বিশ্বাসে ঘুণপোকা: জরিমানার গ্যাঁড়াকলেও শোধরাচ্ছে না হিমালয় ফিলিং স্টেশন

যাত্রা শুরুর আগে গাড়ির ট্যাংকে তেল ভরার সময় মিটারের কাঁটায় চোখ রাখেন চালক। অঙ্কের সঙ্গে তেলের পরিমাপ মিলে গেলে মনে আসে একধরনের স্বস্তি- অন্তত ঠকতে তো হলো না! কিন্তু নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার চালকদের স্বস্তিতে বারবারই বিষাদ ঢেলে দিচ্ছে পৌর শহরের সাউদপাড়া এলাকার ‘মেসার্স হিমালয় ফিলিং স্টেশন’। প্রতিষ্ঠানটিকে বারবার জরিমানা আর সতর্ক করা হলেও যেন ‘চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনি’। পরিমাপে কারচুপি করে সাধারণ মানুষকে ঠকানোর পুরোনো অভ্যাস থেকে তারা যেন বের হতেই পারছে না।

বুধবার (২৮ অক্টোবর) এই ফিলিং স্টেশনে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের সর্বশেষ অভিযানেও ধরা পড়েছে একই চিত্র। এবারও জ্বালানি তেল পরিমাপে কারচুপির দায়ে তাদের ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই দিনে উপজেলার কয়েকটি বেকারিতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও ওজনে কারচুপির দায়ে তিনটি পৃথক মামলায় আরও ২৩ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করে প্রশাসন।

কেন্দুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সানজিদা চৌধুরীর দাপ্তরিক ফেসবুক পেজ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বুধবার দুপুরে ওজন ও পরিমাপ মানদণ্ড আইন, ২০১৮-এর আওতায় অভিযান চালানো হয়। এতে প্রসিকিউটর হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) ময়মনসিংহ বিভাগীয় পরিদর্শক প্রকৌশলী আবিদ হাসনাত।

অভিযানে দেখা যায়, হিমালয় ফিলিং স্টেশনের গ্রাহক ঠকানোর মাত্রা আগের চেয়ে আরও বেড়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ডিসপেনসিং ইউনিট পরীক্ষা করে বিএসটিআই দেখতে পায়, প্রতি ১০ লিটার পেট্রোলে ৭২০ মিলিলিটার এবং অকটেনে ৬২০ মিলিলিটার তেল কম দেওয়া হচ্ছে গ্রাহকদের। এমন জালিয়াতির দায়ে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।

হিমালয় ফিলিং স্টেশনের বিরুদ্ধে গ্রাহক ঠকানোর অভিযোগ মোটেও নতুন নয়; এটি যেন তাদের অলিখিত নিয়ম। নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, চলতি বছরেরই ৩ মার্চ (মঙ্গলবার) সকাল ১১টায় বিএসটিআইয়ের নিয়মিত অভিযানে ঠিক একই অপরাধে ধরা পড়েছিল তারা। সেদিন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নাঈম উল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে এবং বিএসটিআই পরিদর্শক মেহের আফফানের উপস্থিতিতে অভিযানটি পরিচালিত হয়।

তখন প্রতি ১০ লিটারে ৫০০ মিলিলিটার তেল কম দেওয়ার প্রমাণ মিলেছিল। ওজন ও পরিমাপ মানদণ্ড আইনের ২৯ ধারা লঙ্ঘনের দায়ে ৪৬ ধারায় ১০ হাজার টাকা জরিমানা করে তাদের কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছিল। সেদিন পাম্পের ম্যানেজার গোলাম মাওলা দাবি করেছিলেন, ‘মিটার ইনস্টলেশনজনিত কারিগরি ত্রুটির’ কারণেই সমস্যা হয়েছে এবং দ্রুত তা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বিএসটিআইও মিটার ক্যালিব্রেশনের নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু আট মাসের মাথায় অক্টোবরের অভিযানে দেখা গেল, ত্রুটি তো সারেইনি, বরং কারচুপির মাত্রা আরও বেড়েছে।

এমন অনিয়মের শেকড় আরও পুরোনো। ২০২১ সালের ২৩ জুন (বুধবার) বিকেলে গ্রাহকদের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে ময়মনসিংহের তৎকালীন বিএসটিআই কর্মকর্তা জয়দেব রাজবংশী অভিযান চালিয়ে এখানে তেল কম দেওয়ার সত্যতা পেয়েছিলেন। পরদিন ২৪ জুন তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. খবিরুল আহসান পাম্পের ম্যানেজারকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেন এবং সাত দিনের মধ্যে ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্রটি পরিবর্তনের নির্দেশ দেন। কিন্তু অবস্থার যে কোনো পরিবর্তন হয়নি, তা সাম্প্রতিক অভিযানগুলোই প্রমাণ করছে।

কেন্দুয়া কৃষি নির্ভর ও ব্যবসা কেন্দ্রিক উপজেলা। প্রতিদিন শত শত মোটরসাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, পণ্যবাহী ট্রাক ও কৃষিকাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির জন্য বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেলের প্রয়োজন হয় এখানে। নির্দিষ্ট একটি ফিলিং স্টেশনে বারবার এমন জালিয়াতির ঘটনায় স্থানীয় চালক ও সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।

প্রশাসন বারবার বলছে, ভোক্তার স্বার্থ রক্ষায় এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে। তবে সচেতন মহলের প্রশ্ন- বারবার এমন গুরুতর অপরাধের পরও কেন সামান্য ১০ হাজার টাকা জরিমানা দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি? মার্চে ৫০০ মিলিলিটার চুরির দায়ে যে জরিমানা, অক্টোবরে ৭২০ মিলিলিটার চুরির দায়েও একই জরিমানা হলে অপরাধীরা নিরুৎসাহিত হবে কীভাবে? সাধারণ ভোক্তাদের দাবি, কেবল নামমাত্র অর্থদণ্ড নয়, দিনের পর দিন গ্রাহক ঠকানো এসব অসাধু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হোক, যাতে বিশ্বাস নিয়ে কেনা জ্বালানিতে আর ঘুণ না ধরে।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচনে নিরাপত্তায় এসআরবি, মাঠে ৮ টহল দল

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন