রাশিয়ার অর্থনীতির ওপর নতুন করে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরিকল্পনা আপাতত স্থগিত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুক্রবার জারি করা এক নির্বাহী আদেশে তিনি জানান, কংগ্রেসের পাস করা আইনের আওতায় রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রস্তাবিত নিষেধাজ্ঞা, বিধিনিষেধ ও শুল্ক কার্যকর করা থেকে আপাতত বিরত থাকছেন। জাতীয় স্বার্থের কথা বিবেচনা করেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্ত এমন সময়ে এল, যখন ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধ অব্যাহত রয়েছে এবং মস্কোর ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতাদের মধ্যে আলোচনা চলছে। একই সময়ে রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানি এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম কমানোর প্রচেষ্টা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাশিয়াবিষয়ক নীতিতে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
রাশিয়ার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের আইনটি গত মাসে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে দ্বিদলীয় সমর্থনে পাস হয়। ‘লিন্ডসে ও. গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অব ২০২৬’ নামের এ আইনের লক্ষ্য ছিল ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাতে রাশিয়ার অর্থায়নের সক্ষমতা কমিয়ে আনা।
প্রয়াত সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের উদ্যোগে আনা আইনটিতে গত মাসে স্বাক্ষর করেছিলেন ট্রাম্প। এর আওতায় রাশিয়ার কর্মকর্তা ও ব্যাংকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পাশাপাশি দেশটির জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখতে ব্যবহৃত ট্যাঙ্কারের গোপন বহরকে লক্ষ্যবস্তু করার পরিকল্পনা ছিল।
এ ছাড়া রাশিয়া থেকে তেল বা প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করা শীর্ষ পাঁচটি দেশের ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা মার্কিন প্রেসিডেন্টকে দেওয়ার বিধান রাখা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানি থেকে আয় কমানো এবং দেশটির ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানো।
তবে আইনে কিছু ব্যতিক্রমের সুযোগও রাখা হয়েছিল। যেসব দেশ তাদের মোট প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির ১৫ শতাংশের কম রাশিয়া থেকে নেয় এবং আমদানি কমাতে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে শুল্ক আরোপে ছাড় দেওয়ার সুযোগ ছিল।
নিষেধাজ্ঞাগুলো কার্যকর করার সময়সীমা ঘনিয়ে আসার ঠিক আগমুহূর্তে ট্রাম্প সেগুলো স্থগিত করেন। ফলে আইনটি পাস হলেও রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রস্তাবিত পদক্ষেপগুলো কখন এবং কীভাবে কার্যকর হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির পরিকল্পনাও আলোচনায় এসেছে। গত সপ্তাহে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, রাশিয়া অবিলম্বে তিন লাখ মেট্রিক টনের বেশি ডিজেল সরবরাহ করবে। এরপর নভেম্বরে আরও পাঁচ লাখ টন এবং তার পরপরই আরও ১০ লাখ টন ডিজেল আসবে। এ ছাড়া অল্প সময়ের মধ্যে আরও ৩০ লাখ টন ডিজেল সরবরাহের কথাও জানান তিনি।
বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম কমানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এ সরবরাহের কথা সামনে এসেছে। তবে রাশিয়া থেকে জ্বালানি কেনার মাধ্যমে মস্কোর রাজস্ব বাড়তে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মার্কিন আইনপ্রণেতাদের একটি অংশ।
ছয়জন রিপাবলিকানসহ যুক্তরাষ্ট্রের ১২ জন সিনেটর ট্রাম্পের কাছে চিঠি লিখে ডিজেল চুক্তি বাতিলের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁদের আশঙ্কা, এ চুক্তির মাধ্যমে রাশিয়া নতুন করে অর্থ পাবে, যা ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে দেশটিকে সহায়তা করতে পারে।
ব্রাসেলসে ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় শুক্রবার ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও রাশিয়া থেকে ডিজেল সরবরাহের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এ চুক্তির ফলে রাশিয়ায় আবারও অর্থপ্রবাহ শুরু হবে।
মঙ্গলবার উভয় দলের আইনপ্রণেতাদের একটি দল ট্রাম্পের কাছে চিঠি পাঠিয়ে গত মাসে পাস হওয়া আইন অনুযায়ী নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের আহ্বান জানায়। রাশিয়ার জ্বালানি খাতে নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক আরোপ করা হবে, নাকি অব্যাহতি দেওয়া হবে—সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানোর জন্য ট্রাম্পের হাতে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত সময় ছিল। তবে এ বিষয়ে প্রশাসন আইনপ্রণেতাদের কিছু জানায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার পক্ষে থাকা আইনপ্রণেতাদের যুক্তি, রাশিয়ার জ্বালানি খাত থেকে আয় কমাতে পারলে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হতে পারে। অন্যদিকে, জ্বালানির সরবরাহ ও দাম নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে জড়িত।
ট্রাম্প তাঁর নির্বাহী আদেশে জাতীয় স্বার্থের কথা উল্লেখ করলেও নিষেধাজ্ঞা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ফলে রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর বিষয়ে তাঁর পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্ত এমন সময়ে এসেছে, যখন তিনি প্রকাশ্যে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির সমালোচনা করছেন। একই সঙ্গে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধের বিষয়ে সমঝোতার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
গত সপ্তাহে ট্রাম্প বলেন, ইউক্রেন ও রাশিয়া একে অপরের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা না চালানোর বিষয়ে সম্মত হয়েছে। তবে এ সমঝোতার বাস্তবায়ন এবং এর প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
আগামী মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলার কারণে জ্বালানির দাম বেড়েছে। তাঁর আশঙ্কা, জ্বালানির উচ্চমূল্য নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বর্তমানে মার্কিন সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদে দলটির সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে।
জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণ, রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক চাপ এবং ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টা—এই তিনটি বিষয় এখন ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে এসব লক্ষ্য অর্জনে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা, কঠোর করা কিংবা জ্বালানি আমদানির পথ বেছে নেওয়ার মধ্যে কোনটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, তা স্পষ্ট নয়।
এদিকে, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগাম গোয়েন্দা তথ্য কিয়েভের কাছ থেকে গোপন করেছে ট্রাম্প প্রশাসন—এমন অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের সামরিক সংস্করণ ‘স্টারশিল্ড’-এর কার্যকারিতা সীমিত করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে ঘণ্টায় ১০০ মাইলের বেশি গতিতে চলা ড্রোনে ওই প্রযুক্তি ব্যবহার করা কঠিন হতে পারে বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের কোনোটিই আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে ইউক্রেনকে সামরিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে কী পরিবর্তন এসেছে, তা নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আইনটি প্রয়াত সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের বোন ডারলাইন গ্রাহামের নির্বাচনী প্রচারণারও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। লিন্ডসে গ্রাহামের মৃত্যুর পর তাঁর অবশিষ্ট মেয়াদের জন্য ডারলাইনকে সিনেটে নিয়োগ দেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি ভাইয়ের স্থলাভিষিক্ত হতে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
এ সপ্তাহের শুরুতে সাউথ ক্যারোলিনার ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী অ্যানি অ্যান্ড্রুসের সঙ্গে এক বিতর্কে ডারলাইন গ্রাহাম বলেন, আইনটি পাসে সহায়তা করতে পেরে তিনি ‘খুবই গর্বিত’। ট্রাম্পের সমর্থন পাওয়া ডারলাইন আগামী সপ্তাহে সাউথ ক্যারোলিনায় তাঁর সঙ্গে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
তবে আইনটি কীভাবে কার্যকর করা হবে, তা সম্পূর্ণ ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে বলে স্বীকার করেন ডারলাইন। কলম্বিয়ায় আয়োজিত বিতর্কে তিনি বলেন, আইনটি প্রেসিডেন্টকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ করার জন্য কিছু হাতিয়ার দিয়েছে। সেগুলো ব্যবহার করা হবে কি না, কিংবা অন্য কোনো উপায় নেওয়া হবে কি না, তা প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তের বিষয়।
ডারলাইনের মতে, আইনটির মূল উদ্দেশ্য জ্বালানির দাম কমিয়ে আনা এবং শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ বন্ধ করা। তাঁর বক্তব্য, যুদ্ধ শেষ হলে জ্বালানির দামও কমে আসবে।
সব মিলিয়ে রাশিয়ার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি, জ্বালানি বাজার এবং ইউক্রেন যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। আইনটি পাস হওয়ার পরও নিষেধাজ্ঞা কার্যকর না হওয়ায় এখন নজর ট্রাম্প প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।
পড়ুন:হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি কেটি জাকারিয়াকে ট্রাম্পের বরখাস্ত
ইমি/


