ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস ‘খুব শিগগিরই একটি মুসলিম শহরে পরিণত হবে’ বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফ্রান্সে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ ও সহিংসতার জন্য অভিবাসনকে দায়ী করে ইউরোপের দেশগুলোকে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ কঠোর করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে অপরাধীদের দেশ থেকে বের করে দেওয়া এবং অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
সোমবার ওয়াশিংটনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ফ্রান্সে বর্তমানে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে অভিবাসনের সম্পর্ক রয়েছে। তার ভাষায়, এটি অভিবাসনসংক্রান্ত সমস্যা। এ সময় ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গে নিজের কথোপকথনের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
ট্রাম্প বলেন, তিনি আগেই ম্যাক্রোঁকে ফ্রান্সের সীমান্ত বন্ধ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মানুষকে অবাধে প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার কারণে ফ্রান্স বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে পারে বলেও সতর্ক করেছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আপনারা বিশ্বের সবাইকে ভেতরে আসতে দিচ্ছেন। পুরো পৃথিবীই যেন ভেতরে চলে আসছে।’ ইউরোপের দেশগুলো অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়তে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ দীর্ঘদিন ধরেই ট্রাম্পের রাজনৈতিক বক্তব্যের অন্যতম প্রধান বিষয়। তার মতে, সীমান্তে কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য জরুরি।
সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ইউরোপ যদি সীমান্ত বন্ধ না করে এবং অপরাধীদের দেশ থেকে বের করে না দেয়, তাহলে মহাদেশটির ভবিষ্যৎ বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে। তার বক্তব্যে ইউরোপের অভিবাসননীতি নিয়ে অসন্তোষ এবং সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারের আহ্বান স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
তবে প্যারিসের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার ‘মুসলিম শহর’ মন্তব্যটি অভিবাসন ও ধর্মীয় পরিচয়কে ঘিরে নতুন বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। কোনো শহরের জনসংখ্যার ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে এমন মন্তব্যের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য জনমিতিক তথ্য ও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করা জরুরি।
সপ্তাহান্তে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে প্যারিসসহ ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। পরে কয়েকটি স্থানে বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নেয়। এসব ঘটনায় জনজীবন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ট্রাম্প এসব ঘটনার সঙ্গে অভিবাসনের সম্পর্ক রয়েছে বলে মন্তব্য করলেও বিক্ষোভের তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বিষয়টি সামনে এসেছে। ফলে অর্থনৈতিক অসন্তোষ, জননিরাপত্তা এবং অভিবাসননীতি—এই বিষয়গুলোকে আলাদাভাবে বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।
ফ্রান্সে অভিবাসন নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। দেশটিতে অভিবাসীদের একীভূতকরণ, জাতীয় পরিচয়, নিরাপত্তা এবং সামাজিক বৈষম্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক আলোচনা চলছে। তবে বিক্ষোভ বা সহিংসতার জন্য কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় বা জাতিগত গোষ্ঠীকে দায়ী করতে হলে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন।
২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ ছিল ট্রাম্পের অন্যতম প্রধান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। নির্বাচনী প্রচারে তিনি অবৈধ অভিবাসন বন্ধ করা, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার এবং অপরাধে জড়িত অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
তবে অভিবাসন নিয়ে তার বিভিন্ন বক্তব্যের কিছুতে জাতিগত ভীতি উসকে দেওয়া এবং বিভ্রান্তিকর বা মিথ্যা দাবি করার অভিযোগ উঠেছে। সমালোচকদের মতে, অভিবাসন ও অপরাধকে এক করে দেখানো সামাজিক বিভাজন বাড়াতে পারে। অন্যদিকে, ট্রাম্পের সমর্থকেরা সীমান্ত নিরাপত্তা ও অভিবাসন নিয়ন্ত্রণকে জাতীয় স্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখেন।
সব মিলিয়ে ফ্রান্সের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্য ইউরোপের অভিবাসননীতি ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের বিতর্ককে আবারও সামনে এনেছে। তবে বিক্ষোভের প্রকৃত কারণ নির্ধারণে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, স্থানীয় বাস্তবতা এবং যাচাই করা তথ্যের ভিত্তিতে মূল্যায়ন প্রয়োজন।
পড়ুন:ফ্রান্সে তীব্র বিক্ষোভের পর সহিংসতা ও লুটপাট, প্রায় ২৪০০ জন গ্রেপ্তার
ইমি/


