন এবং রেকর্ডসংখ্যক এক হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল।
মশারিবাহিত রোগ ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর সাধারণ লক্ষণ, মারাত্মক জটিলতা এবং সঠিক পরিচর্যা সম্পর্কে সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। ডেঙ্গু সাধারণত দুই ভাগে—সাধারণ লক্ষণ ও মারাত্মক বা বিপজ্জনক লক্ষণ হিসেবে প্রকাশ পেয়ে থাকে। সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ না নিলে এটি জীবনঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
ডেঙ্গুর সাধারণ লক্ষণসমূহ:
তীব্র জ্বর: রোগীর শরীরে হঠাৎ করেই ১০১ থেকে ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত উচ্চমাত্রার জ্বর আসতে পারে।
তীব্র ব্যথা: মাথার প্রচণ্ড ব্যথার পাশাপাশি চোখের পেছনের অংশে এবং শরীরের বিভিন্ন পেশি ও জয়েন্টে তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়। এই ব্যথার তীব্রতার জন্যই ডেঙ্গুকে অনেক সময় ‘হাড়ভাঙা জ্বর’ বা ‘breakbone fever’ বলা হয়ে থাকে।
ত্বকে ফুসকুড়ি: সাধারণত জ্বর আসার দুই থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে রোগীর সারা শরীরে লালচে রঙের র্যাশ বা ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে।
অন্যান্য উপসর্গ: অতিরিক্ত ক্লান্তি, খাবারের প্রতি অরুচি, বমি বমি ভাব কিংবা বমি হওয়া।
মারাত্মক ডেঙ্গুর বিপজ্জনক লক্ষণ:
সাধারণত জ্বর কমে যাওয়ার ৩ থেকে ৭ দিনের মাথায় ডেঙ্গু মারাত্মক রূপ ধারণ করতে পারে, যা ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার বা ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম নামে পরিচিত। রোগীর মধ্যে এই বিপজ্জনক লক্ষণগুলো প্রকাশ পেলেই বিলম্ব না করে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে:
পেটে তীব্র ব্যথা হওয়া কিংবা অনবরত বমি হওয়া।
নাক, মাড়ি বা ত্বক থেকে রক্তপাত হওয়া অথবা বমি ও মলের সঙ্গে রক্ত যাওয়া।
শ্বাসকষ্ট দেখা দেওয়া কিংবা দ্রুত শ্বাস নেওয়া।
রক্তে প্লাটিলেট বা অনুচক্রিকা দ্রুত কমে যাওয়া।
রোগীর অতিরিক্ত দুর্বলতা বা চরম ছটফটানি ভাব দেখা দেওয়া।
ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে করণীয় ও প্রাথমিক সতর্কতা:
ডেঙ্গু ভাইরাসের বিরুদ্ধে সরাসরি নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ না থাকলেও সঠিক পরিচর্যা ও সুনির্দিষ্ট কিছু নিয়ম মেনে চললে রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে।
পর্যাপ্ত বিশ্রাম: রোগীকে সম্পূর্ণ শারীরিক বিশ্রামে রাখতে হবে।
তরল খাবার গ্রহণ: শরীরের রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে খাবার স্যালাইন (ORS), ডাবের পানি, লেবুর শরবত ও স্যুপের মতো প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার খাওয়াতে হবে।
ওষুধের ক্ষেত্রে চরম সতর্কতা: জ্বর ও শরীর ব্যথার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী শুধুমাত্র প্যারাসিটামল খাওয়া যাবে। ভুলেও অ্যাসপিরিন (Aspirin), আইবুপ্রোফেন (Ibuprofen) বা ডাইক্লোফেনাকের মতো ব্যথানাশক (NSAID) ওষুধ সেবন করা যাবে না, কারণ এগুলো রক্তপাতের ঝুঁকি মারাত্মক বাড়িয়ে দেয়।
নিয়মিত পরীক্ষা: চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে নিয়মিত রক্তের সিবিসি (CBC) এবং প্লাটিলেট কাউন্ট পরীক্ষা করাতে হবে।
পড়ুন : ডেঙ্গু প্রতিরোধে পাড়া-মহল্লায় মাইকিংয়ের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
সা/


