নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন আবাসন কোম্পানির লোক পরিচয়ে দুটি ভূমি অফিস ও দুটি সাবরেজিস্ট্রি অফিসে গত দেড় যুগ ধরে চলছে জাল জালিয়াতি কারবার। এতে বহু কৃষক ও জমি মালিকরা হয়েছেন নিঃস্ব ও সহায় সম্বলহীন। শুধুমাত্র কায়েতপাড়া ইউনিয়নে জাল-জালিয়াতি ও ভূয়া দলিলের মাধ্যমে অবিক্রীত পৈতৃক জমি দখল করে নিয়েছে জলসিড়ি নামীয় কোম্পানির নামে একটি জালিয়াত চক্র। পাশাপাশি উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌর সভায় রয়েছে এ জালিয়াত চক্রের সক্রিয় অবস্থান। এসবের প্রতিবাদে এতোদিন শুধুমাত্র ভুক্তভোগীরা একক উদ্যোগে আইনি সহায়তা চাইতে গিয়ে হয়রানীর শিকার হতেন। হামলা, মামলায় উল্টো ফাঁসিয়ে দিতো জালিয়াত পক্ষ। কিন্তু কায়েতপাড়ার পৈত্রিক ভিটা মাটি সংরক্ষণ পরিষদের নামে একদল প্রতিবাদি জমি মালিক তাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ে মাঠে নেমেছেন। ইতিমধ্যে জালিয়াতি রোধে নানাভাবে আন্দোলন সংগ্রামের অংশ হিসেবে মানববন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশ, ১৪ গ্রামবাসী নিয়ে বৈঠক, সংশ্লিষ্ট দফতরে স্মারক লিপি প্রদানসহ নানা কর্মসূচি পালন করে আসছেন।
‘পৈতৃক ভিটা-মাটি সংরক্ষণ পরিষদ’-এর উদ্যোগে গত সোমবার (১৯অক্টোবর) কায়েতপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ ও ভূমি অফিসের সামনে মানববন্ধন করেন। এ সময় ভুক্তভোগী ও স্থানীয় ভূমি মালিকদের পক্ষে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও), সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং উপজেলা প্রকৌশলী বরাবরও প্রতিবাদলিপি প্রদান করা হয়।
প্রতিবাদ লিপি ও স্থানীয় সূত্র জানায়, কায়েতপাড়া ইউনিয়নের বিভিন্ন মৌজায় অসাধু জালিয়াতি চক্র ভুয়া ও খাড়া দলিল এবং কাল্পনিক ওয়ারিশ প্রস্তুত করে অবৈধভাবে নামজারি (মিউটেশন) সম্পাদন ও জমি দখলের অপচেষ্টা চালিয়ে আসছে। এর ফলে সাধারণ ভূমি মালিকরা চরম নিরাপত্তাহীনতা ও অস্তিত্ব সংকটে ভুগছেন। একটি জালিয়াত পক্ষ জাল দলিল তৈরির মাধ্যমে অবৈধ নামজারি সম্পন্ন করে আবাসন প্রকল্প যেমন—জলসিঁড়ি আবাসন ও বসুন্ধরা গ্রুপের কাছে জমি বিক্রি করে প্রকৃত জমি মালিকদের হয়রানী করে চলছে।
কর্মসূচিতে ভুক্তভোগীরা জানান, জাল দলিল ও জালিয়াতির মাধ্যমে খারিজ প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত কয়েকজনের নাম ও জমি সংক্রান্ত বিবরণ তুলে ধরেন। এসব জালিয়াতি কাজে অভিযুক্তরা হলেন, নাওড়া এলাকার রাম মোহন সরকারের ছেলে প্রবীর সরকার। যাদের আরএস খতিয়ান/দাগ নং- ৬২ (৬৬), ৬১ (৬) ও ২৪ (৭৮); জালিয়াতির মাধ্যমে প্রস্তুতকৃত জমি জলসিঁড়ির কাছে বিক্রি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।
একইভাবে মাঝিনা মৌজায় নছর উদ্দিনের ছেলে আয়নাল হকের আরএস খতিয়ান/দাগ নং- ৯৫৮; বসুন্ধরা প্রকল্পের কাছে বিক্রির অভিযোগ তুলেন। এছাড়াও চান মিয়ার ছেলে হাজী সিরাজ ব্যাপারী আরএস খতিয়ান/দাগ নং- ২২ (৪১) ১০; বসুন্ধরা প্রকল্পের কাছে বিক্রির করেন। এভাবে কেউঢালার হাবিবুর রহমানের মেয়ে
হাসনা বেগম আরএস খতিয়ান/দাগ নং- ২১৩ (৪.৫০) শতক জালিয়াতির মাধ্যমে বিক্রি হয়।
এসব প্রতিরোধে ‘পৈতৃক ভিটা-মাটি সংরক্ষণ পরিষদ’-এর পক্ষ থেকে উপজেলা প্রশাসন ও ভূমি অফিস ও সাবরেজিস্ট্রি অফিসকে দায়ী করে তা সমাধানের দাবী করেন আন্দোলনকারীরা। তারা দাবী করেন, জালিয়াতি চক্র রোধে ভূমি প্রশাসন নামজারি আবেদনে কঠোর যাচাইয়ান্তে যেকোনো নামজারি বা জমাভাগ আবেদনের ক্ষেত্রে মূল পৈতৃক ওয়ারিশ ও প্রকৃত মালিকের উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ এবং মাঠপর্যায়ে নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে মিউটেশন সম্পন্ন করতে উভয় পক্ষকে নোটিশ জারিকরন চালু করা জরুরি। কিন্তু অবৈধ টাকার কাছে নতি স্বীকার করে তার তা করেন না।
তাদের উচিত অবৈধ নামজারি বাতিল করে জালিয়াতি ও ভূয়া দলিলের জড়িতদের শাস্তি দেয়া। রেকর্ডীয় মালিকের ভুয়া ওয়ারিশ বানিয়ে আবাসন কোম্পানির কাছে বিক্রি বন্ধ করা আবশ্যিক।
যে সকল প্রকল্পের অনুমোদন আছে তাদের ঘনবসতিপূর্ণ গ্রাম, বসতবাড়ি ও সরকারি রাস্তা থেকে অন্তত ৩০০ মিটার দূরত্ব বজায় রেখে ‘জলসিঁড়ি’ প্রকল্পের সীমানা পুনর্নির্ধারণ ও ডিমারকেশন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যদি বিক্রি করতেই হয় তবে যেন উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ বা বিকল্প প্লট জমি প্রদানসহ উপযুক্ত মূল্য দেয়া হয়।
ভুক্তভোগীদের দাবী, ‘আমাদের মাটি, আমাদের অধিকার; ভিটা-মাটি রক্ষায় গড়ব প্রতিরোধ’ স্লোগানে কায়েতপাড়া ইউনিয়নের সর্বস্তরের জনগণ ও ভুক্তভোগী ভূমি মালিকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনে রয়েছেন। অনতিবিলম্বে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ এবং স্থানীয়দের পৈতৃক সম্পত্তি সুরক্ষায় কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানান তারা।
সূত্র জানায়, রূপগঞ্জ উপজেলা ভূমি অফিসে ওমেদার নামে শতাধিক দালাল সরকারী গুরুত্বপূর্ণ কাগজ পত্র নিজেদের মনগড়াভাবে পরিবর্তন করছেন। শুধু তাই নয়, টাকার বিনিময়ে নামজারী করে কখনো প্রভাব খাটাতে কতিপয় সাংবাদিক ব্যবহার করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক রূপগঞ্জ উপজেলার ভূমি অফিসে পরিদর্শনে এলে স্থানীয় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, রূপগঞ্জের কোন ভূমি অফিসেই ওমেদার নামে দালাল থাকতে পারবেনা। কারন জালিয়াতি ও দূর্ণীতিতে তারাই সহায়ক।
পড়ুন : আজ দুপুরে প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেবেন ইশরাক হোসেন
সা/


