নির্বাচনে হেরে দেশ ছাড়লেন বলসোনারো, পরিবারকে ভিসা দেবে যুক্তরাষ্ট্র

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজয়ের পর দেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো। তাঁর পরিবারের সদস্যদেরও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ভিসা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। অর্থ পাচারের তদন্ত, পাসপোর্ট জব্দের নির্দেশ এবং নির্বাচনে পরাজয় ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে ফ্লাভিওর দেশত্যাগ ব্রাজিলের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে এ ঘটনায় ব্রাজিল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্কেও নতুন করে টানাপোড়েন তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার বিকেলে তিনটি সূত্র ফ্লাভিওর দেশ ছাড়ার তথ্য নিশ্চিত করেছে। তাঁর পরিবারের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, ফ্লাভিও যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় পৌঁছেছেন। তবে তাঁর স্ত্রী ও দুই মেয়েসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা ঠিক কোথায় রয়েছেন, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ফ্লাভিও বলসোনারো ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের ভিসা দেওয়া হবে এবং তাঁদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।

রোববার অনুষ্ঠিত ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বামপন্থী বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার কাছে পরাজিত হন ফ্লাভিও বলসোনারো। নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তুললেও তিনি শুরুতে আনুষ্ঠানিকভাবে পরাজয় স্বীকার করেননি। এর আগে ভোটে অনিয়মের অভিযোগ তুলে ফল বাতিলের দাবি জানানোর কথাও বলেছিলেন তিনি।

তবে সোমবার ফ্লাভিওর দল লিবারেল পার্টি লুলার বিজয় মেনে নেওয়ার কথা জানায়। নির্বাচনের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি যখন নতুন সমীকরণের দিকে এগোচ্ছিল, তখনই ফ্লাভিওর দেশত্যাগের খবর সামনে আসে।

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা ফ্লাভিওর দেশত্যাগের ঘটনাকে ‘লজ্জাজনক’ বলে অভিহিত করেছেন। ব্রাসিলিয়ায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলেন, ফ্লাভিও দেশ ছেড়েছেন—এ কথা তিনি মাত্রই শুনেছেন। লুলার মতে, দেশ ছেড়ে যাওয়ার পরিবর্তে ব্রাজিলেই থেকে নিজের নির্দোষিতা প্রমাণ করা উচিত ছিল তাঁর।

ফ্লাভিওর দেশত্যাগের ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন অর্থ পাচারের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। এই তদন্তের অংশ হিসেবে ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্ট তাঁর পাসপোর্ট জব্দের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ফ্লাভিও।

আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, সোমবার তাঁকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পাসপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পাসপোর্ট জমা না দেওয়ায় সেটি বাতিল করা হয়েছে বলে জানিয়েছে দুটি সূত্র।

আদালতের আদেশে বলা হয়, ফ্লাভিওর দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা এবং তাঁর উল্লেখযোগ্য আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনায় পাসপোর্ট জব্দের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এর আগের দিনই ফ্লাভিও জানিয়েছিলেন, দেশ ছাড়ার কোনো পরিকল্পনা তাঁর নেই। পাসপোর্ট জমা দিয়ে নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথাও বলেছিলেন তিনি।

এ কারণে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে কীভাবে তিনি দেশ ছাড়লেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ব্রাজিলের ফেডারেল পুলিশের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ফ্লাভিও নিয়মিত অভিবাসন তল্লাশিচৌকি দিয়ে দেশ ছাড়েননি। তবে তিনি ঠিক কোন পথে দেশ ছেড়েছেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

ফ্লাভিওর দেশত্যাগের খবরে তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মীরাও বিস্মিত হয়েছেন। তাঁর নির্বাচনী প্রচারের ব্যবস্থাপক এবং সিনেটর রজেরিও মারিনহো সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, আগের দিনই ফ্লাভিওর সঙ্গে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে তাঁর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল।

নির্বাচনে প্রায় ছয় কোটি ভোট পাওয়ার পর বিরোধী শিবিরের নেতৃত্বে ফ্লাভিওর থাকা প্রয়োজন বলে মনে করা হচ্ছিল। ফলে তাঁর দেশত্যাগের ঘটনা ব্রাজিলের বিরোধী রাজনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

এদিকে, ফ্লাভিওর সিনেটর হিসেবে মেয়াদ আগামী ফেব্রুয়ারিতে শেষ হওয়ার কথা। এরপর তিনি বিচারসংক্রান্ত দায়মুক্তির সুবিধা হারাবেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে তাঁর বিরুদ্ধে চলমান তদন্ত ও আইনি কার্যক্রম ভবিষ্যতে কোন দিকে এগোয়, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

ফ্লাভিওর দেশত্যাগ ব্রাজিল ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা অভিযোগ করেছেন, বলসোনারো পরিবারকে আবার ক্ষমতায় আনতে ওয়াশিংটন তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করছে। রোববারের নির্বাচনের আগে বলসোনারো পরিবারকে ক্ষমতায় ফেরাতে ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্যোগ নিয়ে রয়টার্স প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগেও ফ্লাভিওর বাবা এবং ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর বিরুদ্ধে বিচারিক নিপীড়ন চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছিলেন। সোমবার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প ফ্লাভিওর দেশত্যাগ নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি। তবে ব্রাজিলের নির্বাচনকে ‘কারচুপিপূর্ণ’ বলে মন্তব্য করেছিলেন তিনি।

জইর বলসোনারোও ২০২২ সালের নির্বাচনে লুলার কাছে হারের পর পরাজয় স্বীকার না করে যুক্তরাষ্ট্রে চলে গিয়েছিলেন। পরে তিনি ব্রাজিলে ফিরে আসেন। অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রের অভিযোগে সরকারি ভবনে তাঁর সমর্থকদের হামলার পর তাঁকে ২৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

বাবা ও ছেলের রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে এই মিল ব্রাজিলের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে দুই ঘটনার আইনি প্রেক্ষাপট এক নয় এবং ফ্লাভিওর বিরুদ্ধে চলমান তদন্তের চূড়ান্ত ফল এখনো জানা যায়নি।

ফ্লাভিও বলসোনারোর দেশত্যাগের পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, তিনি কীভাবে পাসপোর্টসংক্রান্ত নির্দেশের সময়সীমার মধ্যে ব্রাজিল ছাড়লেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে চলমান তদন্ত কীভাবে এগোবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর অবস্থান ব্রাজিলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে কী প্রভাব ফেলবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নির্বাচনে পরাজয়, অর্থ পাচারের তদন্ত এবং পাসপোর্ট জব্দের নির্দেশ—সব মিলিয়ে ফ্লাভিও এখন একাধিক চাপের মুখে রয়েছেন। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের বিষয়ে তাঁর পরিবারের জন্য ভিসা দেওয়ার ঘোষণা নতুন মাত্রা যোগ করেছে এই ঘটনায়।

তবে ফ্লাভিওর দেশত্যাগের পেছনে তাঁর প্রকৃত উদ্দেশ্য কী এবং তিনি কত দিন যুক্তরাষ্ট্রে থাকবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ায় পরবর্তী সময়ে কী সিদ্ধান্ত আসে, তার ওপরই নির্ভর করবে তাঁর রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত ভবিষ্যতের অনেক কিছু।

পড়ুন:ইসরায়েলে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস, সমানে-সমান নেতানিয়াহু ও বিরোধী জোট

ইমি/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন