নেত্রকোনায় সাংবাদিক আলিফ হত্যা: সুষ্ঠু তদন্তের দাবিতে কিউআরএস

সমাজের আনাচে-কানাচে লুকিয়ে থাকা অপরাধ, দুর্নীতি আর অনিয়মের খবর যিনি সাহসের সঙ্গে জনসমক্ষে তুলে ধরতেন, সেই সংবাদকর্মীর কণ্ঠই চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া হলো বুলেটের আঘাতে। বেসরকারি আইপিটিভি ‘রূপসী বাংলা’র নেত্রকোনা প্রতিনিধি লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরের নির্মম হত্যাকাণ্ড শুধু একটি প্রাণের অবসান নয়, বরং এটি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও জনগণের তথ্য জানার অধিকারের ওপর এক ভয়ংকর আঘাত।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) বিকেলে বর্বরোচিত এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের সমন্বয়ে গঠিত কুইক রেসপন্স সাপোর্ট টিম (কিউআরএস)।

গত ১৫ অক্টোবর রাতের অন্ধকারে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার তেলনজিয়া এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয় সাংবাদিক আলিফ ফকিরকে। গণমাধ্যমের পাশাপাশি তিনি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামের ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন। সেখানে তিনি নিয়মিতভাবে স্থানীয় অপরাধ ও দুর্নীতির শেকড় সন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করতেন। সত্য প্রকাশের অবিচল সাহসিকতাই যে তার জীবনের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে, তা হয়তো তিনি নিজেও জানতেন। কারণ, এই হত্যার ঘটনা কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা ছিল না।

কিউআরএস-এর তথ্যমতে, গত ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসেও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কারণে আলিফ ফকির হামলার শিকার হয়েছিলেন। তার জীবনের ওপর যে চরম ঝুঁকি রয়েছে, তা স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনেরও অজানা ছিল না। তবুও কেন তাকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব হলো না, কিংবা পূর্ববর্তী হামলার কোনো যথাযথ তদন্ত ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না- তা নিয়ে এখন বড়সড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

এই হত্যাকাণ্ড কেবল সাংবাদিক সমাজকে নয়, বরং দেশের আপামর জনসাধারণকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। কিউআরএস মনে করে, আলিফ ফকিরের মতো একজন নিবেদিতপ্রাণ সাংবাদিকের এমন করুণ পরিণতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। যখন পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একজন সাংবাদিককে এভাবে প্রাণ দিতে হয়, তখন তার প্রভাব শুধু নিউজরুমেই আটকে থাকে না; এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে পুরো সমাজের ওপর। ভয়ে সাধারণ মানুষ তথ্য দিতে অনীহা প্রকাশ করেন, সংবাদকর্মীরা অনুসন্ধানী কাজে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন এবং দিন শেষে সমাজ অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়।

এমন পরিস্থিতিতে আলিফ ফকিরের পরিবার, স্বজন ও সহকর্মীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছে কিউআরএস। একইসঙ্গে নেত্রকোনাসহ সারা দেশের সাংবাদিকদের প্রতি সংহতি জানিয়ে এই হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার নিশ্চিতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট মহলের কাছে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট ও জরুরি দাবি তুলে ধরেছে সংগঠনটি।

প্রথমত, আলিফ ফকির হত্যার দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী, সহযোগী এবং প্রত্যক্ষ ঘাতকদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

দ্বিতীয়ত, এর আগে তার ওপর হওয়া হামলার অভিযোগগুলো পুনরায় খতিয়ে দেখতে হবে। পুলিশ তার নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা জেনেও কেন কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হলো, তার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।

তৃতীয়ত, স্পর্শকাতর এই মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাক্ষী, নিহতের পরিবারের সদস্য ও সহকর্মীদের পূর্ণ নিরাপত্তা দিতে হবে, যাতে তারা কোনো ভয়ভীতি ছাড়াই ন্যায়বিচারের পথে লড়তে পারেন।

সর্বোপরি, সারা দেশে যেসব সাংবাদিক অপরাধ ও দুর্নীতি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে হুমকির সম্মুখীন হচ্ছেন, তাদের সুরক্ষায় দ্রুত একটি সমন্বিত ও কার্যকর আইনি কাঠামো তৈরি করতে হবে।

সংগঠনটি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, আলিফ ফকির হত্যার বিচারহীনতা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। ঘাতকদের চিহ্নিত করার পাশাপাশি বিচারহীনতার সংস্কৃতির চিরতরে অবসান ঘটাতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো সাংবাদিককে সত্য লেখার অপরাধে প্রাণনাশের হুমকিতে পড়তে না হয়।

উল্লেখ্য, সাংবাদিকদের সুরক্ষা ও অধিকার রক্ষায় ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ‘কুইক রেসপন্স সাপোর্ট টিম’ (কিউআরএস)। সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও আদিবাসী অধিকারকর্মীদের নিয়ে গঠিত প্ল্যাটফর্মটি সাংবাদিকদের ওপর হওয়া যেকোনো নির্যাতন পর্যবেক্ষণ ও প্রতিরোধে কাজ করে যাচ্ছে।

এই প্ল্যাটফর্মের সক্রিয় সদস্য হিসেবে রয়েছেন দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। তাদের মধ্যে আছেন সিনিয়র সাংবাদিক সোহরাব হাসান, সাংবাদিক আজিজুল পারভেজ, ইসমাইল হোসেন ও মায়নুল হাসান সোহেল। আরও রয়েছেন মিডিয়া ও জেন্ডার গবেষক আফরোজা সোমা, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব দীপ্তি চৌধুরী, আদিবাসী অধিকারকর্মী ডালিয়া চাকমা এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি মনজুর রশীদ ও শারাবান তহুরা।

স্বাধীন, গণতান্ত্রিক ও মানবিক সমাজ বিনির্মাণে নির্ভীক সাংবাদিকতার কোনো বিকল্প নেই। আলিফ ফকিরের রক্ত যেন বৃথা না যায়, সেলক্ষ্যে সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নাগরিক সমাজকে একযোগে কাজ করার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছে কিউআরএস।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : সিরাজগঞ্জে যমুনায় কোটি টাকার জাল জব্দ

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন