দুর্গাপুরে সাংবাদিক আলিফ হত্যা: পুলিশের জালে শুটারের ‘অস্ত্ররক্ষক’ অপূর্ব

নেত্রকোনার দুর্গাপুরে দুর্নীতি ও মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠস্বর, সাহসী সাংবাদিক আলিফ ফকির (৪০) হত্যাকাণ্ডে অবশেষে বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে। শনিবার (১৭ অক্টোবর) দিবাগত মধ্যরাতে দুর্গাপুর পৌরশহরের পুরাতন সিনেমা হল এলাকা থেকে এ হত্যাকাণ্ডের অন্যতম সন্দেহভাজন ‘অপূর্ব’কে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

বিজ্ঞাপন

দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডের মূল রূপকারদের বিষয়ে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে।

পুলিশের দেওয়া তথ্যমতে, গ্রেফতারকৃত অপূর্বর জীবনযাপন ছিল বেশ সন্দেহজনক। সারাদিন সে লোকচক্ষুর আড়ালে আত্মগোপনে থাকত। আর রাত ১২টা বাজলেই নিজের কাজ সারতে বের হতো সে। শনিবার (১৭ অক্টোবর) দিবাগত রাতেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তবে আগে থেকেই ওঁত পেতে থাকা পুলিশ পুরাতন সিনেমা হল এলাকা থেকে তাকে অত্যন্ত সন্তর্পণে গ্রেফতার করে।

ওসি খন্দকার শাকের আহমেদ জানান, অপূর্ব এই চক্রের বড় মোহরা। হত্যাকাণ্ডের মূল সন্দেহভাজন শুটার ‘তাজুল’-এর সমস্ত অস্ত্রের ভাণ্ডার থাকত অপূর্বর কাছেই। শুধু তাই নয়, এর আগে সাংবাদিক আলিফকে হত্যার যে প্রথম চেষ্টা করা হয়েছিল- যেখানে ভুলবশত একজন পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হন, সেই ঘটনারও অন্যতম আসামি অপূর্ব।

ঘটনার সূত্রপাত গত বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর)। রাত তখন সোয়া ৮টা। দুর্গাপুর পৌরসভার তেলুঞ্জিয়া এলাকার দোকানে নিজের ফেলে যাওয়া মোবাইল ফোনটি আনতে গিয়েছিলেন আলিফ। তিনি জানতেন না, অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে ঘাতকরা সেখানেই তার জন্য অপেক্ষা করছে। তাকে লক্ষ্য করে একে একে ছয়টি গুলি ছোড়ে সন্ত্রাসীরা।

রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন আলিফ। স্থানীয়রা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার চেষ্টা করলেও পথিমধ্যেই তার মৃত্যু হয়। স্তব্ধ হয়ে যায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার একটি কণ্ঠ।

পেশায় সাংবাদিক হলেও আলিফ ফকির ছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন সাবেক সদস্য। সামরিক জীবনের শৃঙ্খলা আর সাহসিকতা তিনি ধারণ করেছিলেন তার সাংবাদিকতাতেও। তিনি বেসরকারি আইপি টিভি ‘রূপসী বাংলার’ নেত্রকোনা জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন। এই পেজটির মাধ্যমেই তিনি এলাকার মাদক কারবার, চোরাচালান এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে নিয়মিত লেখালেখি ও ভিডিও প্রকাশ করতেন। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে থাকা অপরাধীদের চক্ষুশূল হয়ে উঠেছিলেন তিনি।

পারিবারিক জীবনে আলিফের পৈতৃক নিবাস কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের শুনুই গ্রামে। তবে তিনি দুর্গাপুরের বিরিশিরি এলাকায় শ্বশুরবাড়িতে বসবাস করতেন।

স্বামীর এমন নির্মম হত্যাকাণ্ডে শোকস্তব্ধ আলিফের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাতে তিনি বাদী হয়ে অজ্ঞাত আটজনকে আসামি করে দুর্গাপুর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।

মামলার তদন্তভার নিয়ে পুলিশ বেশ তৎপর। ওসি শাকের আহমেদ জানিয়েছেন, গ্রেফতারকৃত অপূর্বকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। সে মূল শুটার তাজুল এবং ঘটনার সাথে জড়িত অন্যান্যদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। তদন্তের স্বার্থে পুলিশ এখন তাকে আদালতে হাজির করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায়ের চেষ্টা করা হবে। সে রাজি না হলে রিমান্ডের আবেদন করা হবে, যাতে এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের মূল গডফাদারদের আইনের আওতায় আনা যায়।

সাংবাদিক আলিফ ফকিরের নির্মম হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারকে পথে বসায়নি, বরং সত্য প্রকাশের স্বাধীনতায় বড় আঘাত হেনেছে। এখন দুর্গাপুরের আপামর জনসাধারণের দাবি- আলিফ হত্যার প্রকৃত রহস্য উন্মোচিত হোক এবং দোষীরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পাক।

পড়ুন : সাভারে ইয়ামিন হত্যা মামলা: সাবেক এমপি সাইফুলসহ ১৯ জনের অভিযোগ গঠনের শুনানি আজ

সা/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন