জীবনের খাতা পুরোপুরি মেলার আগেই অকালে ঝরে গেল একটি প্রাণ। নেত্রকোনার মদন উপজেলার নিভৃত পল্লী নায়েকপুর গ্রামে ঘটে গেল হৃদয়বিদারক এক ঘটনা। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকালে নিজ বসতঘর থেকে এক তরুণীর নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একটি সম্ভাবনাময় জীবনের এমন করুণ পরিণতি কেবল ওই পরিবারটিতেই নয়, বরং গোটা এলাকার মানুষের মনে গভীর রেখাপাত করেছে।
সন্তান হারানোর বেদনায় শোকে পাথর হয়ে গেছেন তরুণীর বাবা। চোখের জলে তিনি অভিযোগের আঙুল তুলেছেন একই গ্রামের এক যুবকের দিকে। তার দাবি, ওই যুবক তার মেয়েকে নানাভাবে ভয়ভীতি দেখাত এবং নির্যাতন করত। সম্প্রতি বিষয়টি এলাকায় জানাজানি হয়ে গেলে মেয়েটি লোকলজ্জা ও চরম মানসিক চাপে একেবারে ভেঙে পড়ে। তিনি মনে করেন, অপমান ও মানসিক নিপীড়ন সইতে না পেরেই তার মেয়ে আত্মহননের মতো চরম পথ বেছে নিয়েছে। বুকফাটা আর্তনাদের মাঝে তিনি প্রশাসনের কাছে এ ঘটনার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেছেন।
ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্ত যুবক ও তার পরিবারের বেশিরভাগ সদস্য গা ঢাকা দিয়েছেন। জানা গেছে, ঘরের দরজায় তালা ঝুলছে, চারপাশ নিস্তব্ধ। তবে বাড়িতে অবস্থান করা অভিযুক্তের বড় ভাবি তানিয়া আক্তারের সাথে কথা বলা সম্ভব হয়।
তানিয়া আক্তার বলেন, “ওই মেয়েটিকে নিয়ে আমার দেবরের ঘুরতে যাওয়ার ঘটনা আমরা গতকাল রাতেই প্রথম জানতে পেরেছি। আর আজ সকালে হঠাৎ করেই শুনতে পাই মেয়েটি আত্মহত্যা করেছে।” তিনি আরও জানান, খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই তার দেবরসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা বাড়ি ছেড়েছেন। তারা বর্তমানে কোথায় অবস্থান করছেন, সে বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না।
খবর পেয়েই দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যায় মদন থানা পুলিশ। অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সাথে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে প্রশাসন। মদন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালাহ উদ্দিন করিম জানান, ঘটনার নেপথ্যের কারণ উদ্ঘাটনে তারা কাজ শুরু করেছেন।
ওসি বলেন, “প্রাথমিক তদন্তে আমরা জানতে পেরেছি, ওই তরুণীর সঙ্গে স্থানীয় ওই ছেলের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। আমরা ইতিমধ্যে মরদেহটি উদ্ধার করেছি এবং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি শেষে ময়নাতদন্তের জন্য ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট নেত্রকোনা সদর হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করেছি।” তিনি আরও আশ্বস্ত করেন, ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে এবং সেই অনুযায়ী যথাযথ আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
একটি উঠতি প্রাণের এমন আকস্মিক ও করুণ বিদায় সমাজে নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। সম্পর্কের টানাপোড়েন, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং তরুণ সমাজের মানসিক স্বাস্থ্যের মতো বিষয়গুলো নিয়ে নতুন করে ভাববার সময় এসেছে। আপাতত নায়েকপুর গ্রামের বাতাস ভারী হয়ে আছে এক অজানা শোকে; স্বজনদের পাশাপাশি পুরো গ্রামবাসীর অপেক্ষা এখন ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং ন্যায়বিচারের। সুষ্ঠু তদন্তই হয়তো পারবে এই মৃত্যু রহস্যের জট খুলতে।
পড়ুন : ডেঙ্গুতে একদিনে আরও ৯ মৃত্যু
সা/


