একটি বিদ্যালয়, অসংখ্য শিক্ষার্থী আর ৩৪ বছরের স্মৃতি। যে শ্রেণিকক্ষে কেটেছে জীবনের দীর্ঘ সময়, যে আঙিনায় গড়ে তুলেছেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম, সেই চেনা প্রাঙ্গণ ছেড়ে এবার বিদায় নিলেন শিক্ষক অলক কুমার চক্রবর্তী। তবে এ বিদায় আর দশটি বিদায়ের মতো নয়। ফুলেল শুভেচ্ছা আর ভালোবাসার আবহে তাঁকে তুলে দেওয়া হলো ঘোড়ার গাড়িতে। গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যবাহী এই বাহনে চড়ে তাঁর বিদায় যেন বলে দিল, কিছু মানুষের প্রস্থানও হয়ে উঠতে পারে স্মরণীয় এক অধ্যায়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ার দেবগ্রাম পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ে বৃহস্পতিবার দুপুরে ছিল এই আয়োজন। দীর্ঘ ৩৪ বছরের শিক্ষকতা শেষে অলক কুমার চক্রবর্তীর বিদায় উপলক্ষে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে জড়ো হন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অতিথিরা। তাঁদের চোখেমুখে ছিল শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর প্রিয় শিক্ষককে বিদায় জানানোর আবেগ। ঘোড়ার গাড়িতে তাঁর রাজকীয় বিদায় আয়োজনটি ছুঁয়ে যায় উপস্থিত সবার হৃদয়।
বিদায়ী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আখাউড়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাপসী রাবেয়া। প্রধান অতিথি ছিলেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের কুমিল্লা অঞ্চলের উপপরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম ও আখাউড়ার একাডেমিক সুপারভাইজার কফিল উদ্দিন মাহমুদ।
অলক কুমার চক্রবর্তীর বিদায়ের গল্পে জড়িয়ে আছে পারিবারিক ঐতিহ্যের একটি অধ্যায়ও। তাঁর বাবা অরুণ চক্রবর্তীও ছিলেন একই বিদ্যালয়ের শিক্ষক। বাবার পর ছেলের দীর্ঘ শিক্ষকতা—একই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একই পরিবারের দুই প্রজন্মের এমন সম্পর্ক নিছক চাকরির ইতিহাস নয়, বরং শিক্ষার প্রতি ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতার এক অনন্য স্মারক। বিদ্যালয়ের দেয়াল, শ্রেণিকক্ষ আর মাঠের সঙ্গে তাই তাঁদের পরিবারের স্মৃতিও মিশে আছে।
তিন দশকের বেশি সময় ধরে শিক্ষক অলক কুমার চক্রবর্তী এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাঠদান করেছেন। পাঠ্যবইয়ের অক্ষরের পাশাপাশি শৃঙ্খলা, মূল্যবোধ ও মানবিকতার শিক্ষা দেওয়ার মধ্য দিয়ে গড়ে তুলেছেন তাঁদের ভবিষ্যৎ। সময়ের সঙ্গে শিক্ষার্থীরা বড় হয়েছেন, অনেকে ছড়িয়ে পড়েছেন নানা পেশায়। কিন্তু প্রিয় শিক্ষকের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্কের সুতোটি রয়ে গেছে স্মৃতির গভীরে। অবসরের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেও শিক্ষক-শিক্ষার্থীর এই বন্ধন যে সহজে ফুরানোর নয়, বিদায়ের আয়োজন যেন তারই প্রকাশ।
একসময় গ্রামবাংলার বিয়ে, বরযাত্রা ও নানা আনন্দঘন আয়োজনে ঘোড়ার গাড়ি ছিল আভিজাত্য ও ঐতিহ্যের প্রতীক। সময়ের প্রবাহে আধুনিক যানবাহনের ভিড়ে সেই দৃশ্য আজ অনেকটাই বিরল। সেই পুরোনো দিনের বাহনকে ফিরিয়ে এনে একজন শিক্ষককে বিদায় জানানোর মধ্য দিয়ে আয়োজকেরা যেন ঐতিহ্যের সঙ্গে আবেগেরও মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। ঘোড়ার গাড়ির চাকায় শুধু একজন শিক্ষকের বিদায়ের মুহূর্তই গড়ায়নি, যেন ফিরে এসেছে গ্রামবাংলার হারানো দিনের এক টুকরো ছবিও।
তবে এ আয়োজনের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য ঘোড়ার গাড়িতে নয়, একজন শিক্ষকের প্রতি মানুষের ভালোবাসায়। কর্মজীবনের শেষ দিনে এমন সম্মান পাওয়া একজন শিক্ষকের দীর্ঘ সাধনার স্বীকৃতি। কারণ, একজন শিক্ষক শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন না; তিনি শিক্ষার্থীদের চিন্তা করতে শেখান, সঠিক পথ চিনিয়ে দেন, জীবনের কঠিন সময়ে মূল্যবোধের আলো জ্বালিয়ে রখেন। তাঁর অর্জন তাই কেবল কর্মজীবনের হিসাব-নিকাশে সীমাবদ্ধ থাকে না, ছড়িয়ে থাকে অসংখ্য মানুষের জীবনে।
এমন আবেগঘন বিদায়ে আপ্লুত অলক কুমার চক্রবর্তী। অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমি খুবই আনন্দিত। সকলের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা রইল।”
অনুষ্ঠানের সভাপতি ইউএনও তাপসী রাবেয়া বলেন, “চাকরিজীবীরা অবসরে গেলে সাবেক হয়ে যান। শিক্ষক কিন্তু শিক্ষকই থাকেন। বিদায়বেলায় শিক্ষকের এমন রাজকীয় বিদায় সত্যিই আনন্দের। একজন শিক্ষক পরিবারের সদস্য হিসেবে আমি গর্ববোধ করছি।”
৩৪ বছরের কর্মজীবন শেষে অলক কুমার চক্রবর্তী হয়তো ফিরেছেন তাঁর চেনা জীবনের নতুন অধ্যায়ে। কিন্তু দেবগ্রাম পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের আঙিনায় রেখে গেলেন অসংখ্য স্মৃতি, শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা আর শিক্ষকতার গৌরবময় এক উত্তরাধিকার। ঘোড়ার গাড়ির সেই বিদায় তাই কেবল একজন শিক্ষকের বিদায় নয়; এটি শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা আর ভালোবাসায় গাঁথা এক দীর্ঘ পথচলার সম্মানজনক সমাপ্তি।
পড়ুন:চার বছরেও শেষ হয়নি কুশুরা-ধানতারা সড়কের কাজ, দুর্ভোগে লক্ষাধিক মানুষ
ইমি/


