বাংলাদেশের বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও ঋণ ব্যবস্থাপনায় সহায়তার আশ্বাস যুক্তরাষ্ট্র-চীনের

বিদ্যমান অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে বাংলাদেশকে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতাধর দুই দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। থাইল্যান্ডের ব্যাংককে চলমান বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সভার ফাকে গতকাল বুধবার মার্কিন ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট এবং চীনের এক্সিম ব্যাংকের প্রতিনিধিবর্গের সঙ্গে অনুষ্ঠিত পৃথক বৈঠকে এই ইতিবাচক সাড়া পায় বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল। বৈঠকে উপস্থিত বাংলাদেশের একাধিক কর্মকর্তা এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

বিজ্ঞাপন

কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যমতে, চীন মূলত বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিকাশ এবং বিনিয়োগ বাড়াতে দারুণ আগ্রহী। বিষয়টিতে আরও বিস্তারিত আলোচনার লক্ষ্যে এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যানের আগামী সপ্তাহে ঢাকা সফরে আসার কথা রয়েছে। অন্যদিকে ঋণ ব্যবস্থাপনাসহ দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে সহযোগিতার আশ্বাস এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টের পক্ষ থেকে। বিশেষ করে আইএমএফের ঋণ সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় দেশটির এই সংহতিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে ঢাকা।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বৃহৎ পরিসরে নিত্যপণ্য, জ্বালানি তেল ও উড়োজাহাজ আমদানির পটভূমিতে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় মার্কিন বিশেষ সাহায্য ও অনুদান চাওয়া হয়। বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের এ প্রস্তাব ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

বৈঠক শেষে সামগ্রিক প্রেক্ষাপট নিয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘অতীতে আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেমন কিছু পাইনি। কিন্তু বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক যেভাবে এগিয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটে আমরা আরও সহায়তা প্রত্যাশা করছি।’

অর্থমন্ত্রী আরও জানান, সাম্প্রতিক সময়ে ওয়াশিংটনের সাথে ঢাকার বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্ক ইতিবাচকভাবে এগিয়েছে। সয়াবিনসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির পাশাপাশি বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে উড়োজাহাজও ক্রয় করছে। ফলে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের দৃশ্যমান সহায়তা পাওয়া যৌক্তিক।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের মনোভাব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও ইউএস ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো একটি বিষয়ে একমত যে— বাংলাদেশ বিদ্যমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক সংকট মূলত উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে আরও জটিল হয়েছে।

উপদেষ্টা আরও যুক্ত করেন, “বিগত সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি কোনো কিছু লুকিয়ে না রেখে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সঙ্গে মোকাবিলা করছে বর্তমান সরকার। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি, ইউএস ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টসহ আন্তর্জাতিক অংশীদাররা সরকারের সংস্কার কৌশলের প্রতি আস্থা প্রকাশ করেছে।”

তিনি আশা প্রকাশ করে জানান, বর্তমান সরকারের আন্তরিক সংস্কার ভাবনার কারণেই তারা সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, যার দৃশ্যমান অগ্রগতি ও বাস্তবায়ন আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যেই আসবে।

বিনিয়োগে গুরুত্ব এবং ব্যাংক ও রাজস্ব খাতের সংস্কার:

বার্ষিক সভার বিভিন্ন আলোচনায় বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল স্পষ্ট করেছে যে, ঢাকা এখন সার্বভৌম ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমিয়ে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) এবং ইকুইটি ইনভেস্টমেন্টে বেশি নজর দিচ্ছে। এ লক্ষ্যে চীনা এক্সিম ব্যাংকের অর্থায়নে যৌথ বিনিয়োগের সুযোগও খোঁজা হচ্ছে।

অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে সরকারের মূল কৌশল তুলে ধরে বৈঠকে বলা হয়:

রাজস্ব খাত: করের হার না বাড়িয়ে ফাঁকি বন্ধের মাধ্যমে করের পরিধি বাড়ানো এবং রাজস্ব নীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব সংগ্রহের কাজ পৃথক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ব্যাংক খাত: সময়সীমা নির্ধারণ করে সংস্কার, খেলাপি ঋণ হ্রাস, দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন ও আমানতকারীদের আস্থা ফেরানোর কাজ চলছে।

উৎপাদন ও শিল্প: বন্ধ কারখানা পুনরায় চালু করতে এবং বেসরকারি ঋণপ্রবাহ বাড়াতে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ অর্থায়ন প্যাকেজ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সামাজিক সুরক্ষা: মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা নিম্নআয়ের পরিবার ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘ফার্মার্স কার্ড’ برنامೆಗೆ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

তরুণ জনগোষ্ঠী ও অর্থনীতি নিয়ে আইএমএফের তাগিদ:

এদিকে বার্ষিক সভা উপলক্ষে আয়োজিত পৃথক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা দক্ষিণ এশিয়ার বিপুল তরুণদের অর্থনৈতিক সক্ষমতায় রূপান্তরের বিষয়ে আলোকপাত করেন।

আইএমএফ উল্লেখ করে, বিশ্বজুড়ে জনসংখ্যার বয়স বাড়লেও দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকায় তরুণদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। তবে এই সুবিধা পেতে হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পেশাগত দক্ষতায় দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বিনিয়োগ দরকার। প্রযুক্তির কারণে শ্রমবাজার পাল্টাচ্ছে, ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডিজিটাল অর্থায়নের মতো সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে কর্মীদের পুনঃপ্রশিক্ষণের পাশাপাশি সমন্বিত নীতি গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

অন্য এক ব্রিফিংয়ে আইএমএফের ফিসক্যাল অ্যাফেয়ার্স বিভাগের পরিচালক রদ্রিগো ভালদেস, উপপরিচালক এরা দাবলা-নরিস ও ডিভিশন চিফ ডেভিডে ফুরচেরি জানান, ঢালাও ভর্তুকি সরকারের ওপর অনাকাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক চাপ বাড়ায়। ফলে ধনীদের বদলে আসল সুবিধাভোগী ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে সরাসরি সামাজিক সুরক্ষার আওতায় এনে নির্দিষ্ট খাতে সহায়তা দেওয়াই যুক্তিযুক্ত।

পড়ুন : ৪৫ বিসিএসের চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ, সুপারিশ পেলেন ১৭০২ জন

সা/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন