তরুণ সমাজ যেকোনো জাতির প্রাণশক্তি, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক অদম্য প্রতিরোধ। এই তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং সামাজিক অবদানকে সম্মান জানাতে এবং বিশ্বব্যাপী যুব সমাজকে ইতিবাচক পরিবর্তন আনয়নে উদ্বুদ্ধ করতে প্রতি বছর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদযাপন করা হয় বিশ্ব যুব দিবস। তরুণদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে একটি বৈষম্যহীন, টেকসই ও শান্তিপূর্ণ পৃথিবীর পথ তৈরি করাই এই দিবসের মূল অঙ্গীকার।
১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে আন্তর্জাতিক যুব দিবস (International Youth Day) পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এর পর থেকে প্রতি বছর ১২ আগস্ট বিশ্বজুড়ে দিবসটি উদযাপিত হয়ে আসছে। বিশ্বজুড়ে যুব সমাজের নানা সমস্যা, যেমন—শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগের অভাব, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের সাথে মানিয়ে নেওয়ার চ্যালেঞ্জ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তরুণদের অংশগ্রহণের গুরুত্ব তুলে ধরাই এই দিবসের মূল লক্ষ্য।
একই সাথে ক্যাথলিক খ্রিষ্টীয় সম্প্রদায়ের উদ্যোগে প্রতি দুই বা তিন বছর পর পর আন্তর্জাতিক যুব দিবস উদযাপন করা হয়, যা তরুণদের মধ্যে ভাতৃত্ববোধ ও বিশ্বশান্তির বাণী ছড়িয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সংক্ষেপে, এটি শুধু উদযাপনের দিন নয়; বরং তরুণদের দাবি আদায়, নতুন সম্ভাবনা উন্মোচন এবং বিশ্ব গঠনে তাদের দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেওয়ার একটি অনন্য প্ল্যাটফর্ম।
সমাজ পরিবর্তন ও অগ্রযাত্রায় তারুণ্যের ভূমিকা
ইতিহাস সাক্ষী, প্রতিটি যুগান্তকারী পরিবর্তন ও গণজাগরণে তরুণরাই অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কার: বাংলাদেশের ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন কিংবা ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান—প্রতিটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে তরুণ সমাজ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের পতাকা সমুন্নত রেখেছে।
প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন: একবিংশ শতাব্দীর চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে তরুণরা বিশ্বকে নতুন রূপ দিচ্ছে। স্টার্টআপ সংস্কৃতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি এবং ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনীতিতে বিরাট বিপ্লব আনছে আজকের তরুণ সমাজ।
জলবায়ু ও পরিবেশ আন্দোলন: জলবায়ু সংকটের বিরুদ্ধে গ্রেটা থুনবার্গের মতো তরুণদের বিশ্বব্যাপী সচেতনতামূলক আন্দোলন প্রমাণ করে যে, ভবিষ্যৎ পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখতে তরুণদের বলিষ্ঠ পদক্ষেপ কতটা জরুরি।
বর্তমান যুগে তরুণদের চ্যালেঞ্জসমূহ
বিশাল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বিশ্বব্যাপী যুবসমাজ বেশ কিছু কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে:
১. বেকারত্ব ও দক্ষ মানবসম্পদের অভাব: প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থা ও আধুনিক কর্মসংস্থানের চাহিদার মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্যের কারণে তরুণদের এক বিশাল অংশ উপযুক্ত কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
২. মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা: প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগের অতিরিক্ত ব্যবহার, ক্যারিয়ার কেন্দ্রিক তীব্র প্রতিযোগিতা এবং সামাজিক অনিশ্চয়তার কারণে তরুণদের মধ্যে বিষণ্নতা ও দুশ্চিন্তা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
৩. প্রযুক্তির বৈষম্য: উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে ডিজিটাল সুবিধা ও গুণগত শিক্ষায় বিরাট ব্যবধান রয়ে গেছে, যা পিছিয়ে পড়া দেশের তরুণদের স্বপ্ন পূরণে বাধা সৃষ্টি করছে।
ভবিষ্যতের পথরেখা: সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত
তরুণদের সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে রাষ্ট্র, সমাজ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একযোগে কাজ করতে হবে। কেবল আবেগ বা স্লোগানে সীমাবদ্ধ না রেখে তরুণদের জন্য নীতিগত ও কাঠামোগত সুবিধা তৈরি করা সময়ের দাবি।
প্রথমত, শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগের উপযোগী করে তৈরি করতে হবে। প্রযুক্তিগত দক্ষতা, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা এবং সৃজনশীলতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, কর্মসংস্থান ও উদ্যোগ তৈরির পথ সহজ করা প্রয়োজন। তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও বিনিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। তৃতীয়ত, সামাজিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্তরে তরুণদের কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব প্রদান করতে হবে, যাতে তরুণরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরা গড়ে তোলার সুযোগ পায়।
তারুণ্য কোনো একটি নির্দিষ্ট বয়সের সীমাবদ্ধতা নয়; এটি মানসিকতা, তেজ এবং নতুন কিছু করার অদম্য সাহসের নাম। বিশ্ব যুব দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, একটি বাসযোগ্য, সুন্দর ও নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তোলার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হলো তরুণ সমাজ। তরুণদের হাতে সঠিক শিক্ষা, সুযোগ এবং দিকনির্দেশনা তুলে দিতে পারলে তারা শুধু নিজেদের ভবিষ্যৎ নয়, বরং সমগ্র বিশ্বকেই এক নতুন আলোর পথে নিয়ে যাবে। বিশ্ব যুব দিবসে এই হোক আমাদের অঙ্গীকার—তারুণ্যের হাত ধরেই গড়ে উঠুক আগামীর বৈষম্যহীন বিশ্ব।
পড়ুন : তরুণদের হাত ধরেই গড়ে উঠবে সবার জন্য বাংলাদেশ: প্রধানমন্ত্রী
সা/


