ইসরায়েলের রাজনীতিতে ক্ষমতার সমীকরণ বদলানোর লড়াইয়ে সামনে এসেছেন সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকট। দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে সরানোর লক্ষ্য নিয়ে নির্বাচনে নেমেছেন তিনি। তবে জনমত জরিপে সমর্থন বাড়লেও তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—ভোটের লড়াইয়ে এগিয়ে থাকলেই কি ক্ষমতার দরজা খুলবে, নাকি জোটের হিসাবেই আটকে যাবে সরকার গঠনের সম্ভাবনা?
আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের নির্বাচন। সাম্প্রতিক জনমত জরিপে আইজেনকটের দল ইয়াশার ১২০ আসনের পার্লামেন্টে ২০ থেকে ২৩টি আসন পেতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। কয়েকটি জরিপে তাঁর দল নেতানিয়াহুর লিকুদকে ছাড়িয়ে রয়েছে। তবে জরিপের ফল নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল নয়; আর ইসরায়েলের সংসদীয় ব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি আসন পেলেও সরকার গঠন নিশ্চিত হয় না।
একসময় জনমত জরিপে এক অঙ্কের সমর্থন পাওয়া আইজেনকটের রাজনৈতিক উত্থান তাই কেবল ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতা, গাজা যুদ্ধ পরিচালনা নিয়ে অসন্তোষ, জবাবদিহির দাবি এবং নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের নেতৃত্বের বিকল্প খোঁজার প্রশ্ন।
গাদি আইজেনকটের বয়স ৬৬ বছর। মরক্কো থেকে ইসরায়েলে আসা ইহুদি অভিবাসী পরিবারে তাঁর জন্ম। নয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়; তাঁর পাঁচ সন্তান। তিবেরিয়াস ও ইলাত শহরে বেড়ে ওঠা আইজেনকটের রাজনৈতিক জীবনের ভিত্তি তৈরি হয়েছে সামরিক বাহিনীতে দীর্ঘ কর্মজীবনের মধ্য দিয়ে।
১৯৭৮ সালে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর গোলানি ব্রিগেডে যোগ দেন তিনি। চার দশকের বেশি সময়ের সামরিক জীবনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে ২০১৫ সালে বাহিনীর প্রধান হন। ২০১৯ সাল পর্যন্ত এ পদে দায়িত্ব পালন করেন আইজেনকট। তাঁর সেনাপ্রধান থাকার সময়ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন নেতানিয়াহু।
সামরিক বাহিনীতে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহির প্রশ্নে কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত আইজেনকট। ২০১৬ সালে হেবরনে এক আহত ফিলিস্তিনিকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় ইসরায়েলি সেনা এলর আজারিয়ার বিচারের পক্ষে অবস্থান নেন তিনি। ডানপন্থি রাজনীতিকদের চাপের মধ্যেও সামরিক তদন্তের পক্ষে তাঁর অবস্থান আইজেনকটের নেতৃত্বের ধরন নিয়ে আলোচনায় আসে।
সামরিক বাহিনী থেকে অবসরের পর ২০২২ সালে রাজনীতিতে যোগ দেন তিনি। সাবেক সেনাপ্রধান বেনি গান্টজের সঙ্গে রাজনৈতিক জোট গড়ে তোলেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর নেতানিয়াহুর জরুরি যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় যোগ দেন দুজনই। তবে যুদ্ধের পর গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা না থাকা এবং যুদ্ধ পরিচালনা নিয়ে মতপার্থক্যের প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের জুনে মন্ত্রিসভা ছাড়েন তাঁরা।
গাজা যুদ্ধ আইজেনকটের ব্যক্তিগত জীবনেও গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে গাজায় যুদ্ধে নিহত হন তাঁর ২৫ বছর বয়সী ছেলে গাল। পরবর্তী সময়ে তাঁর দুই ভাতিজাও যুদ্ধে প্রাণ হারান। এই পারিবারিক শোক তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্যে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নিয়েছে।
২০২৬ সালের এপ্রিলে ইসরায়েলি সংবাদপত্র ইয়েদিওত আহরোনোতে লেখা এক নিবন্ধে ছেলের কবরের পাশে করা প্রতিজ্ঞার কথা উল্লেখ করেন আইজেনকট। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা ছিল, ছেলে ও তার সহযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দেবেন না। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বের জবাবদিহির দাবি মিলিয়ে তিনি এখন নিজেকে পরিবর্তনের পক্ষে একজন নেতা হিসেবে তুলে ধরছেন।
নির্বাচনি প্রচারে আইজেনকটের মূল বক্তব্য—নেতৃত্ব, জাতীয় ঐক্য ও জবাবদিহি। তাঁর দল ইয়াশারের নামের অর্থ হিব্রু ভাষায় ‘সোজা’ বা ‘ন্যায়সংগত’। ৭ অক্টোবরের হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধানে রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের তদন্তের বিরোধিতা করে আসছেন।
সব নাগরিকের জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক বা জাতীয় সেবার পক্ষেও আইজেনকট। তাঁর প্রস্তাবের ফলে সামরিক সেবার বাইরে থাকা অতি-ধর্মীয় ইহুদি সম্প্রদায়ের সদস্যদেরও সেবার আওতায় আনার প্রশ্ন সামনে এসেছে। নেতানিয়াহুর বর্তমান জোটের অতি-ধর্মীয় দলগুলো এ ধরনের বাধ্যবাধকতা থেকে নিজেদের সম্প্রদায়ের সদস্যদের ছাড় দেওয়ার পক্ষে। আইজেনকটের দলের ঘোষিত কর্মসূচিতে রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন ও সবার জন্য সেবার বাধ্যবাধকতার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
তবে নিরাপত্তা ও সামরিক নীতিতে আইজেনকটকে নেতানিয়াহুর সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থানে থাকা নেতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। গাজা, লেবানন ও ইরান বিষয়ে তাঁর অবস্থানও নিরাপত্তাকেন্দ্রিক। হামাসের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করা এবং ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখার পক্ষে তিনি। পার্থক্যটি মূলত যুদ্ধ পরিচালনা, জিম্মিদের মুক্তি, কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং সরকারের জবাবদিহির প্রশ্নে।
গাজা যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করে নেতানিয়াহু জিম্মিদের জীবন বিপন্ন করছেন—এমন অভিযোগও তুলেছেন আইজেনকট। তাঁর বক্তব্যে সামরিক লক্ষ্য অর্জনের পাশাপাশি কূটনৈতিক উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে তিনি নেতানিয়াহুর চেয়ে মৌলিকভাবে ভিন্ন অবস্থান নিয়েছেন।
ফিলিস্তিন নীতিতে আইজেনকটের অবস্থান বরং তাঁর রাজনৈতিক বিকল্পের সীমাবদ্ধতাও তুলে ধরে। গাজায় হামাসের শাসন ও সামরিক সক্ষমতার অবসান ঘটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। এ লক্ষ্য অর্জনে ১৮ মাসের সময়সীমার কথাও বলেছেন। তাঁর পরিকল্পনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি উদ্যোগ বাস্তবায়ন অথবা সামরিক অভিযানের মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জনের কথা রয়েছে।
অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ এবং বসতি সম্প্রসারণের কিছু পরিকল্পনা নিয়ে অতীতে উদ্বেগ জানিয়েছেন আইজেনকট। তবে ফিলিস্তিনিদের পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের বিরোধিতা করেছেন তিনি। সম্প্রতি এ সমাধানের পক্ষে থাকা ব্যক্তিদের ‘বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন’ বলেও মন্তব্য করেছেন। ফলে নেতানিয়াহুর বিকল্প হিসেবে তাঁর উত্থান ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা বাড়াবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
পশ্চিম তীরের ভূখণ্ড আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত করার বিরোধিতা এবং অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ ও বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন আইজেনকট। কিন্তু বসতি ও ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রশ্নে তাঁর অবস্থানের মধ্যে যে সীমারেখা রয়েছে, তা ভবিষ্যৎ নীতির দিকনির্দেশনা নিয়ে প্রশ্ন রাখছে।
নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসন পেলেই প্রধানমন্ত্রী হওয়া যায় না—ইসরায়েলের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এটাই আইজেনকটের সামনে বড় বাধা। নেসেটের ১২০ আসনের মধ্যে সরকার গঠনের জন্য অন্তত ৬১ আইনপ্রণেতার সমর্থন প্রয়োজন। নির্বাচনের পর প্রেসিডেন্ট সেই আইনপ্রণেতাকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেন, যাঁর পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন জোগাড় করার সম্ভাবনা বেশি।
সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট কিংবা তাঁর বিরোধী শিবির—কোনোটিরই সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত দেখা যাচ্ছে না। ফলে আইজেনকটের জন্য মধ্যপন্থি ও অন্যান্য বিরোধী দলের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। আরব দলগুলোর সমর্থনের প্রশ্নও আলোচনায় রয়েছে, যদিও এ বিষয়ে তাঁর সাম্প্রতিক বক্তব্য জোট গঠনের হিসাবকে আরও জটিল করেছে।
আইজেনকট বলেছেন, সরকার গঠনের ক্ষেত্রে কিছু নীতিগত শর্ত পূরণ করতে হবে। আরব দলগুলো তাঁর নির্ধারিত শর্তগুলো মেনে নেয় না বলে তিনি সম্প্রতি জানিয়েছেন; ফলে সেগুলোকে সরকারে অংশীদার করার সম্ভাবনা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। অর্থাৎ, শুধু আসনসংখ্যা নয়, সম্ভাব্য শরিকদের সঙ্গে নীতিগত সমঝোতাও তাঁর জন্য বড় পরীক্ষা।
নেতানিয়াহুর সঙ্গে আইজেনকটের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তর, ইরান পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে যাওয়া এবং আব্রাহাম চুক্তির মতো বিষয়ে দুই নেতার অবস্থানের মিল ছিল।
তবে গাজা ও লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্পের আঞ্চলিক শান্তি উদ্যোগের সঙ্গে মতপার্থক্য দেখা গেছে। আইজেনকট ক্ষমতায় এলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ও আঞ্চলিক কূটনীতির ধরনে পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। সৌদি আরবের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তবে সৌদি আরব ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য বিশ্বাসযোগ্য পথের দাবি জানিয়ে আসছে।
সব মিলিয়ে, নেতানিয়াহুকে নির্বাচনে চ্যালেঞ্জ জানানোই আইজেনকটের একমাত্র পরীক্ষা নয়। ভোটের পর সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন জোগাড় করা, সম্ভাব্য শরিকদের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানো এবং যুদ্ধ, নিরাপত্তা ও ফিলিস্তিন নীতিতে নিজের অবস্থান বাস্তবায়ন—সবই তাঁর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। জনমত জরিপে আসনসংখ্যার লড়াইয়ে এগিয়ে থাকার ইঙ্গিত থাকলেও শেষ পর্যন্ত সরকার গঠনের সমীকরণই নির্ধারণ করবে, নেতানিয়াহুর দীর্ঘ শাসনের বিকল্প হিসেবে আইজেনকট কতটা এগোতে পারবেন।
পড়ুন: চতুর্থবারের মতো ব্রাজিলের নির্বাচনে লুলার জয়
আর/


