ইসরায়েলের রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত নির্বাচনে গত চার দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে রেকর্ড সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতি দেখা গেছে। প্রকাশিত জনমত জরিপ অনুযায়ী, দেশটির প্রধানমন্ত্রী পদের লড়াইয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং সাবেক সামরিক প্রধান গাদি আইজেনকোটের মধ্যে অত্যন্ত কঠিন ও সমানে-সমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে।
তবে সাম্প্রতিক জরিপ ইঙ্গিত দিচ্ছে, সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্থাৎ ৬১টি আসন কোনো পক্ষই অর্জন করতে পারছে না। এর ফলে নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠনকে কেন্দ্র করে কয়েক সপ্তাহ বা মাসব্যাপী রাজনৈতিক দর-কষাকষি চলার তীব্র সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এবারের নির্বাচনী প্রচারণায় প্রধানত জাতীয় নিরাপত্তা এবং গণতন্ত্রের সুরক্ষা—এই দুটি বিষয় সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক জোটগুলো এই নির্বাচনকে মূলত নেতানিয়াহুর দীর্ঘ শাসনকালের ওপর এক ধরনের ‘গণভোট’ হিসেবে দেখছে।
গত বছর গঠিত ‘ইয়াশার পার্টির’ নেতা গাদি আইজেনকোট মূলত পরিবর্তনকামী জোটটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। রাজনৈতিক ও আদর্শগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করার একদফা লক্ষ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট, আভিগদর লিবারম্যান এবং সাবেক জেনারেল ইয়ার গোলানের মতো নেতারা এই জোটে এক ছাতার নিচে এসেছেন।
অন্যদিকে, ১৯৯৬ সালে প্রথম ক্ষমতায় আসা নেতানিয়াহুকে পুনরায় সরকার গঠনে তার বর্তমান জোটসঙ্গী অতি-অর্থোডক্স ও অতি-ডানপন্থি দলগুলোর ওপরই আস্থা রাখতে হচ্ছে। উল্লেখ্য, তার বর্তমান ক্ষমতাসীন জোটকে ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে ডানপন্থি সরকার হিসেবে ধরা হয়।
নির্বাচনে দেশটির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জনসংখ্যা গঠনকারী আরবদের দুটি প্রধান জোটও অংশ নিচ্ছে। তত্ত্বগতভাবে সরকার গঠনে তারা গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারলেও, ইসরায়েলের একটি মাত্র ইহুদি রাজনৈতিক দল ছাড়া বাকিরা সরকার গঠনে তাদের সাথে সমঝোতার পথ আগেই নাকচ করে দিয়েছে। লিবারম্যানের মতো গুরুত্বপূর্ণ শরিক দলও আরবদের সমর্থনে সরকার গঠনে অস্বীকৃতি জানানোয় চূড়ান্ত হিসাব আরও জটিল রূপ নিয়েছে।
নির্বাচনী ময়দানে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গত ৭ অক্টোবরের হামলায় চরম নিরাপত্তাহীনতার ব্যর্থতা, সুপ্রিম কোর্টের তোয়াক্কা না করে বিচারব্যবস্থা সংস্কারের পরিকল্পনা এবং চলমান দুর্নীতি মামলার বিচারকে তীব্র হাতিয়ার করেছে বিরোধীরা। একইসাথে অতি-অর্থোডক্স ইহুদি যুবকদের সেনাবাহিনীতে নিয়োগ প্রদানে ব্যর্থতাও বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে।
এর জবাবে নেতানিয়াহু নিজেকে একমাত্র ‘নিরাপত্তার গ্যারান্টি’ হিসেবে তুলে ধরছেন। তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) ছবি ব্যবহার করে সতর্ক করেছেন যে, একমাত্র তিনিই ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে রুখে দিতে পারেন। গাজা প্রসঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী আইজেনকোটও ১৮ মাসের মধ্যে সেখানে হামাসের শাসনের অবসান ঘটানোর ব্যাপারে নেতানিয়াহুর মতোই কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছেন।
মঙ্গলবার ভোরে নির্বাচন চলাকালে বেশ কিছু অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি (সিইসি) তা খণ্ডন করে জানিয়েছে যে কারসাজির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বিশ্বজুড়ে অবস্থানরত বহু ইসরায়েলি নাগরিক ও তরুণ ভোটাররা এই নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন। হাজার হাজার সেনাসদস্যের ভোট গণনা প্ছাদিয়ে হওয়ায় শেষ মুহূর্তে তা ডানপন্থি দলগুলোর দিকে ঝুঁকতে পারে।
ভোটিং পর্ব শেষে মঙ্গলবার স্থানীয় সময় রাত ১০টায় সম্প্রচারমাধ্যমগুলো এক্সিট পোল বা বুথফেরত জরিপের ফলাফল প্রকাশ করবে। যদি শেষ পর্যন্ত কোনো দল বা জোট স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে ব্যর্থ হয় এবং সমঝোতা অসম্ভব হয়ে পড়ে, তবে দেশটিতে আবারো রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে। সেক্ষেত্রে অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থাকবেন নেতানিয়াহু এবং ইসরায়েলকে নতুন আরেকটি নির্বাচনের মুখোমুখি হতে হবে।
পড়ুন : ডেঙ্গুতে একদিনে রেকর্ড ১১ জনের মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ২০৭১
সা/


