সংবাদের জের: খালিয়াজুরীতে ধনু নদে অবৈধ ঘের উচ্ছেদ শুরু, স্বস্তিতে জেলেরা

হাওরের বুক চিরে বয়ে চলা ধনু নদ যেন দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফের নিজের চেনা রূপে ফিরতে শুরু করেছে। বাঁশ আর জালের বিশাল প্রাচীর তুলে নদের বুকে যে দখলদারিত্বের রাজত্ব কায়েম হয়েছিল, অবশেষে তাতে কড়া আঘাত হেনেছে প্রশাসন। নাগরিক টিভি অনলাইন পোর্টালে সংবাদ প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসেছে কর্তৃপক্ষ; শুরু হয়েছে অবৈধ মাছের ঘের উচ্ছেদ অভিযান। প্রভাবশালীদের রক্তচক্ষু আর দীর্ঘদিনের বঞ্চনার পর প্রান্তিক জেলে ও নৌযান শ্রমিকদের মাঝে এখন বইছে স্বস্তির সুবাতাস।

গত সোমবার (২৬ অক্টোবর) নাগরিক টিভি অনলাইনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে ‘নেত্রকোনার ধনু নদে অবৈধ ঘের: বিপন্ন জেলে, ব্যাহত নৌ-চলাচল’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এরপরই টনক নড়ে প্রশাসনের। সংবাদ প্রকাশের পরদিন মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) থেকেই খালিয়াজুরী উপজেলার ধনু নদে থানা-পুলিশের সহযোগিতায় উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে উপজেলা প্রশাসন।

উচ্ছেদের সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে খালিয়াজুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অলিদুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, “অবৈধ ঘের উচ্ছেদের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এ পর্যন্ত দুটি ঘের উচ্ছেদ করা হয়েছে। চলতি নদে কোনো ধরনের অবৈধ ঘের থাকতে পারবে না। নৌযান চলাচল যাতে ব্যাহত না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রেখেই আমাদের এ অভিযান চলছে।”

পুরো নদী ঘেরমুক্ত করার প্রক্রিয়াটি বেশ সময়সাপেক্ষ উল্লেখ করে ইউএনও আরও জানান, নদীতে আটকে থাকা বাঁশগুলো অক্ষত অবস্থায় তুলতে না পারলে কেটে ফেলতে হচ্ছে। ঘের থেকে মাছ তুলে পুরো কাঠামো অপসারণে প্রচুর শ্রম ও সময়ের প্রয়োজন হলেও উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

খালিয়াজুরীর লেপসিয়া থেকে গাজীপুর ইউনিয়নের পাঁচহাট- ধনু নদের দীর্ঘ জলপথ ধীরে ধীরে চলে গিয়েছিল অবৈধ ঘেরমালিকদের দখলে। প্রতিবছর হাওরের পানি কমতে শুরু করলেই নদের দুই পাড় থেকে একেবারে মাঝনদী পর্যন্ত আড়াআড়ি বাঁশ ও জাল দিয়ে সারি সারি ঘের তৈরি করা হতো। সরকারি আইন- বিশেষ করে মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ আইন, ১৯৫০-এর তোয়াক্কা না করে এক শ্রেণির প্রভাবশালী ব্যক্তি নদের বুকে নিজেদের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন।

অবৈধ ঘেরের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছিলেন হাওরপাড়ের শত শত প্রান্তিক জেলে। নুরালীপুর গ্রামের রহিছ, রাকিব ও জিলকদ মিয়াদের মতো অসংখ্য সাধারণ জেলেরা, যাদের জীবন ও জীবিকা কেবল এই নদের ওপর নির্ভরশীল, তারা নিজদের পৈতৃক পেশা থেকে উচ্ছেদ হওয়ার উপক্রম হয়েছিলেন। উন্মুক্ত নদে মাছ ধরতে গেলেই তাদের জুটত ঘের মালিকদের বাধা, গঞ্জনা, এমনকি কখনো কখনো শারীরিক নির্যাতন।

পাশাপাশি, চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছিল ধনু নদের স্বাভাবিক নৌ-চলাচল। ঘেরের বাঁশ মাঝনদী পর্যন্ত চলে আসায় পণ্যবাহী বড় বড় বাল্কহেড ও কার্গো চলাচলে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটছিল। ‘এমভি সৌরভ’ নামের নৌযানের সারেং মো. সুলাইমান সওদাগর যেমনটি জানিয়েছিলেন, ঘেরের কারণে ভারী নৌযান নিয়ে পার হওয়ার সময় তাদের চরম আতঙ্কে থাকতে হতো। এছাড়া পরিবেশবাদীদের মতে, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় নাব্যতা সংকটেরও দীর্ঘমেয়াদি শঙ্কা তৈরি হয়েছিল।

সামাজিক এই সংকট, জেলেদের হাহাকার আর নৌ-চলাচলের বিপত্তির চিত্র গণমাধ্যমে উঠে আসার পর প্রশাসনের এই ত্বরিত পদক্ষেপ সর্বমহলে প্রশংসিত হচ্ছে। ঘের উচ্ছেদ শুরু হওয়ায় সাধারণ মানুষের মাঝে স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে। আগে যেখানে ঘেরমালিকরা দম্ভভরে বলতেন “নিজের ইচ্ছাতেই ঘের দিয়েছি”, আজ সেখানে প্রশাসনিক কাঠিন্যের মুখে তারা পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছেন।

তবে স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও জেলেদের প্রত্যাশা- এ ধরণের অভিযান যেন মাঝপথে থেমে না যায়। তাদের জোর দাবি, ধনু নদের বিভিন্ন স্থানে থাকা সব অবৈধ ঘের সম্পূর্ণভাবে অপসারণ করতে হবে। নৌ চলাচলের পথ উন্মুক্ত রাখার পাশাপাশি ভবিষ্যতে নতুন করে যেন কেউ নদীর বুকে এমন ঘের স্থাপন করতে না পারে, সে জন্য নৌ-পুলিশ ও প্রশাসনের কঠোর ও দৃশ্যমান নজরদারি অব্যাহত রাখতে হবে।

দীর্ঘদিনের অবরুদ্ধ ধনু নদ এখন আবার সবার জন্য উন্মুক্ত হওয়ার অপেক্ষায়। প্রান্তিক জেলের জালে আবারও রুপালি মাছ উঠবে, আর নির্বিঘ্নে চলবে পণ্যবাহী নৌযান- এমন স্বপ্নই এখন দেখছেন খালিয়াজুরীর সাধারণ মানুষ।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : ভ্যানের গোপন চেম্বারে থরে থরে বিদেশি মদ! পূর্বধলায় ধরা খেল পাচারকারী

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন