রাজধানী ঢাকার সড়কে অনিয়ম, অনিয়ন্ত্রিত বাস প্রতিযোগিতা, যেখানে-সেখানে যাত্রী ওঠানো-নামানো এবং নির্ধারিত স্টপেজ না মানার দীর্ঘদিনের অনিয়ম বন্ধে ‘এক রুট, এক কোম্পানি’ নীতি গ্রহণ করেছে সরকার। আগামী ১ নভেম্বর থেকে ঢাকার ছয়টি সাধারণ রুটে এই ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক বাস পরিষেবা পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হচ্ছে। নতুন এ ব্যবস্থায় একাধিক কোম্পানির বাসের বদলে কেবল একটি কোম্পানির অধীনে সমন্বিতভাবে বাস পরিচালিত হবে। মূলত বাসের অসুস্থ প্রতিযোগিতা ও সড়কের বিশৃঙ্খলা কমিয়ে আনাই এর মূল লক্ষ্য।
ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) গত ১৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত বৈঠক এবং পরবর্তীতে ১৮ অক্টোবর ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এ পদক্ষেপে চূড়ান্ত সিলমোহর পড়ে। ডিটিসিএর ডেপুটি ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানার ধ্রুব আলম জানান, আগামী ১ নভেম্বর থেকে ছয়টি সাধারণ রুটে ‘এক রুট, এক কোম্পানি’ ভিত্তিতে বাস চলাচল শুরু করা হবে। এছাড়া সার্কুলার রুট তিনটি নির্ধারণ করা হয়েছে এবং সেখানে নতুন বাস দিয়ে সেবা চালুর পরিকল্পনা থাকায় তা শুরু হতে আরও দুই মাস সময় লাগবে।
১. গাজীপুর চৌরাস্তা-ঢাকেশ্বরী মন্দির: শিববাড়ী থেকে টঙ্গী, বিমানবন্দর, মহাখালী, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ও নিউমার্কেট হয়ে ২৫৩টি বাস চলবে। ভিআইপি ও বিকাশ পরিবহনের বাসগুলো ‘ভি.আই.পি পরিবহন’ কোম্পানির আওতায় পরিচালিত হবে।
২. মিরপুর-কেরানীগঞ্জ: চিড়িয়াখানা, মিরপুর-১, কল্যাণপুর, কলাবাগান, শাহবাগ, জিরো পয়েন্ট ও বাবুবাজার হয়ে ১৩৩টি বাস চলবে। দিশারী, তানজিল ও মেট্রো লিংক পরিবহন চলবে ‘চিড়িয়াখানা সিটি বাস’ কোম্পানির আওতায়।
৩. ঘাটারচর-ডেমরা: মোহাম্মদপুর, জিগাতলা, মৎস্য ভবন, রাজমনি, মৌচাক, রামপুরা ও বনশ্রী হয়ে ৭০টি বাস পরিচালিত হবে ‘রমজান আলী এন্টারপ্রাইজ’ কোম্পানির অধীনে।
৪. ঘাটারচর-কাঁচপুর: মোহাম্মদপুর, জিগাতলা, শাহবাগ, পল্টন, যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভার, মাতুয়াইল ও সাইনবোর্ড হয়ে ১৫০টি বাস চলবে। রজনীগন্ধ্যা, মালঞ্চ, সময় ও মিডলাইন পরিবহন মিলিয়ে এটি পরিচালিত হবে ‘ফোর স্টার বাস লাইন’ কোম্পানির আওতায়।
৫. ঘাটারচর-ধউর: মোহাম্মদপুর, আসাদগেট, টেকনিক্যাল, মিরপুর-১, মিরপুর-১০, কালশী, বিমানবন্দর ও আব্দুল্লাহপুর হয়ে ১৯০টি বাস চলবে। পরিস্থান ও প্রজাপতি পরিবহন পরিচালিত হবে ‘পিএনপি সিটি সার্ভিস’ কোম্পানির অধীনে।
৬. টঙ্গী-ঢাকেশ্বরী: কলেজগেট, আব্দুল্লাহপুর, বিমানবন্দর, এক্সপ্রেসওয়ে, ফার্মগেট, আসাদগেট, সায়েন্স ল্যাব ও আজিমপুর হয়ে ‘ঢাকা চাকা’ কোম্পানির অধীনে ২০টি বাস চলবে।
প্রস্তাবিত তিনটি সার্কুলার রুট:
ফার্মগেট-পলাশী: পান্থপথ সিগন্যাল, সেন্ট্রাল রোড, সায়েন্স ল্যাব, নিউমার্কেট ও আজিমপুর হয়ে চলবে ‘ঢাকা চাকা’ কোম্পানির ২০টি বাস।
মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড-পলাশী: আসাদগেট, ধানমন্ডি-২৭, কলাবাগান, সায়েন্স ল্যাব, নিউমার্কেট, পলাশী, নিউমার্কেট, জিগাতলা ও শংকর হয়ে পুনরায় মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছাবে ‘ঢাকা চাকা’ কোম্পানির ২০টি বাস।
কদম চত্বর-পঞ্চবটি: জমজম টাওয়ার, হাউজ বিল্ডিং, সুইচ গেট, কামারপাড়া, খালপাড়, মেট্রোরেল ডিপো, নর্থ স্টেশন ও সেন্ট্রাল স্টেশন হয়ে পঞ্চবটিতে যাবে ‘উত্তরা চাকা’ কোম্পানির ২০টি বাস।
সড়কে শৃঙ্খলা নিশ্চিতের অংশ হিসেবে বাসস্টপেজ চিহ্নিতকরণ, টিকিট কাউন্টার স্থাপন, ফুটপাত থেকে অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং ব্যাটারিচালিত রিকশা সরিয়ে নেওয়ার জন্য ডিএমপি ও দুই সিটি করপোরেশনকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ১৮ থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত পুলিশের সহায়তায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ডিটিসিএ।
পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের প্রধান সমন্বয়কারী ও পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) তত্ত্বাবধানে ডিএমপি, পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনসহ সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সমন্বয়ে নির্ধারিত রুটগুলোতে ফ্র্যাঞ্চাইজ পদ্ধতিতে কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনা কার্যক্রম সফল করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সব মালিক ও শ্রমিক সহযোগিতা করবেন।” তিনি যোগ করেন, “একটি রুটে শুধু একটি কোম্পানির বাস চলবে, অন্য কোনো কোম্পানির বাস চলবে না। এতে সড়কে অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ হবে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে ঢাকা মহানগরীর বাস পরিচালনায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে।”
ডিটিসিএর বৈঠকে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল আলম জানান, “মহানগরীতে বাস চলাচলে অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী গত ১১ অক্টোবর থেকে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন যৌথভাবে অভিযান শুরু করেছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সহায়তায় ১৭টি স্থানে অবৈধ ও বিশৃঙ্খলভাবে চলাচলকারী বাসের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। এতে ট্রাফিক পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তবে আইন অমান্যকারী বাসচালক ও পরিচালনাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এসব স্থানে সপ্তাহে সাত দিন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা প্রয়োজন।” তিনি আরও বলেন, “ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এখনো সব বাসস্টপেজ নির্ধারণ ও নির্মাণ সম্পন্ন করেনি। তবে যেসব স্থানে বাসস্টপেজ রয়েছে, সেখানেও বাস না থামিয়ে যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা করানো হচ্ছে। স্টপেজ ছাড়া অন্য কোথাও বাস থামানো ও যাত্রী ওঠানামা বন্ধের বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।”
বিশেষজ্ঞদের মতামত:
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ মত প্রকাশ করেন, “ঢাকার গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে ‘এক রুট, এক কোম্পানি’ ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। একই সড়কে বাসের মধ্যে যাত্রী ওঠানোর প্রতিযোগিতা এবং একে অপরকে পেছনে ফেলার প্রবণতা কমাতে রুটভিত্তিক বাস পরিচালনা জরুরি। একবারে সব রুটে এ ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব না হলেও ধীরে ধীরে সব রুটকে এর আওতায় আনার চেষ্টা করতে হবে।” তিনি আরও বলেন, “শুধু ‘এক রুট, এক কোম্পানি’ ব্যবস্থা চালু করলেই যানজট কমবে না। এজন্য নির্ধারিত রুটে অন্য বাস চলাচল নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অন্যান্য যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। একই সঙ্গে বাস চলাচলে সিগন্যালে অগ্রাধিকার দেওয়ার মতো ব্যবস্থাও নিতে হবে। যানজট কমাতে এসব উদ্যোগ সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধুমাত্র নতুন কোম্পানি গঠন করলেই যানজট দূর হবে না। নির্ধারিত স্টপেজে থামানো, অবৈধ যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা এবং সিগন্যালে বাসকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মতো সমন্বিত পদক্ষেপে তবেই এই উদ্যোগ সুফল বয়ে আনবে।
পড়ুন : মিসরে পর্যটকবাহী বাস ও ট্রাকের সংঘর্ষে নিহত ১৩
সা/


