বিনিয়োগে স্থবিরতা, প্রবৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশে নামার পূর্বাভাস বিশ্বব্যাংকের

ডলারের প্রবাহ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতিতে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও দেশের বিনিয়োগ খাতে তার ইতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। উল্টো শিল্পকারখানার মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে এবং সরকারি উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের গতিও কমেছে। অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এসব সূচক নতুন বিনিয়োগে উদ্যোক্তাদের অনাগ্রহের চিত্র তুলে ধরছে।

বিজ্ঞাপন

ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের মতে, উচ্চ সুদহার, জ্বালানি সংকট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগের বিপরীতে মুনাফার নিশ্চয়তা না থাকায় নতুন উদ্যোগ গ্রহণে পিছিয়ে রয়েছেন উদ্যোক্তারা। এ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই-আগস্টে দেশে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি হয়েছে ৫০ কোটি ৬৯ লাখ ডলারের। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ আমদানির পরিমাণ ছিল ৭৫ কোটি ৭ লাখ ডলার। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে ৩২ দশমিক ৫০ শতাংশ।

তবে একই সময়ে সব ধরনের পণ্য আমদানির ব্যয় বেড়েছে ১২ দশমিক ১ শতাংশ। জুলাই-আগস্টে মোট আমদানি ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২২০ কোটি ডলারে। অর্থাৎ সামগ্রিক আমদানি বাড়লেও শিল্পকারখানা স্থাপন ও সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানি কমিয়েছেন উদ্যোক্তারা।

শুধু মূলধনি যন্ত্রপাতি নয়, শিল্প খাতের অন্যান্য মূলধনি পণ্যের আমদানিও কমেছে। আলোচ্য সময়ে এসব পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ১০৯ কোটি ৮৫ লাখ ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের ১২৫ কোটি ৪৮ লাখ ডলারের তুলনায় ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ কম। সব মিলিয়ে শিল্প খাতের মূলধনি পণ্য আমদানির ব্যয় প্রায় ২০ শতাংশ কমে ১৬০ কোটি ৫৪ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে।

বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধিও বিনিয়োগে দুর্বলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৬ সালের আগস্ট শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। জুলাইয়ে এ হার ছিল ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ। এর আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুনে ঋণের প্রবৃদ্ধি নেমে আসে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে।

বন্ধ ও রুগ্‌ণ শিল্পকারখানা চালু করা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল করতে গত ২৩ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ঋণ প্যাকেজ ঘোষণা করেন। তবে এ উদ্যোগের পরও ঋণপ্রবাহে প্রত্যাশিত গতি আসেনি।

এনসিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামসুল আরেফিন বলেন, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা রয়েছে, যার প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও পড়ছে। এ পরিস্থিতিতে ঋণের প্রবৃদ্ধি খুব বেশি বাড়ার সম্ভাবনা কম।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমানের মতে, ঋণের চাহিদা নির্ভর করে অর্থনীতিতে ব্যবসা ও বিনিয়োগের সুযোগ কতটা রয়েছে তার ওপর। উদ্যোক্তারা ঋণের অর্থ ব্যবহার করে লাভের সম্ভাবনা দেখলেই ঋণ নিতে আগ্রহী হবেন।

বাংলাদেশ চেম্বারের সভাপতি ও তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, বিনিয়োগের বিপরীতে মুনাফার নিশ্চয়তা না থাকায় নতুন বিনিয়োগের আগ্রহ কমেছে। বিদ্যমান অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালু রাখাও উদ্যোক্তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যবসায়ীরা পরিস্থিতির উন্নতি আশা করেছিলেন। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, উচ্চ সুদহার ও অন্যান্য সমস্যার কারণে বিনিয়োগ সহায়ক পরিবেশ এখনো ফিরে আসেনি।

নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমও ব্যবসা সম্প্রসারণের প্রতিকূল পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন। তাঁর মতে, জ্বালানি সংকট ও উৎপাদন ব্যয়ের চাপ ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ফলে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগের বদলে বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখার দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন।

বেসরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি সরকারি উন্নয়ন ব্যয়েও স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় ব্যয় হয়েছে ৫ হাজার ৭০৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এটি মোট বরাদ্দের মাত্র ১ দশমিক ৮৫ শতাংশ।

আগের অর্থবছরের একই সময়ে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ২ দশমিক ৩৯ শতাংশ। তখন ব্যয় হয়েছিল ৫ হাজার ৭১৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। এর আগের অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বাস্তবায়নের হার ছিল ২ দশমিক ৫৭ শতাংশ। সরকারি উন্নয়ন ব্যয়ের এ ধীরগতি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রত্যাশিত গতি ফেরানোর ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বিনিয়োগে দুর্বলতার প্রভাব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির ৬ অক্টোবর প্রকাশিত পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। গত এপ্রিলে এ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ছিল ৪ দশমিক ৬ শতাংশ।

বিশ্বব্যাংকের মতে, জ্বালানি সংকট, আর্থিক খাতের দুর্বলতা, রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে চাপে রেখেছে। সংস্থাটি ২০২৭-২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হওয়ার পূর্বাভাস দিলেও এজন্য জ্বালানি সরবরাহের উন্নতি ও সংস্কার কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

এদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আগের মাসে এ হার ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমানোর পাশাপাশি ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়ও বাড়াচ্ছে।

ঢাকায় বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মনে করেন, বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি বাড়াতে আর্থিক খাতের দুর্বলতা দূর করা, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি। তাঁর মতে, পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচির অর্থ প্রকৃত উৎপাদনশীল শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ঋণের অর্থ উৎপাদন বাড়াতে কাজে লাগে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ডলারের প্রবাহ ও রিজার্ভে স্বস্তি অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হলেও তা বিনিয়োগ বৃদ্ধির নিশ্চয়তা দেয় না। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে ব্যবসার অনুকূল পরিবেশ, জ্বালানি নিরাপত্তা, ঋণের কার্যকর প্রবাহ এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় বিনিয়োগের স্থবিরতা শিল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতিকে আরও দুর্বল করে দিতে পারে।

পড়ুন:বিশ্ববাজারে বাড়লো স্বর্ণের দাম

ইমি/ ‎

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন