চট্টগ্রামে ভুল খতিয়ানে চুক্তির কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন ভূমি মালিক ও ডেভেলপার উভয়েই। এ নিয়ে চলছে মামলা-মোকদ্দমা, কয়েকটি ফ্ল্যাটে ঝুলছে তালা। ভুক্তভোগীদের দাবি, জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপেই হতে পারে এর সমাধান।
২০১১ সালে আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকার ২৭ নম্বর সড়কে ১০ কাঠা জমির ওপর আবাসন নির্মাণের জন্য বিল্ডকিং রিয়েল এস্টেট কোম্পানির সঙ্গে উন্নয়ন চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী ২০১৫ সালের মধ্যে ফ্ল্যাট হস্তান্তরের বাধ্যবাধকতা থাকলেও ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান সেই অঙ্গীকার রক্ষা করেনি বলে অভিযোগ।
ফ্ল্যাট হস্তান্তরের পরও মালিকানা-সংক্রান্ত দলিল, হস্তান্তরপত্র ও অনুমোদনের কাগজপত্র অনেক মালিক আজও পাননি। অথচ চুক্তিতে নির্ধারিত সময়ে ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দিতে ব্যর্থ হলে প্রতিটি ফ্ল্যাটের জন্য প্রতি মাসে ৩০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণের শর্ত ছিল বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
ভূমি মালিকদের অভিযোগ, ক্ষতিপূরণের দাবি থেকে বাঁচতে ডেভেলপার কোম্পানি উল্টো ভূমি মালিকদের বিরুদ্ধে ভুল দাগ-খতিয়ানে চুক্তি করে প্রতারণার অভিযোগে মামলা করেছে।
নাগরিকের অনুসন্ধানে জানা যায়, ভবনটি যে বিএস দাগে নির্মিত হয়েছে, চুক্তিতে সেই দাগ বা খতিয়ান উল্লেখ করা হয়নি।
ডেভেলপার কোম্পানির দাবি, ভূমি মালিকেরা ২০১১ সালে প্রতারণার উদ্দেশ্যে বিএস ৮৭৩৪, ৮৭৩৫ ও ৮৭৩৬ এই তিন দাগে ৮/৩৯ নামজারি খতিয়ান তৈরি করে দিয়েছিলেন। সেই খতিয়ান অনুযায়ী চুক্তি হলেও দখল বুঝিয়ে দেওয়া হয় বিএস ১০৬০৩ দাগে।
কিন্তু নথি বলছে ভিন্ন কথা। সিডিএর এই প্লটটি ১৯৭৪ সালে বরাদ্দ পেয়েছিলেন মোহাম্মদ আবদুল কাদের। বাংলাদেশ সরকারের বিএস জরিপে তার নামে প্লটটি বিএস ১০৬০৩ দাগে ১২৬ নম্বর খতিয়ানে চূড়ান্তভাবে রেকর্ডভুক্ত হয়। কিন্তু সেই খতিয়ানের কপি তার কাছে ছিল না।
১৯৯৩ সালে খাজনা পরিশোধের জন্য দলিলপত্র নিয়ে ভূমি অফিসে গেলে ভূমি অফিসের পরামর্শে তিনি ১০৬/৯৩-৯৪ নম্বর মামলায় নামজারির আবেদন করেন। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ২৯/০৬/১৯৯৪ তারিখের আদেশে ৮/৩৯ নম্বর খতিয়ান সৃষ্টি করেন।
সেই খতিয়ানের ভিত্তিতেই বছরের পর বছর খাজনা পরিশোধ করেন আবদুল কাদের। তার মৃত্যুর পর ওয়ারিশরাও একই খতিয়ানে খাজনা দিতে থাকেন। ২০১১ সালে ডেভেলপার কোম্পানির চাহিদা অনুযায়ী নিজেদের নামে নামজারি করার সময়ও খতিয়ান নম্বর ৮/৩৯ অপরিবর্তিত থাকে।
অর্থাৎ, ৮/৩৯ খতিয়ানটি ২০১১ সালে প্রতারণার জন্য তৈরি করা হয়নি, এটি ১৯৯৪ সালে অজ্ঞতাবশত সৃষ্ট একটি ভুল।
এখানে প্রশ্ন উঠেছে, ২০১১ সাল থেকে প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ডেভেলপার কোম্পানি এত বড় প্রকল্প কোনো ধরনের সার্ভে ছাড়া গ্রহণ করেছিল কি না। অভিযোগ রয়েছে, তারা কোনো সার্ভে করেনি। সিডিএর অনুমোদনও নেওয়া হয় ওই ভুল দাগের ভিত্তিতেই।
বিষয়টি সামনে আসার পর ভূমি মালিকেরা ডেভেলপার কোম্পানির সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করেন এবং রিহ্যাবকেও অবহিত করেন। কিন্তু অভিযোগ, ডেভেলপার কোম্পানি আলোচনায় না বসে মামলা করে।
পরবর্তীতে ১৪ মে ২০২৬ তারিখে আগ্রাবাদ সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর ৮/৩৯ নম্বর ভুল খতিয়ান বাতিলের আবেদন করেন। ভূমি অফিস, কানুনগো ও সার্ভেয়ারের প্রতিবেদনেও খতিয়ানটি ভুল দাগের ভিত্তিতে তৈরি বলে উল্লেখ করা হয়।
এ বিষয়ে আগ্রাবাদ সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) দেবব্রত দাশ বলেন, বাদীপক্ষের শুনানি গ্রহণ করা হয়েছে। যেহেতু এই খতিয়ানের ভিত্তিতে চুক্তি হয়েছে, তাই খতিয়ান বাতিলের আগে কোম্পানির বক্তব্য শোনা প্রয়োজন। কোম্পানিটি অনাপত্তি জানালে ভুল খতিয়ানটি বাতিল করা হবে।
ডেভেলপার মালিকদের সংগঠন রিহ্যাবের পরিচালক ও চট্টগ্রামের কো-চেয়ারম্যান আবদুল গাফফার মিয়াজী বলেন, যেহেতু উভয়ের স্বার্থ জড়িত, তাই ভুল খতিয়ান বাতিল করা প্রয়োজন। উভয় পক্ষ সম্মত হলে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধের সমাধান সম্ভব।
পড়ুন : আগুন নিয়ন্ত্রণে যোগ দিয়েছে সেনাবাহিনী ও বিজিবি
সা/


